বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

নতুন পাতার অপেক্ষায়

বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে হেমন্তকাল বড় অন্তরালের। তাকে ঠিক আলাদা করে খেয়াল করা যায় না। গাছের পাতারা ঝরে পড়ার জন্য আড়ালে তৈরি হতে থাকে। আমরা বুঝতে পারি না।

এই হেমন্ত আমাদের এখানে এবার আরও বিষণ্ণ। হয়তো সারা পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই। মানুষের বেঁচে থাকার সাধন দুষ্কর হয়ে উঠছে। মহামারির অসুস্থতা তো শুধু শরীর নয়, মনকেও পেড়ে ফেলতে চাইছে। তবুও 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' থেকে জেগে উঠে জীবনানন্দের কবিতা যেন আমাদের জীবনের উচ্চারণ শেখাতে চায়। ‘কারণ, সূর্যের চেয়ে, আকাশের নক্ষত্রের থেকে/প্রেমের প্রাণের শক্তি বেশি; তাই রাখিয়াছে ঢেকে/পাখির মায়ের মতো প্রেম এসে আমাদের বুক!/সুস্থ করে দিয়ে গেছে আমাদের রক্তের অসুখ!’

কবিতা, কাহিনি, সঙ্গীত, ছবি, ভাস্কর্য— শিল্পের যা কিছু সত্য ও সুন্দর তা আমাদের জীবনের শুশ্রূষা। মানুষ যদি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে অকারণ উল্লাসে থাকে, অসুখেরই মুখোমুখি হতে হবে। এমন কথা উঠতে পারে, দু'বেলা দু'মুঠো খাবার যোগাড়ের জন্য যাদের চিন্তা করতে হয়, হচ্ছে যাদের, তাদের কাছে অন্নই তো অন্যতম শুশ্রূষা। বাকিতে কাজ কী। তা কি বিলাসিতারই আর এক রকম নয়। উত্তর এই, তা যদি হত তাহলে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার সেই আদি বা আদিম কাল থেকে কোনও শিল্পই সৃষ্টি হত না। জন্ম হত না ভাবনার। হয়েছে, কারণ মানুষ চেয়েছে।

শিল্প-সাহিত্য নিয়ে এত কথা বলার প্রয়োজন কি এইজন্য যে সুখপাঠ একটি সাহিত্য পত্রিকা। তা তো নিশ্চয়ই। যার যা কাজ।

সুখপাঠ শারদ সংখ্যা পাঠকদের কাছে পৌঁছেছে শুধু নয়, তাঁরা সাদরে তা গ্রহণ করেছেন, তাঁদের অনুভূতি জানিয়েছেন। এ আমাদের কম প্রাপ্তি নয়। সবচেয়ে বড় কথা, সাহিত্যের এই যাত্রায় তাঁরা আমাদের সঙ্গী।

সুখপাঠ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন আগাম অনেকে বলেছিলেন, এই পত্রিকায় নবীনদের স্থান হবে না বোধহয়। আমাদের যেহেতু এমন অভিপ্রায় ছিল না তাই এমন আশঙ্কাও ছিল না। বরং পাঠকরা একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, সুখপাঠের প্রতি সংখ্যাতেই বিভিন্ন বিভাগে নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে। আরও যাবে। আমরা নতুন চিন্তার আগমনে বিশ্বাসী। সেইসঙ্গে বিশ্বাসী প্রাচীন গভীর চিন্তার পুনরুদ্ধারেও। যা ভাবতে শেখায়। যে চিন্তা বিষণ্নতার পথ আটকে দাঁড়ায়।

এই সংখ্যায় কপিরাইট বা সৃষ্টির স্বত্ব নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। মনে হতে পারে, এ তো স্রষ্টার নিজস্ব বিষয়। যিনি শিল্প উপভোগ করবেন বিষয়টি তো তার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। প্রত্যক্ষে নয়। কিন্তু মনে রাখা ভাল, কোনও শিল্পকর্ম প্রকাশ্যে আসার পর তা আর শুধু স্রষ্টার থাকে না। পাঠক, দর্শক, শ্রোতা, অনুভবী যে কেউ নিজেও তার একটি অংশ হয়ে ওঠেন। এখানে গুরুত্ব সেই ভাবনার যা ক্রমশ বিস্তারকে অনুসরণ করছে।

সুখপাঠ শারদ সংখ্যার পর আবার নিয়মিত হিসেবে এই পঞ্চম সংখ্যাটি প্রকাশিত হল। প্রবন্ধ ছাড়াও অন্য সমস্ত নিয়মিত বিভাগ যথাস্থানেই রয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জীবনী অবলম্বনে একটি নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস এই সংখ্যা থেকেই শুরু হল।

এই হেমন্তে আমরা ঝরে পড়া পাতার দিকে তাকাব না। থাকব নতুন পাতার অপেক্ষায়।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক