বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

যেন মুছে না যায়

আমাদের হারানোর বেদনা ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই সম্প্রতি চলে গেলেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ। বাংলা সাহিত্যে আরও একটি স্থান শূন্য হল।

বাংলা সাহিত্যে তিনি যখন লিখতে এলেন তখন সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন দেশভাগের আগের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি। ক্রমশ তার সঙ্গে মিশে গেল অরণ্যের তারুণ্য। তার পর জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও ভ্রমণ গড়ে দেয় তাঁর লেখার রসায়ন। সবই জীবনের ল্যাবরেটরিতে তৈরি। অন্য কোথাও, অন্য কোনওভাবে তা পাওয়া যাবে না। বুদ্ধদেব গুহ এমনই একজন মানুষ। এমনই একজন লেখক।

যিনি বন্দুক হাতে শিকার করেন তিনি আবার লেখেনও! কী করে হয়! হয়। তা ছিল তাঁর জীবনেরই দুর্দমনীয় একটি দিক। আসলে শিকার তাঁকে শিকারী করেনি। লেখক করেছে। সব শিকারীই তো আর লেখক হন না।

আমরা ‘পালামৌ’ জেনেছি সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মহাশ্বেতা দেবী অরণ্যকে দেখেছেন ও লিখেছেন তাঁদের নিজেদের মতো করে। শুধু প্রকৃতির কথা নয়। তাঁরা অরণ্যচারী মানুষের কথাও লিখেছেন পরম মমতায়। মহাশ্বেতা দেবীর অনুবাদে জিম করবেট বাঙালি পাঠকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। শিকার কাহিনির অন্তরে তো এই দেশের কথাই রয়েছে সেখানেও।

বাঙালি পাঠকের একটা বড় অংশ বুদ্ধদেব গুহর হাত ধরে জঙ্গলে ঢুকে পড়তে পেরেছিলেন। সে হাজারিবাগ হোক বা ওড়িশা, সুন্দরবন হোক বা আমাজন। পাঠক গাছ, পাখি, নদীকে চিনেছিলেন এমন দৃষ্টিতে যা তার পাঠের অভিজ্ঞতায় নেই। সামনাসামনি কোনওদিন একটিও বাঘের চোখে চোখ না রেখে তার রোমাঞ্চ, হাড় হিম হয়ে যাওয়া ভয় টের পেয়েছিলেন। তেমনই জেনেছিলেন ‘বনজ্যোৎস্নায় সবুজ অন্ধকারে’ কেমন করে মিশে থাকে ভালবাসা। মানুষ ও মানুষীর প্রেম? নিশ্চয়ই। তবে শুধু সেটুকুই তো নয়। শিকারীর বন্দুক তো কবেই নতমুখ। ততদিনে অরণ্য জড়িয়ে গিয়েছে কলমে। বাঙালির রোমান্টিসিজমের একটা ধারা তৈরি হয়ে যেতে শুরু করেছে জঙ্গল আর নারীকে ঘিরে, যাদের রহস্য অনন্ত। কিন্তু তাও তো সব নয়। অরণ্যের মানুষ— নির্বিবাদী, কষ্টসহিষ্ণু, সরল মানুষ— আমাদের দেশের মানুষের কথা বলেছেন লেখক। তাঁদের বাদ রেখে কি ভালবাসা হয়! বাঙালি পাঠক তাই ‘বাংরিপোসির দু’রাত্তির’ ‘কোজাগর’, ‘মাধুকরী’, ‘কোয়েলের কাছে’, ‘বিন্যাস’, ‘খেলা যখন’, ‘চাপরাশ’— এই সমস্ত লেখা ভুলতে পারেনি। ঋজুদাকে ভাল না বেসে থাকতে পারেনি।

একজন লেখক জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলে তাঁর লেখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্তত আমাদের এখানে ওঠে। কোনও লেখক জনপ্রিয় বলেই তাঁর লেখা নিয়ে কোনও সংশয় তৈরি হবে না, এমন কোনও যুক্তি নেই। তবে কখনও কখনও জনপ্রিয়তার দোষ নির্ধারিত হয়। অথচ একটি লেখা লেখা হয়ে উঠল কিনা সেটাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। বুদ্ধদেব গুহর লেখা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। তাঁর লেখা কতখানি পাঠকপ্রিয় আর তার সাহিত্যগুণ কতটা এমন প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এ কথা না মেনেও কোনও উপায় নেই যে বহু পাঠক এই লেখককে অনুসরণ করে গেছেন। তাঁরা এই লেখকের বান্ধব হয়ে উঠেছেন। লেখক তাঁদের। এমন হয়ে ওঠা সোজা কথা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে এমন হয়ে থাকাটাও কঠিন।

বুদ্ধদেব গুহর প্রয়াণের পর আজ এই পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে স্মৃতির কথা বলতে হচ্ছে। এই ‘সুখপাঠ’ পত্রিকার সঙ্গে লেখকের এক বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায় পত্রিকার একেবারে শুরুর সময় থেকেই। বুদ্ধদেব গুহ লিখতে শুরু করেন ধারাবাহিক ‘শেষবিকেলে সিমলিপালে’। গত চোদ্দো মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে তিনি লিখেছেন এই ধারাবাহিক। সাম্প্রতিক অগাস্টে তা সমাপ্ত হয়েছে। অবিস্মরণীয় সেই স্মৃতিকথা পাঠকের জন্য রেখে চলে গিয়েছেন লেখক। রয়েছে তার অনুরণন।

বুদ্ধদেব গুহর জন্য বাংলা সাহিত্যে একটি আসন পাতা রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। তাঁর লেখা থাকবে। অরণ্যের সুবাস ভেসে আসবে সেখান থেকে। তাঁর আসনটিও রয়ে যাবে বাংলা সাহিত্যে।

এই সম্পাদকীয়তে মহাশ্বেতা দেবীর কথা এল। মনে হতে পারে প্রসঙ্গক্রমেই এল। এসেছে, তবে প্রসঙ্গের একটি অন্য দিকও আছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি তাদের পাঠ্যসূচি থেকে মহাশ্বেতা দেবীর ‘দ্রৌপদী’ গল্পটি বাদ দিয়েছে। এই গল্পটি সচেতন পাঠকরা পড়েছেন। এক আদিবাসী নারীর প্রতিবাদের কথা আছে সেখানে। জঙ্গলের মানুষের অধিকারের কথা আছে। এমন লেখা বাদ দেওয়া মানে এ দেশের মানুষের জীবনের সত্যকে অস্বীকার করা। তা করা যায় না।

অরণ্যের কথা, অরণ্যের মানুষের কথা যাঁরা লিখেছেন আমরা তাঁদের কথা বলছি। আর সকলের মতো লেখকও তো চলে যাবেনই একদিন। শরীর নিভে যাবে। জেগে থাকবে তাঁর লেখা। আমরা লেখা দিয়েই লেখককে ভালবাসব। চাইব, বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদের কথা যেন আমাদের মন থেকে মুছে না যায়। সেসব বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

অরিন্দম বসু,
সম্পাদক