বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

ধারা বহমান

এই বছর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার সময় চলে গেল। সাহিত্যের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত অর্থাৎ লেখক, পাঠক, তাঁদের অনেকেই দুঃখ পেয়েছেন। আশাহত হয়েছেন বই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রকাশক, মুদ্রক, বাঁধাইকর্মী, বই বিক্রেতা এবং আরও অনেকেই। স্বাভাবিক। কলেজ স্ট্রিটে সারাবছরই বইয়ের ব্যবসা হয়। স্কুল-কলেজের বইয়ের যেমন হয় তেমনই অন্য বইয়েরও যে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই জায়গাটি এবং তার অন্তত পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বইয়ের নানারকম কাজ হয়ে থাকে। তার প্রভাবে বা বলা চলে তার বিস্তারে গোটা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বই প্রকাশের কাজ হয়। অবশ্য শুধু সে কারণেই যে হয় তা নয়। সাহিত্য সৃষ্টি ও তার প্রকাশ তার অন্যতম প্রণোদনা। এমন বলা যেতে পারে, বইমেলা না হলে কি সাহিত্য সৃষ্টি থেমে যাবে, না কি বইমেলা যখন ছিল না তখন সাহিত্যের কাজ কিছু হয়নি। তা তো নয়ই। সাহিত্যের তুলনায় বইমেলা নেহাতই অর্বাচীন। তবে এই বইপার্বণ যখন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই তা এমন বহুজনকে একত্রিত করতে শুরু করে যাঁরা বই ভালবাসেন। বেচাকেনা, লেনদেনের বাইরে তা অন্য এক উষ্ণতা।

বইমেলা না হওয়ায় নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যে অসুখ গত এক বছর ধরে আমাদেরও ভয় দেখিয়ে চলেছে সেই ভয়েই এখানে এবছর বইমেলা স্থগিত। এখনকার পরিস্থিতিতে একটা ঘেরা জায়গায় প্রচুর মানুষের উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা নিয়ে ভয় রয়েছে। সে ভয়ও স্বাভাবিক। আবার পরিস্থিতি যে শুরুর মতো ভয় পাওয়ানো নেই তাও বোঝা যাচ্ছে। সুতরাং কেউ বলছেন, সতর্কতা রেখে বইমেলা হতেই পারত। আবার কেউ বলছেন, তাতে যদি বিপদ বাড়ে তখন সামলাবে কে। দাঁড়িপাল্লা সমান নয় ফলে স্থিতাবস্থার বদলে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

সাহিত্য নিয়ে, বই নিয়ে সকলের আগ্রহ নেই। যাঁদের আছে তাঁরা সংখ্যালঘু। তবে সংখ্যায় সব বিচার চলে না। বইমেলা না হওয়া অন্তত পশ্চিমবঙ্গে বড় ঘটনা। তাতে যদিও সাহিত্যের কাজ থেমে নেই। থাকার কথাও নয়। লেখকরা লিখছেন। নিশ্চয়ই অসুখ ও তার ফলে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রভাব তাঁদের ওপর পড়েছে। ছায়া পড়েছে এক সার্বিক সামাজিক বিষণ্নতার। তবু লেখা তো হচ্ছে। তার প্রকাশও ঘটছে। মুদ্রণ মাধ্যমে এবং অনলাইনে। মুদ্রিত বইয়ের প্রকাশ আগে একেবারেই থমকে গিয়েছিল। এখন সেখানে ধীরে হলেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমেও বই প্রকাশিত হচ্ছে। যদিও আপাতত তা নেহাতই এক বিকল্প ব্যবস্থা। তবে অনলাইনে লেখা ও পড়ার জায়গাটির বিস্তার ঘটে গেছে এই সময়ের মধ্যে। মুদ্রণ মাধ্যমের পাশাপাশি তার যে উপস্থিতি ছিল হাজির থাকা গোছের, সেই অবস্থা ও অবস্থান বদলে গেছে। অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে যা লেখা হচ্ছে তার কতখানি উৎকৃষ্ট বা কতখানি নিকৃষ্ট তার বিচার হতেই পারে। মুদ্রণ মাধ্যমেও তো তা ঘটে, ঘটে আসছে। সবাই যে অনলাইন মাধ্যমেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এমনটি নয়। তেমন হবে কিনা তা বলার সময় আসেনি। অনেকের এ বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য নেই। অনেকে রপ্ত করার চেষ্টায় রয়েছেন। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে একটি অসুখ আমাদের সাহিত্যপাঠের অভ্যেসকেও অনেক বদলে দিয়েছে। তা লেখালিখি ও তার প্রকাশ, এই দুইয়ের ক্ষেত্রেই সত্যি হয়ে উঠেছে।

এখানে একটি কথা ভাবা জরুরি। মুদ্রণ হোক বা অনলাইন, সাহিত্যের কাজ যদি চলতে থাকে তাহলে তা শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের পক্ষেই ভাল। লেখক, পাঠক তো অবশ্যই, একটু বড় করে ভাবলে, সময়ের সঙ্গে একটু এগিয়ে গিয়ে ভাবলে দেখা যাবে আরও অনেকের পক্ষেই তা সুখকর হয়ে উঠতে পারে। সাহিত্যের ধারাটি বহমান থাকাই সবচেয়ে বড় কথা।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক