বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

পড়ে কে

মানুষের জীবনে কবিতার মতো মুহূর্তের আগমন বড় সহজ নয়। এই যে কোনও গাছের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা ঝরে পড়ছে, মাটিতে পড়ে সরসর করে সরে যাচ্ছে, শুকনো পাতা উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়, এসব আমরা হয়তো দেখেও দেখছি না। কোনও গাছে এখনও সবুজ পাতা ঢেকে রেখেছে রুক্ষ ডালপালা। কোথাও আবার পলাশ ফুটেছে, ফুটেছে শিমুল। প্রকৃতি আরও একবার বদলে যাচ্ছে এবারের ফাগুনে। কোকিল ডাকছে, আমরা হয়তো শুনেও শুনছি না। কবিতা কে চায়। কার সেই অবসর আছে, যখন জীবন কোনও চাঁছাছোলা গদ্যের মতো আমাদের বিস্রস্ত করে। আমাদের বেঁচে থাকার নিত্যকার লড়াই আছে, সিরিয়াল আছে, রাজনৈতিক তরজা আছে, একের অপরের প্রতি অসূয়া আছে। প্রকৃতিতে এসবের কোনও ছাপ পড়ে না। সে তার কাজ করে চলেছে। আমরা তার কাছ থেকে কিছু শিখি না। এখন সে সুযোগও আর নেই। কবি-সাহিত্যিকরা ভাল ভাল কথা বলতে পারেন। তবে তা শোনে কে। সেখানে প্রকৃতির কথা, মানুষের কথা, জীবনের কথা, প্রত্যয়ের কথা, দুঃখ ও আনন্দের কথা থাকতে পারে। তবে তা পড়ে কে।

আগের বারের সম্পাদকীয় বলেছিল সাহিত্যের বহমান ধারার কথা। দুঃসময়েও যা ব্যাহত হয়নি। হওয়ার কথা নয়। কারণ, সাহিত্যকে তো নানা সময় পেরোতেই হয়। কালের অদৃশ্য এক কষ্টিপাথর ঘষে দেখে নেয় তাকে। কিন্তু পাঠকের বেলায় কী ঘটে। অনেকদিন যাবৎই একটা কথা শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই তা ভেসে ওঠে। বাংলা ভাষায় উৎকৃষ্ট সাহিত্য তেমন হচ্ছে কই। না যদি হয় তাহলে আর পাঠক পড়বেন কী। যাঁরা বলেন তাঁরা নিশ্চয়ই সব পড়ে এবং জেনে, বুঝেই বলেন। তাহলে ধরে নিতেই হয় যে পাঠকরা আছেন তাঁদের জায়গাতেই কিন্তু সমাদর করার মতো সাহিত্য তাঁরা পেয়ে উঠছেন না। দায় এক্ষেত্রে লেখকদের ওপরেই বর্তায়। তাঁরা তেমন লিখে উঠতে পারছেন না। কথাটা সর্বাংশে ভুল, এমনটা নয়। অনেক লেখা হচ্ছে মানে এই নয় যে অনেক ভাল লেখা হচ্ছে। সেখানে ফাঁক ও ফাঁকি দুই-ই আছে। ভবিষ্যতের বিচারের অপেক্ষায় তাকে ফেলে রাখলে তা বর্তমানকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল মাত্র হয়ে দাঁড়াবে। নিশ্চয়ই খারাপ শোনাবে তবে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে এখন পাঠকের থেকে লেখক বেশি। সেরকম হলে ভাববার বিষয়। তবে আপাতত কথাটা ব্যাজস্তুতি হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

যেকোনও ভাষাতেই উৎকৃষ্ট সাহিত্য ভূরি ভূরি হয় না। বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। আবার কম বলেই যে সেই অভিধা আসে এমনও নয়। সাহিত্যের গুণবিচারই সর্বোত্তম কথা। সাহিত্যের পাঠক যে কমছে এমন কথাও তো শোনা যাচ্ছে অনেকদিন ধরে। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ, বাংলা লেখালেখির ভবিষ্যৎ, বাংলা বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা, সেমিনার, ওয়েবিনারের অভাব নেই। সাহিত্যের ধারক ও বাহক কখনওই একা লেখক নন। মুদ্রণ এবং হালের অনলাইন বা ডিজিটাল, যে মাধ্যমেই হোক না কেন, লেখা ছাপার জায়গা অনেক। তবে লেখা ছাপা হলেই যে বিশেষ গুণসম্পন্ন হবে তা নয়। আবার যা ছাপা হচ্ছে তার গুণাগুণ বিচার করার জন্য আগে তা পড়তে তো হবে। পড়ার জন্য পাঠকেরই যদি অভাব পড়ে তাহলে সব মিলিয়ে সাহিত্যের জন্য কোনও ভবিষ্যদ্বাণী ধার্য থাকে না বোধহয়।

এতসব কথা বলার উদ্দেশ্য তো আছেই। ‘সুখপাঠ’ ওই পাঠক-লেখক সমন্বয়ের উদ্দেশ্যটি নিয়েই শুরু করেছিল। সেই পথেই তার চলা অব্যাহত আছে। মাঝপথে হয়তো কিছুটা বিতর্ক ছুঁয়ে যাওয়া গেল। আম আর দুধ মিশে গেলে আঁটি হিসেবে সাহিত্যের পত্রিকা গড়াগড়ি দিতে পারে। তবে সে গড়াগড়ি আনন্দে।

শেষে একটি ঘোষণা বা জানানোর কথা। এই সংখ্যা থেকে পত্রিকায় ভ্রমণের, পরিবেশের ও চলচ্চিত্রের ছোট ছবির তিনটি বিভাগ বন্ধ রাখা হচ্ছে। আমাদের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আমাদের পাঠক দেখার চাইতে পড়তে চাইছেন বেশি। তাই আপাতত এই ব্যবস্থা। যদি উৎসাহের অন্য কারণ ঘটে তাহলে তখন সাড়া দেওয়া যাবে।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক