বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

আমাদের উৎসব

ফাল্গুন থেকে আষাঢ় হয়ে পৌষ পর্যন্ত, অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র। ধরতে গেলে সারাবছরই এদেশে এক উৎসব চলে। ধান বোনা আর ধান তোলার উৎসব। আমাদের এই বঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। তার ভূমিকাও বিপুল। এই আয়োজন আমাদের চোখের সামনেই চলে। কত মানুষ জড়িয়ে থাকেন এই আয়োজনে। যাঁরা থাকেন তাঁরা জানেন যে এ হল জীবনের জন্য আয়োজন। যাঁরা এর বাইরে থাকেন তাঁরাও জানেন যে এ উৎসব বন্ধ হয়ে গেলে কোথায় টান পড়বে। তবু এসবই যেন রয়ে যায় আমাদের দেখার বাইরে।

আরও এক উৎসব চলে প্রকৃতির। এক একটি ঋতুতে সেই উৎসবের সূচনা। তার কোনওটি কখনও মানুষের কাছে সুফলা অথবা নিষ্ফলা হয়ে সামনে আসে। কখনও খরা, কখনও বন্যা। কিন্তু সে তো মানুষের কাছে। প্রকৃতির তাতে কিছু যায় আসে না। আর মানুষ নিজেকে সর্বনিয়ন্তা ভেবে প্রকৃতিকে বদলে দিতে দিতে একসময় তার হাতেই অসহায় হয়ে পড়ে। তবু প্রকৃতির উৎসব বিরামহীন। এই হেমন্তে যেমন নরম রোদ্দুরের ভেতরে কোনও গাছ থেকে হলুদ হয়ে যাওয়া পাতারা ঝরে পড়ে। নতুন পাতা গজানোর উৎসব যদি থাকে তাহলে পাতা খসানোর উৎসবকে আসতেই হয় তার আগে।

প্রকৃতির উৎসব আর ফসলের উৎসবে জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে থাকে। তার পর যা কিছু উৎসবের আয়োজন তা মানুষ এই পৃথিবীতে থাকতে থাকতে বানিয়ে নিয়েছে। প্রকৃতি আর জীবনের মধ্যে থেকেই সেসব উৎসবের আরম্ভ যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ধর্মবিশ্বাস।

উৎসব আসে। উৎসব চলে যায়। উৎসবে বাঁচার আনন্দ প্রকাশ পায় প্রায় একরকমভাবে। জীবন নিরানন্দ থাকলে তা উৎসবে মেতে উঠতে পারে না। অসুখ যে নিরানন্দের ব্যাপার তা নিয়ে আশা করা যায় কারও দ্বিমত থাকবে না। অথচ আমরা অসুখের সময়েও আনন্দ করি। রোজকার জীবনে বেঁচে থাকার যে আনন্দ প্রয়োজন তা যে ঠিক কোথায়, এমন আবিষ্কারের জায়গায় পৌঁছনোর উপায় নেই আমাদের। আনন্দের ধরন এক একজনের কাছে এক একরকম। কেউ বিরাট বৈভবে আনন্দ পায়, কেউ সামান্য ডাল ভাতে আনন্দ খোঁজে। দর্শন আর জীবনদর্শনের চিরকালের দূরত্ব। এই দূরত্বের মাঝে কখনও সেতুবন্ধন করতে চায় সাহিত্য।

সমস্ত পৃথিবীতেই প্রায় সমস্ত উৎসবের সঙ্গেই ধর্মের যোগ আছে। তা আমরা গ্রহণও করে নিয়েছি। মাঝে মাঝেই চেষ্টা হয়েছে ধর্মপরিচয়ের বাইরে গিয়ে সকলের সঙ্গে উৎসবকে মিলিয়ে দেওয়ার। কখনও কখনও তা সফল বলে মনে হলেও এমন কোনও দাবি আজ পর্যন্ত মানুষ করে উঠতে পারেনি। ফলে উৎসবের মধ্যেই ধর্মীয় বাদবিবাদ এসে উপস্থিত হয়। কিছু মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়েন। কিছু মানুষ বিষণ্ণ। সাহিত্যে, শিল্পে মানুষে মানুষে মিলনের কথাই ধ্বনিত হয়। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি বড়ই ক্ষীণ।

এই সংখ্যার ‘সুখপাঠ’ থেকে শুরু হচ্ছে তিনটি নতুন ধারাবাহিক। ধারাবাহিক উপন্যাস ‘মিলন হবে কত দিনে’, ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি ‘পেরুস্কোপ’। এর মধ্যে ‘কথামালা’ শীর্ষক একটি বিভাগ নতুন সংযোজন। এখানে শুরু হয়েছে ধারাবাহিক আর একটি লেখা ‘সেকেলে গপ্পো’।

পাঠকদের প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকব আমরা। ‘সুখপাঠ’ চায় সাহিত্যের উৎসব।

অরিন্দম বসু,
সম্পাদক