বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

গভীর স্পর্শের দিকে

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষ কি একা? যে প্রাণপ্রবাহ পৃথিবীতে বয়ে চলেছে অবিরল, তার বাইরে অন্য কোথাও কি অন্য কোনও প্রাণের অস্তিত্ব আছে? সংশয় ও কৌতূহল দুই-ই বর্তমান তবে তার নিবৃত্তি ঘটেনি এখনও। ফলে অন্তত মানুষকে ভেবে নিতে হয় যে সে একা এবং একক। মানুষ ভাবতে পারে তাই ভাবে। প্রশ্নটায় দার্শনিক ছোঁয়া আছে। ততদূর কেউ নাও যেতে পারেন। বরং এটা ভেবে নেওয়া সহজ, আপাতত যে বস্তুজগতের ভেতরে আমাদের বসবাস সেখানে আর মানুষ একা কোথায়। আমরা কত মানুষ তো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েই আছি। পাশাপাশি রয়েছি, মেলামেশা চলছে। মানুষ মানুষের সঙ্গেই থাকবে এ আর বড় কথা কী। প্রশ্ন এবং উত্তর যতটা সহজ, বিষয়টি আদতে তত সরল নয়। কেননা একইসঙ্গে রয়েছে বিচ্ছিন্নতাও। মানুষ পারস্পরিকভাবে কতটা যুক্ত আর কতটা বিচ্ছিন্ন, এই আধুনিক পৃথিবীতে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, উঠছে।

ইদানীং একটি অসুখ বিচ্ছিন্নতার অসুখ বলে চিহ্নিত হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হয়ে চলেছে। মেলামেশার উপায় যেন রুদ্ধ থাকে। প্রাণের খাতিরে মানুষ তা মেনেও নিয়েছে। তবে তা নিশ্ছিদ্র নয়। একমাত্র কারণও নয়। ফলে অসুখ রয়েছে ছড়িয়ে। যদিও সাবধানের মার নেই ভেবে নিয়েই সব দিক সামাল দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু আমরা তো বিচ্ছিন্ন থাকতে চাই না। হেসে নাও এ দুদিন বই তো নয়, কথাটির মর্মার্থ আমাদের হজম হয়ে গিয়েছে। আমরা হাসতেই চাই। তাই যেন ব্যাপারটা এইরকম যে, অসুখ এসে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, নইলে তো আমরা চিরকাল সখ্য-অনুরাগীই ছিলাম। এখন অসুখটা গেলেই বাঁচি। বিচ্ছিন্নতা ছাড়াও এই অসুখের অন্য অনেক প্রভাব আছড়ে পড়েছে আমাদের সামাজিক জীবনে। তবে এটা ভাবা দরকার, আমাদের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা আসলে এই অসুখের জন্য কিনা। না কি বিচ্ছিন্নতাই অসুখ? আমরা কি সত্যিই সঙ্গাভিলাষী? তাহলে দুনিয়া জুড়ে মানুষে মানুষে এত সংঘর্ষ কীসের!

আমাদের উঠোন উঠে গিয়েছে। তবে এখন তো বিশ্বজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ার উঠোন পাতা। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের সেখানে নিত্য আনাগোনা। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এখন আমাদের অভ্যেস। সেটিকে আমরা যোগাযোগের পরম মাধ্যম বলে বেছে নিয়েছি। তবে ভাবা যেতে পারে যে সেখানে ‘আমি’-ই সব নয় তো? তা যদি হয় তাহলে ‘আমার’ সঙ্গে আর আছে কে? যোগাযোগের আড়ালে, নিজের কথা বলে যাওয়ার তাড়নায় ‘আমরা’ বিচ্ছিন্ন নই তো? যেখানে স্পর্শ আছে, গভীরতা নেই। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী’ মনে থাকলে তার ব্যাঙের আধুলিটির কথাও মনে পড়ে যেতে পারে। সেই আধুলিটিই ছিল ব্যাঙের সম্বল। দুঃখ এই যে ব্যাঙের কথা কেউ বুঝতে পারত না। বিচ্ছিন্নতার অসুখ বাইরে থেকে আসে না। ভাল থাকার জন্য অনেক কিছু আছে আমাদের। সুচিন্তার নিরবচ্ছিন্ন স্রোত আছে। তাকে হেলা না করাই ভাল।

আমাদের দুই সুচিন্তক, আমাদের পরিজন ও গর্ব চলে গিয়েছেন সম্প্রতি। কবি ও চলচ্চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এবং অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। সাম্প্রতিক সময় আমাদের কাছ থেকে এমন অনেককেই সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে যাঁদের অভাব আমাদের সময়ের শূন্যতাকেই মনে করিয়ে দেবে বার বার। এই দু’জনও তেমনই মানুষ। ‘সুখপাঠ’ এবারের সংখ্যায় এঁদের অনবদ্য কৃত্য স্মরণ করতে চেয়েছে।

‘সুখপাঠ’ দ্বিতীয় বছরে পৌঁছল। দ্বিতীয় বছরের এই প্রথম সংখ্যা। ডিজিটাল বা অনলাইন, যাই বলা হোক না কেন, পূর্ণাঙ্গ একটি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে ‘সুখপাঠ’ নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চেয়েছিল। পাঠক সাহচর্যে আমরা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হইনি, এই আমাদের পাথেয়। বিচ্ছিন্নতা নয়, গভীর স্পর্শই আমাদের লক্ষ্য।

অরিন্দম বসু,
সম্পাদক