বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

আবহমানতায় ও ব্যতিক্রমে

পৃথিবী তার মতো করে যেমন ঘোরে তেমনই ঘুরে চলেছে। দিন, মাস, বছর বদলে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে ঋতু। এদেশে থাকার ফলে আমরা ছ’টি ঋতুই দেখতে পাই, বুঝতে পারি। প্রকৃতির কাছ থেকে এ আমাদের প্রাপ্তি। শরৎকাল এলেই আকাশের রং বদলে যেতে থাকে। মন উড়ুউড়ু হয়ে যায়। শরতের সঙ্গে বাঙালি তার সবচেয়ে বড় উৎসবকে জুড়ে নিয়ে তাকে শারদোৎসব করে নিয়েছে। দুর্গাপুজো কবেই নাটমন্দিরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে বারোয়ারির চেহারায়।

উৎসব হলে আনন্দ হওয়ার কথা। গতবছর সেই আনন্দে বাধ সেধেছে অসুখ। এই বছরেও তার ছায়া দীর্ঘ হয়ে রয়েছে। আপাতত সেই অসুখ আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন শুধু যে ব্যাহত করেছে তাই নয়, সেখান থেকে জন্ম নিয়েছে বিষাদ। তা কেবলমাত্র আমাদের দেশেই ঘটেনি। প্রায় দু’বছর এই গ্রহটি সেই অসুখের অভিঘাতে বিপর্যস্ত। অসুস্থতা চলছে, মৃত্যু ঘটেছে বহু, মানুষের রুজি-রোজগারে টান পড়েছে, বেঁচে থাকার উপায় সংকটে পরিণত হয়েছে। এহেন অবস্থায় আনন্দ কি প্রসারিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখে? প্রতিবেশী যদি বিপন্ন থাকে, বিষণ্ণ থাকে তাহলে তার পাশের জন আনন্দের কোন উৎসে নিজেকে প্লাবিত করতে পারে?

আমরা চাই ভাল থাকতে। এমন এক পৃথিবীতে থাকতে যেখানে প্রকৃতি নির্মল, অন্ন সংগ্রহ সহজ, যেখানে যুদ্ধ নেই, ধর্মের সংঘর্ষ নেই, মানুষে মানুষে রেষারেষি নেই। আসলে আমরা সেই আবাসভূমি চাই যা সতত কাল্পনিক। যা নিছকই স্বপ্ন। পৃথিবী যে এমন হবে না তা আমরা এতদিনে জেনে গিয়েছি। তবে একটু মানিয়ে-গুছিয়ে থেকে যাওয়াটা হয়তো কঠিন ছিল না। মানুষ সেদিকেও যায়নি।

মানুষের অন্তর থেকে উৎসারিত শিল্প কিন্তু এসব কথাই বলতে চেয়েছে নানাভাবে, নানা প্রকরণে। বিশেষ করে সাহিত্য তো তা ব্যক্ত করতে চেয়েছেই। বহুযুগ পার করে প্রাথমিক সেই অনুভূতির অবলম্বনেই তার বিবর্তনও ঘটেছে অবশ্য। সেখানে শিল্পসম্মত হয়ে ওঠা অন্যতম শর্ত। সময়ের কাছ থেকে সেই সুযোগ নিয়েছে সে।

বিশ্বসাহিত্যের পটভূমিকায় বিষয়টি হয়তো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেখাবে, তবে এও তো ঠিক যে বাঙালির একটি উৎসবকে ঘিরে সাহিত্যের ফসল ফলে। সময়ের হিসেব করলে তাকে নেহাত অর্বাচীন বলতে হবে। তবে এমন দৃষ্টান্ত আর কোথাও তেমন নেই বললেই চলে। মনে হতে পারে, এত সাহিত্য শুধু এই সময়েই ভরপুর হয়ে ওঠে! তা বোধহয় নয়। ভাবনা তো একটি বিশেষ সময়েই জেগে ওঠে না। তা আবর্তিত হতে থাকে। এই সময়ে সে পরিকল্পিত মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যদিও এ কথা বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, সব ফসল সবসময় উৎকৃষ্ট হয়ে ওঠে না। পুষ্ট ধান পেতে গেলে ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজটি চালিয়ে যেতে হয়। এই ঝাড়াই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ায় বিশ্বাস রাখে ‘সুখপাঠ’।

অধুনা যে ঘটনাটি ঘটছে সেখানে দেখা যাচ্ছে, মুদ্রিত মাধ্যমের পাশাপাশি ওয়েব মাধ্যমেও সাহিত্য সম্প্রসারিত। শারদ সাহিত্যেও তা অগম্য নয়। ‘সুখপাঠ’ এ বছরও তার শারদ সংখ্যা প্রকাশ করল। শুধুমাত্র আরও একটি সংযোজন হিসেবে আখ্যা পাওয়ার লক্ষ্য নেই তার। সাহিত্যের খামার তৈরিও তার উদ্দেশ্য নয়। জীবনের যে আনন্দ, বিষাদ, অনুভূতি, সহমর্মিতা, সূক্ষ্মতা, ভাবনার আন্দোলনের কথা সাহিত্য চিরকাল বলে আসছে সেই আবহমানতা এবং সেই ব্যতিক্রমের সঙ্গে থাকাই তার কাম্য। পৃথিবীর তাবৎ অসুখ ও নিরাময়তায় ‘সুখপাঠ’ সমদর্শী হতে চায়।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক