বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

হাউইকে আকাশে উঠতে গেলে অনেকটা বারুদ পোড়াতে হয় : হিরণ মিত্র

তাঁর আঁকা ছবি অনেকদিন আগেই তাঁর ব্যতিক্রমী শিল্পভাবনাকে চিনিয়ে দিয়েছে। দেখিয়েছে শিল্পের নানা মাধ্যমে অনায়াস যাওয়া-আসা। তিনি গানও আঁকেন, হরফও। আবার কার্টুন আঁকার সময়ে ভাবেন না শিল্পী হিসেবে তাঁর জাত গেল কিনা। বইয়ের প্রচ্ছদে তুলির সামান্য টানও অসামান্য ভাবনার স্বাক্ষর রাখে। আবার লেখেন যখন, সেখানেও তাঁর শিল্পীসত্তাটি জেগে থাকে অবিরল। নাটকের মঞ্চসজ্জায় তিনি অপ্রচলিত। এই সব মিলিয়েই শিল্পী হিরণ মিত্র। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়পিয়ালী মুখোপাধ্যায়

হিরণদার বাড়িতে আমি আর পিয়ালী কারণে-অকারণে যাই। হিরণদার সঙ্গে কথা বলতে আমাদের ভাল লাগে। একতলার বসার ঘর থেকে শুরু করে ওঁর দেড়তলা এবং দু’তলার বেডরুম লাগোয়া স্টুডিও, ছাদ, মানে এককথায় গোটা বাড়িটাতেই কেমন যেন ছবি-ছবি একটা আবহাওয়া আছে, যেটা আমাদের দু’জনকেই খুব টানে। নিজে না আঁকলেও ছবির ওপর আমার দুর্বলতা আছে। আর পিয়ালী যেহেতু সময় পেলেই কাগজ, পেন্সিল, রং, তুলি নিয়ে খুটখুট করে তাই হিরণদার ছবি, বিশেষ করে তাঁর আঁকার খাতাগুলো ওর কাছে দারুণ আগ্রহের একটা জিনিস। পিয়ালী বাড়ি থেকে বেরনোর সময় ফয়েল কাগজের মধ্যে সদ্য ভাজা খানিকটা মটর ডালের ফুলুরি হিরণদার জন্যে মুড়িয়ে এনেছিল। টি-মেকারে চায়ের জল চাপিয়ে, চেয়ারে বসে, সেই ফুলুরির ফয়েলটা খুলে তার এক-আধটা মুখে ফেলতে ফেলতে হিরণদা আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সামনের ছোট্ট টেবিলটায় একটা ট্রে-র ওপর তিনটে চায়ের মগ রাখা। ফাঁকা। তাদের রং কালো, লাল এবং সাদা— এটাও ভারি আশ্চর্যের। পিয়ালীর হাতে হিরণদার একটা ছোট্ট নোটবুকের মতো খাতা খোলা, যেটাতে উনি ডাইরির মতো এক-একদিনের ছবি এঁকে রাখেন। পিয়ালী সেটা উল্টে উল্টে দেখছিল ।
রজত : হিরণদা আপনি মোটামুটি কত দিন যাবৎ ডাইরি আঁকছেন?
হিরণ : তাও তো অনেক দিন হয়ে গেল। এটাকে ভিস্যুয়াল ডাইরি বলা যেতে পারে।
পিয়ালী : ভিস্যুয়াল ডাইরি! হ্যাঁ, আপনার কাছে এরকম তো আগেও কয়েকটা দেখেছিলাম।
হিরণ : হ্যাঁ। দেখতেই পারো। অনেকে যেমন দিনলিপি লেখে— আমি তেমনি চিত্রলিপি লিখি বা চিত্রলিপি আঁকি। কোনওদিন হয়তো তাতে বিশ-তিরিশটা এন্ট্রি হল। তারপর অনেক দিন হয়তো কোনও এন্ট্রিই হল না। আসলে, এটা যে আমি নিয়মিত করি তা কিন্তু নয়। যখন মনে হয় তখন করি। নয়তো করি না।
রজত : হিরণদা, আপনি তো বেড়াতে গিয়েও অনেক ছবি আঁকেন!
পিয়ালী : আমিও আঁকি! সেই কলেজে পড়ার সময় থেকেই এটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল।
হিরণ : (পিয়ালীর দিকে তাকিয়ে) আমি যখনই ট্র্যাভেল করি তখনই সেটাকে ডকুমেন্ট করে রাখি। সেটা শুধু বেড়াতে গেলেই করি এমন নয়। এখন লোকে প্রশ্ন করতেই পারে, ট্র্যাভেলকে ডকুমেন্ট করে রাখার কী অর্থ আছে? এ তো সেই আর্ট কলেজের নেচার স্টাডির মতো ব্যাপার নয়! আমি নিজের বাড়ির বাইরে যেখানে যে পরিবেশেই থাকি না কেন, সেই পরিবেশটার সঙ্গে চিত্রভাষা দিয়ে একটা সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করি। যেমন ধরো, এই কিছুদিন আগে আমি একটা পারিবারিক পিকনিকে গেলাম। যেখানে যাওয়া হয়েছিল সেখানে প্রায় কিছুই দ্যাখবার নেই, খাবারদাবার আর অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়েও সবাই বেশ অসন্তুষ্ট। আমি কিন্তু ওসবের মধ্যে ছিলাম না। আমি ওখানেও কিন্তু অনেক ছবি খুঁজে পেয়েছি। প্রচুর ছবি এঁকেছি।

পিয়ালী : হিরণদা, আপনি তো ডিহিগ্রামের পিকনিকে গিয়েও অনেক ছবি এঁকেছিলেন। আমার মনে আছে!
হিরণ : ডিহিগ্রামে ! ( একটু থেমে ) হ্যাঁ, সে তো সেই ‘দীক্ষা’র পিকনিকে। ওখানে তো আশপাশে আঁকার মতো অনেক কিছু ছিল। আমি আগেও ওখানে এঁকেছি। একবার, আমাদের ক্যানভাস দেয় যে ছেলেটি, সে শিল্পীদের নিয়ে একটা পিকনিক অ্যারেঞ্জ করেছিল। সে তখন বছরে একটা করে ওইরকম পিকনিক করত। তো সে বলল, এবারের পিকনিক স্পটটা নদীর ধার ঘেঁষে... পাশে গাছের ছায়া... পাখির ডাক... এইসব। আমরা চোখে সেই ছবি নিয়ে স্পটে গিয়ে দেখলাম, তার পাশে নদীর বদলে একটা এঁদো পুকুর। সেটা একটা পাতি পিকনিক স্পট। আমরা ছাড়াও বেশ কয়েকটা দল এসেছে পিকনিক করতে। তারা খুব জোরে গান চালিয়ে হই-হুল্লোড়ও করছে। পুরো অশৈল্পিক একটা পরিবেশ...
পিয়ালী : এ বাবা!
হিরণ : না, কিন্তু সেখানে গিয়েই আমি পুরো ট্রান্সফর্ম করে গেলাম!
রজত : মানে?
হিরণ : পাশের পিকনিক পার্টি তখন বেশ জোরে একটা পপুলার হিন্দি গান বাজচ্ছিল। গানটায় একটা তাল ছিল। ওই তালটাকে আমার ছবির মধ্যে ঢুকিয়ে নিচ্ছিলাম। একটা করে ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে ওই এঁদো পুকুরটার জলে ছুড়ে দিচ্ছি, তাতে জলে যে ছায়াটা তৈরি হচ্ছে, ওই গানটার তালে তালে সেই ছায়াটাকে আঁকবার চেষ্টা করছি।
পিয়ালী : আরিব্বাস!
হিরণ : (হেসে) আরে, আমি তো নাচতে নাচতেও ছবি এঁকেছি!
রজত : বলেন কী!
হিরণ : হ্যাঁ। একবার শান্তিনিকেতনে একটা আখড়ায় গেছি, সেটা ষাটের শেষ বা সত্তরের শুরু। সেখানে বাউলরা এসেছে, গানটান হচ্ছে। সেখানেই প্রথম গৌরখ্যাপাকে দেখি। গৌরের তখন অল্প বয়স। ও গান গাইতে গাইতে নাচছিল। দেখে আমারও ভেতরটা এমন চনমন করে উঠল যে আমি নাচতে লাগলাম। আর নাচতে নাচতে ছবি আঁকতে লাগলাম। নাচছি, ছবি আঁকছি। নাচছি, ছবি আঁকছি। ছবি আঁকা মানেই আমাদের একটা ধারণা আছে, মাস্টারমশাইরাও বলতেন— ধীর-স্থির হবে, এটা একটা সাধনা, একাগ্র হয়ে ছবি আঁকতে বসবে...
রজত : পারলে ধোয়া কাপড়-জামা পরে, ধূপ জ্বালিয়ে...
হিরণ : (হাসতে হাসতে) হ্যাঁ, যাকে বলে পবিত্র মনে...। আসলে আমার মনে হয়েছিল, আমি যখন একজন বাউলের উন্মাদনাকে আঁকার মধ্যে ধরার চেষ্টা করছি, তখন আমি যদি তার সঙ্গে না নেচে উঠি, তা হলে আমার ছবির মধ্যে নাচের ছন্দটা আসবে কী করে! আমি স্থির হয়ে বসে থাকলে ছবির সেই রেখাগুলো তৈরিই বা হবে কী করে! বড় বড় শিল্পীরা হয়তো আমার এই কথা শুনে আঁতকে উঠবেন... কিন্তু আমার এমনটাই মনে হয়েছিল! (টি-পটটা তখন শোঁ শোঁ আওয়াজ করছিল। সেটা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে)... পিয়ালী... ওই দিকে ওই বক্সটার মধ্যে টি-ব্যাগ আছে, একটু নিয়ে এসে ভিজিয়ে দেবে?
(পিয়ালী ওঠে। চা বানায়। আমাদের দিকে কাপ এগিয়ে দেয়।)
রজত : হিরণদা, একবার আড্ডা দিতে দিতে বলেছিলেন, একসময় আপনি হিন্দুস্থানি রাগসঙ্গীত শুনতে শুনতে, মানে গাওয়া বা বাজানো রাগটিকে কানে শুনতে শুনতে সেটাকে আঁকবার চেষ্টা করতেন!

হিরণ : সেটা তো এখনও করে থাকি! তবে শুধু ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল নয়, ওয়েস্টার্নও। সঙ্গীতের মধ্যে মিশে থাকা ছন্দ ও লয়টাকে খুঁজে বের করার জন্যে একসময় আমি প্রচুর অনুষ্ঠান শুনেছি। সুর, ছন্দ, লয়, একেকটা রাগ, একেকটা ঘরানা... এগুলো আমার মাথার মধ্যে এক-একটা ছবি তৈরি করত, আমি সেগুলোকেই ধরবার চেষ্টা করতাম... এটা আমার একটা বিচিত্র অভ্যেস বলতে পারো। কিছুদিন আগেই একটা বড় ক্যানভাসে কাজ করছিলাম আমার ছাদে। পাশেই একটা বাড়িতে খুব জোরে নামসংকীর্তন হচ্ছিল। গানটা খুবই পপুলার কিন্তু খুব বাজে আর বিরক্তিকরভাবে গাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু আমি তো সেই শব্দটাকে কোনওভাবেই ব্লক করে দিতে পারছিলাম না। তখন ওই গানের ছন্দটাকেই আমি আমার আঁকার স্ট্রোকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। গানের কথা, ভাব বা দর্শন— যা-ই হোক না কেন, আমি শুধু তার ছন্দটা, তালটাকে ধরছি। অ্যাডপ্ট করছি ইন মাই টার্মস! আমি তো তালের ভক্ত। আমার ছবি কিন্তু ইটসেল্‌ফ একজন পারফর্মার। সে নিজে পারফর্ম করে, আমাকে দিয়েও পারফর্ম করায়। আমার ডাইরি লেখাও তাই... আমার বাইরে গিয়ে স্টাডি করাও তাই...
রজত : আর নাটকের ছবি আঁকার ক্ষেত্রে?
হিরণ : কিছুদিন আগেই তমলুকে একটা নাট্যোৎসবে গেছিলাম। সেখানে অনেকগুলো নাটক হয়েছিল। আমি অলমোস্ট সবক’টা নাটকই ডকুমেন্ট করেছি। এখন কেউ বলতেই পারে, নাটকের ছবি আঁকার কী মানে আছে? কী কাজে লাগবে? কোনও কাজেই লাগবে না হয়তো। (মুচকি হেসে) আসলে আমাদের তো কোনও কিছুই কাজে লাগে না। ওয়েস্ট হচ্ছে আমাদের জীবনের একটা বড় প্রপাটি। যেমন কোনও হাউইকে আকাশে উঠতে গেলে অনেকটা বারুদ পোড়াতে হয়। তুমি যদি এভাবে না পোড়াও, যদি কিছু ওয়েস্ট না করো, তাহলে কিন্তু কিছু ঘটবে না। কারণ অনেকটা নষ্ট করে তারপর হয়তো তুমি কিছু পেলেও পেতে পারো। এইটা আমার ছবিরও একটা বড় দিক। এখন আমার ইনস্টলেশন আমার ছবি থেকে আসে। আমার ফোটোগ্রাফিচর্চা— সে-ও আসে আমার ছবি থেকে। আমার লেখা হল আমার ছবির এক্সটেনশন। আমার কবিতাও তাই। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। আমার ছবির মতো আমার লেখারও কোনও খসড়া নেই, কাটাকুটি নেই। এখন এটা ভাল হচ্ছে, না খারাপ হচ্ছে, সেটা আমি জানি না!

পিয়ালী : আপনার নানান ছবির মধ্যে অদ্ভুত কিছু হরফ দেখতে পাই। সেই হরফগুলো আমাদের দেখতে ভাল লাগে কিন্তু সেটা পড়তে পারি না। পড়ার চেষ্টা করতে করতে মনে হয়, আমাদের যত প্রাগৈতিহাসিক গুহা আছে, যাদের দেওয়ালে নানান আশ্চর্য লিপি আছে— সেগুলোর মধ্যে যেন আমরা ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছি... হারিয়ে যাচ্ছি...
হিরণ : আসলে একটা সময় আমি স্ক্রিপ্টোগ্রাফির চর্চা নিয়ে খুব মেতে ছিলাম। সেখান থেকে নিজের মতো কিছু স্ক্রিপ্ট আঁকতে শুরু করলাম। স্ক্রিপ্টগুলোকে ডি-কোড করার কোনও ব্যাপার নেই। এগুলোর কোনও আলাদা অর্থও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এদের নিজস্ব চেহারা, নিজস্ব ভঙ্গিটাই সব। এদের মধ্যে দিয়ে আমি কোনও গল্প বা কাহিনি বলতে চাই না, কোনও ধর্মপ্রচার করতে চাই না, নিজের মতবাদ বা বাণীও প্রচার করতে চাই না। তবু আমি দিনের পর দিন ঝিনুকের গায়ে, পাথরে, তালপাতায়, বাঁশপাতায় এগুলো বদভ্যাসের মতো লিখেছি। যেখানে মনে হয়েছে লিখেছি। দেখেছি, মানে না বুঝলেও এর একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। এরা যেন নিজের মতো করে কিছু কথা বলে ওঠে। সেই কথার মানে কেউ বোঝে কিনা তা আমি এখনও পরিষ্কার জানি না। তবু এখনও তো লিখে যাচ্ছি!

রজত : আচ্ছা হিরণদা, আপনি তো নানান মাধ্যমে ছবি এঁকেছেন। এক্সপেরিমেন্টও করেছেন নানাভাবে। এর মধ্যে কোন মাধ্যমে কাজ করাটা আপনার সবচেয়ে পছন্দের?
হিরণ : নানান মাধ্যম বলতে... এই মাধ্যমগুলো কিন্তু মোটেই পরস্পরবিরোধী নয়। এদের মধ্যে কোনও রেষারেষি বা শত্রুতা আছে বলেও আমার জানা নেই। যদি থাকে, সেটা বড় বড় আর্টিস্টরা বলতে পারবেন! আমার কাছে ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে ছবির স্কেল। আমি জানি না সেটা অন্যান্য শিল্পীর কাছে কতটা ইমপর্টেন্ট। ধরো, আমি ট্রাভেল করার সময় ছোট ছোট খাতাতে কাজ করছি। করছি, কারণ তাতে কাজ করাটা সুবিধের। ক্যারি করাটা সুবিধের। কাজগুলোকে ছোট খাতায় করার মতো করে আমি ট্রিট করছি। সেখান থেকে তুলে কোনও বড় কাজ আমি করি না। আবার যখন কোনও আট-দশ ক্যানভাসে কাজ করছি তখন সেই বড় স্পেসটা নিয়েই আমি ভাবছি। মানে, বড় কাজ আর ছোট কাজের জন্যে আমার কাছে কোনও স্কেল আপ বা স্কেল ডাউন হচ্ছে না। কাজটা তার নিজের স্কেলেই অ্যাপিয়ার করছে। নিজের স্কেলেই এক্সিকিউটেড হচ্ছে। আর্ট কলেজে কোনও একটা কাজ করার আগে আমাদের তার একটা লে-আউট করে মাস্টারমশায়দের দেখিয়ে সেটা অ্যাপ্রুভ করাতে হত। কিন্তু যে মুহূর্তে আমি লে-আউট করছি— অমনি তাকে তো একটা ফর্মুলায় ফেলে দিচ্ছি। সেটা প্রায় একটা ডেডবডিকে টেবিলে ফেলে ডিসেক্ট করার মতো। তার মধ্যে তো কোনও স্পনটেনিটি থাকছে না। একটা ছবি যে আমায় আঁকবে, যার সামনে আমি নিজেকে ক্যানভাসের মতো মেলে ধরব— সেটা ঠিক কেমন দাঁড়াবে সেটা আঁকবার আগে বুঝব কীভাবে? নাটক, সিনেমা, লেখালিখি— আমি যখন যে কাজটা করেছি, স্পনটেনিয়াসলি করেছি।
পিয়ালী : কবিতাও তো...
হিরণ : হ্যাঁ, কবিতাও। আমায় তো কবিতা লেখার জন্যে কেউ ফোর্স করেনি। কেউ ফোর্স করলে, অর্ডার করলে সেই কাজটা আমি ঠিকমতো করতে পারি না।
রজত : কিন্তু হিরণদা, আপনি তো বহুদিন বিজ্ঞাপনের কাজ করেছেন, সেটাও কি...?
হিরণ : না, বিজ্ঞাপনের কাজ করার সময় আমায় অর্ডারি কাজ করতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু তখনও আমার মন হাঁকপাক করত। ভাবত, কী করে তার মধ্যে সেন্স অব ফ্রিডম আনা যায়, কী করে তার একটা আলাদা চেহারা দেওয়া যায়! আর এই স্পিরিটটা আমার কাজের মধ্যে ছিল বলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্ল্ডে একসময় আমার খুব পপুলারিটি ছিল। সবাই বলত, আমার কাজের মধ্যে নাকি সারপ্রাইজ এলিমেন্ট আছে। অতগুলো কোম্পানির অত কম্পিটিশন, তাদের অ্যাট্রাকশন ড্র করার লড়াই— তার মধ্যেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করে গেছি। যেমন, একবার একটা কোম্পানি আই টি-র একটা ফেয়ারে একটা নতুন সফটওয়্যার বিক্রি করবে... এখন, সফটওয়্যার হল এমন একটা জিনিস যার নিজস্ব কোনও চেহারা হয় না। সেটা লোহার সাইকেল বা চামড়ার জুতোর মতো কোনও প্রোডাক্ট নয় যার একটা নির্দিষ্ট চেহারা থাকবে। সেটাকে ততক্ষণ ডেমনস্ট্রেট করা যাবে না, যতক্ষণ না কোনও ক্লায়েন্ট বা বায়ার কাছে না আসবে। এটা যেহেতু কোনও প্রোডাক্ট নয় তাই এর কোনও ব্রিফও হয় না। আমি ওদের একটা বিচিত্র উপদেশ দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, ওদের স্টলে একটা দশ মাথাওয়ালা রাবণের মডেল দাঁড়িয়ে থাকবে। ওরা জিজ্ঞেস করেছিল, রাবণ কেন?
পিয়ালী : রাবণ তো একাই দশজনের মতো বুদ্ধি ধরে!
রজত : আর তার ভাবনাটাও দশ রকমের হবে!
হিরণ : একদমই ঠিক। আর দশটা মাথা বলে তার সেই বিপুল বুদ্ধি দিয়ে সে ওই সফটওয়্যারটা বানাতে পারে! (হাসি) আর ওটা একটা ভারতীয় কোম্পানি, যারা সফটওয়্যার বিক্রি করতে বিদেশে যাচ্ছে এবং সেখানকার মেলায় স্টলও বানাচ্ছে। আর সেখানে রাবণের মডেলটা দাঁড়িয়ে থাকত। রাবণ ওদের জন্যে একটা অসাধারণ সিম্বল হতে পারত কিন্তু ওরা বিষয়টা বুঝল না, সাজেশনটাও নিল না। একটা সফটওয়্যার কোম্পানি যদি কোনও ভাবনা এগিয়ে গিয়ে না ভাবতে পারে, তবে আমার আর কী বলার থাকতে পারে! (হাসি)।
রজত : আচ্ছা হিরণদা, আপনার করা কোনও বইয়ের কভার বা ইলাস্ট্রেশন নিয়ে কি এমন ঘটনা ঘটেছে? বিখ্যাত কোনও লেখকের বা কবির?
হিরণ : হ্যাঁ ঘটেছে। সুবিমল মিশ্র তো খুবই বিপ্লবী লেখক। সে নিজের সব কাজই নিজে করে। তা সে একবার আমায় বলল, হিরণদা আমি আমার অ্যান্টি-উপন্যাস আর অ্যান্টি-গল্প, এই দুটো ভল্যুম করছি। এর দুটো প্রচ্ছদ করতে হবে। আমি শুনে বলেছিলাম যে, বইদুটোর কভারের ওপর কিচ্ছু লেখা থাকবে না। শুধু স্পাইনে নাম লেখা থাকবে। আর অ্যান্টি-উপন্যাসের কভারে একটা বুটজুতোর ছাপ পড়বে। আর অ্যান্টি-গল্পের কভারে একটা সেফটিপিন আটকানো ছেঁড়া হাওয়াই চটির ছবি থাকবে।
পিয়ালী : আরে! অনেককেই তো এটা করতে দেখতাম!
হিরণ : (হেসে) কে না করেছে বলো! আর হাওয়াই চটি ছিঁড়ে গেলে তখন বান্ধবীদের কাছে হাত পাতা ছাড়া গতি ছিল না, কারণ সেফটিপিনটা একমাত্র ওদের চুড়িতেই তো পাওয়া যেত! (হাসি)... আসলে আমার ভাবনাটা ছিল— বুটজুতো হল উপন্যাসের মতো ভারী একটা জিনিস। আর গল্প হল হাওয়াই চটির মতো হালকা। কিন্তু সুবিমলের মতো মানুষও সেটা মেনে নিতে পারল না!
পিয়ালী : আচ্ছা হিরণদা, ধরুন আপনাকে কেউ একটা নাটক পড়ে শোনাল, আপনি তার মঞ্চটা কীভাবে করবেন সেটা কি শুনতে শুনতেই ভেবে ফেলেন? না কি সেটা অনেক পরে আসে?
হিরণ : দ্যাখো, নাটকে সাউন্ড পার্সপেক্টিভ বলে একটা জিনিস থাকে। আমি যখন একটা নাটক শুনি তখন তার নিজস্ব দৃশ্য-সংগীতটাকে ইউটিলাইজ করার চেষ্টা করি। কারণ আমি মনে করি, সমস্ত দৃশ্যের মূল উৎস হচ্ছে শব্দ বা ধ্বনি। আমি আগে ধ্বনিটা শুনতে পাই, তারপর তা থেকে দৃশ্যের জন্ম হয়। এটা আমার একটা ধারণা— সেটা ঠিক বা ভুল যা-ই হোক না কেন! আমি মনে করি যেকোনও আঁকা ছবিরও নিজস্ব একটা ধ্বনি আছে। চেষ্টা করলে সেটা হয়তো শুনতে পাওয়া যাবে। নাটকের সংলাপকে আমি একটা মৃত জিনিস বলে মনে করি। যখন তার ওপর অভিনয় বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার ছায়া পড়ে তখন সে বেঁচে ওঠে। আমি সবসময় চাই নাটকটার মহড়া শুরু হোক, কোরিওগ্রাফ শুরু হোক। সেটা যখন আমি দেখি এবং সেটাকে যখন আঁকতে আঁকতে যাই তখন সেই মানুষগুলোর বিহেভিয়ারাল প্যাটার্নের মধ্যে দিয়ে মঞ্চের একটা ধারণা তৈরি হয়। যেমন ধরো, ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-র সময় আমি যখন দিনের পর দিন ছবি আঁকছি তখন একদিন মনে হল, দুটো এলিমেন্ট খুব ইমপর্টেন্ট। এক হল তিস্তা আর দুই— তার দু’পারের মানুষজন। ওই তিস্তা নদীটার চলনের ওপরেই তার আশপাশের মানুষগুলোর জীবনের চলন ও ওঠাপড়া নির্ভর করছে। তিস্তার মনমেজাজের সঙ্গে এদের জীবনের মনমেজাজও বদলে বদলে যাচ্ছে। নদীতে যখন জল ছাড়া হয়, জল আটকানো হয়, যখন তাতে বন্যা আসে তখন অজস্র ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তার দু’পারে। কিন্তু এতগুলো ঘটনা আমি একসঙ্গে গাঁথব কী করে? তখন আমার মাথায় এল, আমি যদি একটা নদীকে এখানে আনতে পারি, ভিসুয়ালাইজ করতে পারি, তা হলে সেই নদীকে ঘিরেই তো মানুষগুলো থাকতে পারে। এবার আমার অভিজ্ঞতায় মঞ্চে নদীকে নিয়ে আসা আমি দেখেছি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’— উৎপল দত্তের। সেখানে ওরা নদীটাকে কীভাবে আনত? না ব্যাক প্রোজেকশন করত ম্যাজিক লন্ঠন দিয়ে আর শ্যাডো প্লে করে জল, নৌকা— এইসব দ্যাখাত। এটা ষাটের সময়কার গল্প। সেখান থেকে আমি যখন নিরানব্বই-দু’হাজার সালে এসে গেছি, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে, দর্শক পাল্টে গেছে, আমিও পাল্টে গেছি... তাই এই পদ্ধতিটা, এই আঙ্গিকটা আর আমার পছন্দ নয়। এবার আমাকে একটা বিশেষ আঙ্গিক তৈরি করতে হবে। আমি চিন্তা করে দেখলাম, নদীকে আমরা সবসময় দেখি হরাইজেন্টালি। একমাত্র উড়োজাহাজে চেপে গেলে তবেই আমরা তাকে ওপর থেকে দেখতে পাই।
পিয়ালী : কিন্তু ঝরনা হয়ে সে যখন নামে...
হিরণ : তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু সেটা তো খুব অল্প একটা জায়গা জুড়ে। আসলে মঞ্চের ভার্টিকালিটিটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। আগে এটাকে নিয়ে কেউই কিন্তু সেভাবে ভাবেনি। খালেদদাও সেভাবে ভাবেননি বা ভাবার চেষ্টা করেননি। আমি তখন ওই ভার্টিকালিটিটাকেই গুরুত্ব দিতে শুরু করলাম। হয়তো আমিই প্রথম— জানি না! আমি ভাবলাম, নদীটাকে ভার্টিকালি দেখাতে গিয়ে আমি যদি দড়ি ব্যবহার করি তবে সেটাকে তো নদীর মতো করে দেখানো যাবে। সেটাকে আমি প্রথমে আঁকলাম। তিস্তার ডকুমেন্টেশনের মধ্যে আমি সেটাকে ইনকর্পোরেট করলাম। ওরা যখন দড়ি কিনতে গেল তখন আমায় জিজ্ঞেস করল কতটা দড়ি কিনবে। আমি ওদের আন্দাজ করে একটা মাপ বললাম। কিন্তু স্টেজে আটকানোর পর দেখা গেল ঠিক ওই মাপটাই লাগল। এক ইঞ্চি বেশিও লাগল না, এক ইঞ্চি কমও লাগল না। আসলে আমি যখন কিছু ভাবি, পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই ভাবি। তাই আমার হিসেবগুলো কেমন যেন মিলে যায়। দড়িটাকে হল-এর ওপরে ঝুলতে থাকা ‘বার’ নামিয়ে তার দু’দিকে বারছয়েক ঘুরিয়ে প্রথমবার আমিই মালার মতো বেঁধে দিয়েছিলাম… কোত্থাও কিন্তু কাটিনি!
পিয়ালী : সাতলহরী মালার মতো?
হিরণ : হ্যাঁ। ঠিক বলেছ। তারপর সেই মালার মতো দড়িটাকে যখন বার-সুদ্ধু টেনে ওপরে তোলা হচ্ছিল তখন বারটা একটু দুলে যায়, সঙ্গে সঙ্গে দড়িটাও দুলতে থাকে। আমি তখনই ডিসিশন নিয়ে নিয়েছিলাম যে বারটাকে কিন্তু অল্প অল্প দোলাতে হবে। ওটার সঙ্গে দড়ি বেঁধে ওপরের সাইড থেকে কেউ টানলেই ওটা দুলত। নাটকটা শুরু হত একটা স্লো পেস-এর ভাটিয়ালি টাইপের গান দিয়ে। সেই সময় বারটা আস্তে আস্তে দোলালে মনে হত স্টেজটাই যেন দুলছে। কারণ দু’দিকে ভার্টিকাল দুটো স্ট্যাটিক উইংস আছে আর দড়িটা অল্প অল্প দুলছে। ইলিউশনে মনে হত স্টেজটাই যেন দুলছে!
পিয়ালী : তাই! কী করে হত এটা?
হিরণ :

তাঁর আঁকা ছবি অনেকদিন আগেই তাঁর ব্যতিক্রমী শিল্পভাবনাকে চিনিয়ে দিয়েছে। দেখিয়েছে শিল্পের নানা মাধ্যমে অনায়াস যাওয়া-আসা। তিনি গানও আঁকেন, হরফও। আবার কার্টুন আঁকার সময়ে ভাবেন না শিল্পী হিসেবে তাঁর জাত গেল কিনা। বইয়ের প্রচ্ছদে তুলির সামান্য টানও অসামান্য ভাবনার স্বাক্ষর রাখে। আবার লেখেন যখন, সেখানেও তাঁর শিল্পীসত্তাটি জেগে থাকে অবিরল। নাটকের মঞ্চসজ্জায় তিনি অপ্রচলিত। এই [...]

আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST