বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

কবির উচ্চারণ

কবিকে কে মনে রাখে? কেন, আমরা রাখি। তাঁর কবিতা পড়ি, পাঠ্যপুস্তকে থাকে, তাঁর গান শুনি, ক্কচিৎ তাঁর আঁকা ছবিও দেখি। সাহিত্য পাঠ করি, তাঁর লেখাকে উদ্ধৃতিচিহ্নের অবরোধে ব্যবহার করি। তাঁর জন্মদিন ও মৃত্যুদিন মনে রেখে মূর্তিতে, ছবিতে মালা দিই। এসবের কি প্রয়োজন নেই, মানে নেই কোনও? আছে নিশ্চয়ই। স্মরণের তো কোনও না কোনও চেহারা দরকার হয়। কবি সেখানে সার্থক কিনা কে বলবে, আমরা হয়তো সার্থক। কবির জীবনদর্শন আমরা আলগোছে সরিয়ে রাখি। যেকথা নিভৃতে উচ্চারিত হয়েছিল, মনন থেকে যা উৎসারিত হয়েছিল, তার অন্তরালটুকু ঘুচে যায়। তাকে জাগিয়ে রাখা বলে হয়তো কিন্তু আমাদের মনে তা জেগে থাকে কিনা বলা যায় না। অথচ তেমন হলে কবির জীবনের ধারায়, সাহিত্যে, সমাজজীবনে, ইতিহাসে ইতিবাচক সত্যটি বোঝা যেত।

কবি চলে যান না। তিনি ফিরে ফিরে আসেন। আর এক কবির সদ্যপ্রয়াণ আমরা সেই অর্থেই নিতে চাই। তিনি এক দীর্ঘ সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আরও দীর্ঘ সময় থাকবেন। তাঁর কবিতা সাময়িক নয়, আধুনিক। প্রচার, বিজ্ঞাপন, প্রতিযোগিতার বাইরে যেমন আধুনিক হতে হয়। সেখানে সময়জিজ্ঞাসার চিহ্ন বর্তমান। যার যাত্রা ভবিষ্যতের দিকে। কবিতায় জীবনযাপনের যে নির্যাস তা যেমন তাঁর কবিতার মুহূর্ত গড়েছে, তেমনই পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ হয়ে ভেসে থেকেছে।

জীবন শুধুই আহার-নিদ্রা-মৈথুনের সমষ্টিমাত্র নয়। মানুষ একথা বুঝেছিল বলেই সৃষ্টি হয়েছিল গান, ছবি, কবিতা, নাটক, ভাস্কর্য। মস্তিষ্কের পরিপুষ্টির জন্য প্রয়োজন হয়েছিল শিল্পের। বোধ জন্ম নেয় সেই পুষ্টি থেকে। সংস্কার আর সংস্কৃতি এক নয়। প্রথমটি গড়ে উঠতে সময় লাগে না। তা জন্মলালিত হতে পারে। দ্বিতীয়টি অর্জন করতে হয়। আর অর্জিত বিদ্যা চর্চার প্রয়োজন থাকে। এসব নতুন কথা নয়। আমরা জানি। মনে রাখি কিনা, মনে রাখতে চাই কিনা, বলা কঠিন। তবে বলা যায়, অনাদরে, অবহেলায়, অব্যবহারে পড়ে থাকলেও ধারালো যা কিছু তা ভোঁতা হতে বাধ্য। শান দেওয়ার পাথরের অভাব নেই বাঙালিজীবনে। তাকে নিতান্তই পাথর মনে করে অবজ্ঞা করলে সময়ের শ্যাওলায় তীক্ষ্মতার ক্ষয় অনিবার্য। এমন ভাবার কারণ নেই যে এই তীক্ষ্মতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের করতলগত। তা যদি হত তাহলে শিল্পের সৃষ্টির কোনও লোকায়ত ধরন থাকত না কোনও কালেই। আর সৃষ্ট তাবৎ শিল্পের ঠাঁই হত নিভৃতে, যেখান থেকে তার উৎপত্তি। সার্থক শিল্প নিভৃতের সন্তান। তার পরেও তার লালনপালনের জন্য উঠোন দরকার হয়।

কবি যখন সত্য উচ্চারণ করেন, তখন তাঁর অভিভাবক ছায়াটুকু আমরা পেতে চাই। তবে মনে রাখা ভাল, দেশোত্তরে, কালোত্তরে ও সময়োত্তরে যা সত্য তা ভুলে গিয়ে তার অপলাপ হতে দেওয়া যায় না। কবির উচ্চারণ সার্থক করার সেখানেই সার্থকতা।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক