বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

তবু অনন্ত জাগে

অসুখবিসুখ নিয়ে কথা শুনতে মানুষজন বিশেষ পছন্দ করেন না। অথচ তা নিয়ে কথা বলতে চান এরকম লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বিষয়টি পরস্পরবিরোধী বটে, তবে তা সত্য। অসুখ আর অ-সুখের মধ্যে ফারাক আছে। প্রথমটি এলে দ্বিতীয়টি আসেই কিন্তু দ্বিতীয়টি তার অর্থের তাৎপর্যে প্রথমটির দিকে যায় না। মানুষ স্বভাবতই এই দুটিকেই এড়িয়ে যেতে চায়। পারে না অবশ্য। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এইসবেই তাকে জড়িয়ে থাকতে হয়।

যে সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি সেখানে অসুখ এবং অ-সুখ, দুই-ই কাঁটা হয়ে আমাদের বিঁধছে। শরীরে ও মনে। এরমধ্যেই ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। গোটা পৃথিবীতেই। প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর এবার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় প্রহর গোনা শুরু হয়েছে। ভয়ের ভ্রূকুটি বিরাজমান। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ঋণী থেকে ‘এখন আমার কোনও অসুখ নেই’ কিংবা ‘এখন জীবন অনেক বেশি সতেজ স্বাস্থ্যে ভরা’ বলতে পারলে হত। তবে তা বলতে গেলে বাধবে। কারণ তা সম্ভবত জুক্সটাপোজিশন। তার মধ্যেই বেঁচে থাকার আয়োজন। এই আয়োজনের ভেতরে সাহিত্যকে বাদ রাখা যায় কী করে। সে তো জীবনেরই এক দিক।

অসুখ বা তার উপস্থিতি, জীবনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে বিবিধ সাহিত্যকর্ম হয়েছে। মারী ও মড়ক নিয়েও লেখা হয়েছে বেশ। বিশ্বসাহিত্য দেখলে সেখানে পাওয়া যাবে ড্যানিয়েল ডিফো-র ‘আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’, আলেসান্দ্রো মানজোনির ‘দ্য বেট্রোথেড’, জ্যাক লন্ডনের ‘দ্য স্কার্লেট প্লেগ’, গাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’, আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’, হোসে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস’, ওরহান পামুকের ‘নাইটস অব প্লেগ’। এসবই স্মর্তব্য। অনেক লেখাতেই অসুখের আড়াল আছে। সেই আড়ালে অন্য অনেক উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত কথা রয়ে গেছে।

বাংলা ভাষায় ঠিক তেমনই কিছু চোখে না পড়লেও সাহিত্যে যে তার উল্লেখ আছে তা বলা যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’-এ মহামারীর বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালে এদেশে কলেরা ও প্লেগের মহামারী হয়েছিল, বসন্তেরও। কিছু ক্ষেত্রে তা শুধু মহামারী নয়, অতিমহামারীও। ‘চতুরঙ্গ’-এ তার উল্লেখ আছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট্ট মেয়ে মারা গিয়েছিল প্লেগেই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘ম্যালেরিয়া-প্লেগ-দুর্ভিক্ষ কেবল উপলক্ষমাত্র, তাহারা বাহ্যলক্ষণমাত্র-- মূল ব্যাধি দেশের মজ্জার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। আমরা এতদিন এক ভাবে চলিয়া আসিতেছিলাম-- আমাদের হাটে বাটে গ্রামে পল্লীতে আমরা এক ভাবে বাঁচিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলাম, আমাদের সে ব্যবস্থা বহুকালের পুরাতন। তাহার পরে আজ বাহিরের সংঘাতে আমাদের অবস্থান্তর ঘটিয়াছে। এই নূতন অবস্থার সহিত এখনো আমরা সম্পূর্ণ আপস করিয়া লইতে পারি নাই; এক জায়গায় মিলাইয়া লইতে গিয়া আর-এক জায়গায় অঘটন ঘটিতেছে। যদি এই নূতনের সহিত আমরা কোনোদিন সামঞ্জস্য করিয়া লইতে না পারি তবে আমাদিগকে মরিতেই হইবে।’’ এ কথা কি আজ ঠিক এই পরিস্থিতিতেও সমান সত্য বলে মনে হয় না?

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পণ্ডিতমশাই’ এবং ‘শ্রীকান্ত’-র দ্বিতীয় পর্বে রেঙ্গুনে প্লেগের উল্লেখ রয়েছে। মহামারী হিসেবেই রয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ধাত্রীদেবতা’ এবং ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে কলেরা মহামারীর কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে পড়বে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’-এও এমন বর্ণনা রয়েছে। আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে। বনফুলের ‘জঙ্গম’ উপন্যাসে বলা হয়েছে কলেরা মহামারীর কথা। আরও পরে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভারতবর্ষ’ উপন্যাসে পেয়ে যাই এক কাল্পনিক আখ্যান। যখন অজানা এক মড়কে নিমজ্জিত আমাদের দেশ। তা ঘটছে ভবিষ্যতের ভারতবর্ষে।

এসব বলার কারণ এই, যে মহামারীর সামনে আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি, অন্য কোনও মহামারী তার মতো এত সর্বব্যাপী হয়নি এযাবৎ। সাহিত্য সময়ের কথা বলে। আবার সময় ছাপিয়ে জীবনের উত্তরণের কথাও বলে। সাহিত্য দেখাতে চায় বিপর্যয় থেকে মানুষ কীভাবে ফিরে আসে। এখন এই প্রবল অসুখের সময়েও তা নিয়ে লেখা হয়ে চলেছে। লেখকরা নিশ্চয়ই লিপিবদ্ধ করে রাখতে চাইছেন এই সময়ের কথা। সবই এখনই প্রকাশ্য নয় নিশ্চয়। তবে তা উচ্চারিত হবে। সেখানে ধরা থাকবে এই পৃথিবীর অদ্ভুত এক সময়। মানুষ কীভাবে পরিত্রাণ পেয়েছিল তাও বিধৃত থাকবে অবশ্যই। ক্রমশ তা ইতিহাস হয়ে উঠবে। প্রমাণ থাকবে যে লেখকরা কিছু ভুলে যাননি। আর তার মধ্যে সেই কথাটিই সত্য হয়ে জেগে থাকবে। ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।’

অরিন্দম বসু,
সম্পাদক