বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

সাহিত্যের বারোমাস

‘সুখপাঠ’ দ্বাদশ সংখ্যা প্রকাশিত হল এই বার। গতবছর জুলাই মাসে এক অসুখের ভেতরেই ‘সুখপাঠ’ আরম্ভ হয়েছিল। সে অসুখ এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি। বরং তা এখন গভীরতর। তবে আমাদের পত্রিকা অটুট থেকেছে এই বারো মাসের লেখক-পাঠক সমাহারে।

সময়ের বিচারে বলতে গেলে একটি মাসিক অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে ‘সুখপাঠ’ নেহাতই অর্বাচীন। তার কপালে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী নেই। ‘কপাল’ কিংবা ‘ভবিষ্যদ্বাণী’-তে বিশ্বাসও নেই তার। একটি পথ তৈরি করে নেওয়ায় বিশ্বাস আছে। সে পথ এখনও পর্যন্ত কেমন তা বলতে পারবেন আমাদের পাঠকরাই। তাঁদের ওপরেও আমাদের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ আছে।

এই সমস্ত কিছুর ওপর যদিও প্রলম্বিত অসুখের ছায়া। শরীর ও মনকে সে ধস্ত করছে নিয়ত। অনেক প্রিয়জনকে আমাদের হাত ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে এই সময়ের মধ্যে। সেই ক্ষতে প্রলেপ পড়েনি। শিল্পের সৃষ্টিও তাতে ব্যাহত হয়েছে, তবে তা থেমে যায়নি। সৃষ্টিও হয়তো কোনও পথের সন্ধানী যা সময় পেরিয়ে উদ্ভাসিত হবে। ‘সুখপাঠ’ একটি সন্ধ্যাপ্রদীপ হাতে চলতে চেয়েছে। দিনের পথিক তাকে যেন মনে রাখে।

পত্রিকার এবারের প্রচ্ছদে এক বৃক্ষের ছবি আছে। কল্পবৃক্ষ। আমরা বৃক্ষের শুশ্রূষা চাই কিন্তু তাকে যত্নে রাখায় আমাদের বড়ই অনীহা। এমনকি নটেগাছটি মুড়োলেও যে গল্প ফুরোয় তাও আমরা মনে রাখি না। গাছ, আলো, বায়ু, যা আমাদের সম্বল, মানুষ তাদের ওপরেই মূর্তিমান উৎপাত হয়ে উঠেছে। অমৃত নষ্ট হয়ে এই গ্রহ এখন বিষে নীলকণ্ঠ। পৃথিবীর যতেক প্রাণ বিপন্ন হয়ে উঠেছে, মানুষ তো বটেই। তার হাতেই তৈরি হয়েছে এই বিপন্নতা। তবু হুঁশ ফেরে না। রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য আর উপভোগের দুনিয়ার নানা কূট অঙ্ক যেভাবে তাবৎ বিশ্বে ক্রিয়াশীল তাতে একটি গাছের চারা পুঁতলেই পরিবেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠবে এমন সরল সমীকরণে আর আস্থা রাখা যাচ্ছে না।

এই যে অসুখ আমাদের এত ভয় দেখাচ্ছে তা আসার পরে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সমস্ত স্বাভাবিকতাকে যখন রুদ্ধ করা হল তখন বলা হচ্ছিল, এর ফলে একটা ঘটনা ঘটেছে, পরিবেশ যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে, স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ মেয়াদে কিন্তু তেমন কথার অবশেষটুকুও শোনা যাচ্ছে না। কারণ আসলে তা হল আত্মপ্রবঞ্চনার এক রূপ। পরিবেশ সজীব থাকলে মানুষও সজীব থাকবে আর সকলের মতোই। তবে তার জন্য সজাগ থাকা প্রয়োজন। সাহিত্য এসব কথা বলে। বলে চলেছে। পরিবেশের বিপন্নতা বার বারই সাহিত্যের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাতে পরিবেশ কিংবা সমাজ বদলে যাবে এমন আশা কেউ রাখে না। তবে সত্য এই যে সাহিত্য এসব বলতে দ্বিধা করেনি। শিল্প সৃষ্টির ভেতরে এই কাজও জাগরূক হয়ে থেকেছে। ‘সুখপাঠ’ তারই অংশ। এবারের সংখ্যার প্রবন্ধে রয়েছে তারই দিগদর্শন।

‘সুখপাঠ’ বারোটি মাস পেরিয়েছে। গড়ে তুলতে চেয়েছে সাহিত্যের পরিবেশ। আগামী সংখ্যা থেকে তার দ্বিতীয় বছরের চলা শুরু হবে। সেই প্রতিবেশে আমরা পাঠকের সঙ্গ লাভের প্রত্যাশী।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক