বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

চৈত্র পেরিয়ে

এই সময়ে একখানি বইয়ের খুব কদর হয়। এই চৈত্র মাসে। তা হল পঞ্জিকা। বাঙালির সারাবছরের নিত্যদিনের হিসেব চলে ইংরেজি হিসেবে। কোনওদিন বাংলা তারিখ জানতে চাইলে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। প্রয়োজন পড়ে না তাই মনেও থাকে না। খবরের কাগজে বা কোনও পত্রপত্রিকার প্রথম পাতায় বাংলা মাস ও দিন ছাপা থাকে। তা দেখে ভুলে যাওয়াই বাধ্যতা। এখনও পর্যন্ত তিনটি বাংলা দিন বাঙালি মনে রাখতে পারে। পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ। অবশ্য গড় বাঙালিকে এমন বলা ভুল হচ্ছে। কেননা বাংলার গ্রামে মুখে মুখে, পুজো-পার্বণে, আচার-বিচারে দিনক্ষণের হিসেবে বাংলা তারিখ চালু আছে। পঞ্জিকা থাকলেও আছে। না থাকলেও আছে। তবে হ্যাঁ, বৈশাখে বাংলা নতুন বছর এসে পড়ার আগে পঞ্জিকা এসে পড়ে। গোটা বছরটা কাজে লাগে তিথিনক্ষত্রের সন্ধান পেতে।

গেল বছর বাংলা চৈত্র এবং বৈশাখ মাস কেমন ছিল তা ভুলে যাওয়া কঠিন। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসুখের স্মৃতি। সেই দহনবেলার ছায়া এখনও মুছে যায়নি। তারমধ্যেই চতুর্দিক এখন উন্মোচিত। এইসব টানাপোড়েনের ভেতরেও দোল রঙিন হওয়ার চেষ্টায় ছিল। চড়ক ও গাজন কেমন থাকবে তা ক্রমশ প্রকাশ্য। বৈশাখ এসে পড়লে ঘর্মাক্ত জনসমাগম রোধিবে কে। পঞ্জিকা আছে, উৎসব আছে, হুজুগও আছে। বাঙালি জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সবই। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে বলেই ধরে নেওয়া হয়। তার মেয়াদ কতদূর প্রশস্ত তা নিয়ে আর কে ভাবিত থাকেন।

লৌকিক প্রথা ও বিশ্বাস এবং সংস্কৃতি স্রোতের মতো। সেখানে তরঙ্গের ওঠানামাও আছে। তার পরিমার্জিত বা পরিশীলিত চেহারাছবির দরকার হয় না। ধর্মাধর্মের ভেদাভেদও টেকে না। বাঙালির ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সঙ্গীত নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছু ইতিহাস ও ভূগোলের প্রয়োজন পড়ে। ভাষা কোনও জাতির জীবনীশক্তির প্রমাণ। রকমফের থাকতেই পারে, তবুও ভাষাই তাকে চেনায়। যদিও নেহাত মুখের বুলিটুকু সম্বল করে তার পরিচয় টিকে থাকতে পারে কিন্তু চর্চার অন্য অনেক দিকে শান না পড়লে তাও ভোঁতা হয়ে যেতে থাকে। আমরা ঐতিহ্যের কথা বলি বটে কিন্তু মনের গভীরে তার শিকড় আলগা হয়ে গেছে কিনা সে খোঁজ রাখি না। জীবনচর্চায় তার ব্যবহার নিয়েও আমরা উদাসীন। এ তো মাত্র একটা মাস কিংবা দিনের সাহচর্যে কাটিয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয়।

কোনও তৃতীয় নয়নের দরকার পড়বে না। দুই চোখের সাদাদৃষ্টিতেই বোঝা যাবে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পের নানা ধরন চলমান রয়েছে বটে কিন্তু প্রায়শই তার বকচ্ছপ চেহারাটি ফুটে উঠছে। আন্তর্জাতিক কিংবা বিশ্বায়িত হতে কোনও বাধা নেই। তবে শিকড় আলগা হয়ে ভুঁইফোঁড় হয়ে যাওয়াও কোনও কাজের কথা নয়। অনুভূতি বিশ্লেষণের সহায়ক। জীবনে, সমাজে, চারপাশে, এই দেশ, এই বিশ্বে যা ঘটে চলেছে তার বিশ্লেষণের। অনুভূতি নড়বড়ে হতে থাকলে বোধ অলস হয়ে যায়। বৈশাখে পৌঁছতে গেলে চৈত্র পেরোতেই হবে। মনে রাখা ভাল, যে পথে দহন থাকে, সেই যাত্রাপথে নতুনের আহ্বান আছে। মন জেগে থাকলে সংস্কৃতি জেগে থাকে।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক