বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

স্মরণে ফেরার দায়

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘সর্ব্বশুভকরী’ মাসিকপত্রে, ১৮৫০ সালে। ‘লোকাচার’ ও ‘শাস্ত্রব্যবহারপাশে’ বাল্যবিবাহের ফলে যে দুর্দশা হয়, হতে পারে, সেকথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন সেখানে। সেই সময়ের সমাজে তাঁর সেই লেখার তেমন কোনও প্রভাব বা আলোড়ন পড়েছিল বলে জানা যায় না। বিদ্যাসাগরের জন্মসালের হিসেবে আমরা এই বছর তাঁর জন্মের দুশো বছরের পরের সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছি। ইংরেজি হিসেবে এই সেপ্টেম্বরই তাঁর জন্মমাস। বাংলা মতে অবশ্য আশ্বিন। তাঁর মৃত্যুর পরেও চলে গিয়েছে একশো উনত্রিশ বছর। এবং এদেশে এখনও ‘বাল্যবিবাহ’ মোছেনি। এই বাংলাতেও নয়। ‘আধুনিকতা’ এখন আমাদের সর্বাবস্থায় বিরাজ করছে, অন্তত দাবি তো সেইরকমই। পারিবারিক, সামাজিক ও অথনৈতিক পরিসরে কত পরিবর্তনই তো বয়ে এল সময়ের স্রোতে। তবু তার নীচেই এখনও পড়ে রয়েছে কিছু অনড় পাথর।

সাদা চোখে দেখলে এমনটা মনে নাও হতে পারে। অন্তত ‘বাল্যবিবাহ’-এর প্রকোপ থেকে আমাদের সমাজ মুক্ত, এরকম একটা ধারণাও হয়তো আছে। অথচ মাঝে মাঝেই এমন খবর ভেসে ওঠে, যেসব জায়গায় খবর প্রকাশিত হয়। সেসব আমরা পড়ি, ভুলে যাই, আবার পড়ি। আসলে আড়ালে রয়ে যায় এমন অনেক ঘটনা যার কোনও খবর মেলে না। গ্রামে, মফস্‌সলে, এমনকি হালের কলকাতা শহরেও সেসব বিরল নয়। সংস্কার, লোকাচার এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তার কারণ হয়ে উপস্থিত হয়। বা বলা যায় তার সমর্থন। মনের দিক থেকে এগিয়ে থাকার কথা বলা সেখানে বাতুলতা। এ বিষয়ে বিধিনিষেধ আছে, সরকারি প্রচার আছে, এর বিরুদ্ধে ব্যক্তি বা কোন ও সংগঠনের উদ্যোগও দেখা যায় কখনও কখনও। তবে কথা হল, এসব এখনও করতে হয়। ফাঁকি দেওয়ার মতো একধরনের বিধিও বানিয়ে ফেলা হয় অনেক ক্ষেত্রে। যেখানে ছেলের বয়স বিধি মানে, মেয়ের বয়সে না মানলেও চলে।

কখন, কীভাবে এই দোষ কাটবে তা বলা আমাদের সাধ্য নয়। তবে আমরা ‘সুখপাঠ’-এর এই তৃতীয় সংখ্যায় ‘ফিরে পড়া’ বিভাগে বিদ্যাসাগরের সেই প্রবন্ধটি আবার প্রকাশ করলাম।

এই সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ রয়েছে যার প্রসঙ্গ বাংলা সাহিত্যে মেয়েদের আহার। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে বাংলা ভাষার সাহিত্যে মেয়েদের রন্ধনপ্রণালী, যত্ন করে খাওয়ানো, রান্নায় তাদের পারদর্শিতার সাক্ষী হিসেবে যত বিবরণ পাওয়া যায়, মেয়েদের খাওয়াদাওয়ার উল্লেখ সে তুলনায় ছায়ামাত্র। ভোজন যেখানে ‘বিলাস’ সেখানেও যা, খাওয়া যেখানে ‘কুড়িয়ে’, সেখানেও। কেন এমন, তেমনই কিছু প্রশ্ন রয়েছে লেখটিতে। এ প্রসঙ্গে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, ‘সুখপাঠ’-এর প্রথম সংখ্যায় ‘অন্নপূর্ণার ভোজ’ নামে নেপালের একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। আগ্রহীরা ছুঁয়ে আসতে পারেন সেই গল্পটিও।

এই সংখ্যা থেকেই একটি নতুন বিভাগ শুরু হল পত্রিকায়। ‘লোকায়ত’। লোকশিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ে বিভিন্ন লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হবে এখানে। মূলত আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতির নানা বৈশিষ্ট্যের কথা সামনে আনা, মনে করিয়ে দেওয়াই তার লক্ষ্য। বিস্মরণ থেকে স্মরণে ফেরার দায়ও বলা যেতে পারে।

সমস্ত ক্ষেত্রে পাঠকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বের।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক