বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

সম্পাদকীয়

উৎসবের ভাবনা

সময়ের এক অদ্ভুত ফেরে রয়েছি আমরা। মারি নিয়ে ঘর করতে হচ্ছে নিত্যদিন। সকাল-বিকেল আক্রান্ত, মৃত ও সুস্থ হয়ে ওঠার নৈমিত্তিক হিসেব দেখে যোগ-বিয়োগ করেও হাতে আপাতত পেন্সিল ছাড়া কিছুই থাকছে না। অনেকেই টিকার অপেক্ষায় রয়েছেন, যদি তা জয়টিকা হয়ে ওঠে, এই আশায়। এর মধ্যে প্রকাশ্যে বা গোপনে বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। চলাফেরা, মেলামেশা, কাজকর্মেও বেড়ি পড়েছে। এই সময়ের পিঠে একটি ছাপ মেরে তাকে কালপ্রবাহের হাতেই উৎসর্গ করে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। তাবৎ বিশ্বেই চলছে। আমরাও তার বাইরে নেই। স্বাভাবিক অবস্থার এই হেরফেরকে নয়া নামে ডাকলেই যেন মেনে নেওয়ার এবং মানিয়ে নেওয়ার কাজটি সহজেই সমাধা হয়ে যাবে। যেন অনেক সমীকরণ মিলে যাবে। যদিও ভাগশেষ হিসেবে সব ক্ষেত্রেই যে গোটা মানুষ পাওয়া যায় তা নয়। অঙ্ক কষায় ভুল থাকতে পারে। আবার অঙ্কটাতেই ভুল থাকতে পারে। আগ্রহীদের তখন শেষের পাতায় অনুশীলনী দেখতে হয়।

প্রকৃতি এসব বোঝে না। এবংবিধ অবস্থার মধ্যেই তার রূপান্তর ঘটে চলেছে। মানুষের হাতে নাকাল হয়ে তার হেনস্থা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঋতুবদলের সাক্ষী থাকছি আপাতত। শরৎ এসেছে। হিসেবে একটু এদিক ওদিক হলেও পুজোও এসেছে। অনেকেরই এবারের সবচেয়ে বড় চিন্তা পুজো কেমন কাটবে। আলোয় ঝলমল করে উঠবে চারদিক? রাস্তাঘাটে, মণ্ডপে ভিড় জমবে? আনন্দের অভাবে মাটি হবে না তো সব? সম্বৎসরের এই একটি উৎসবই তো সবচেয়ে বড়।

তবে প্রশ্ন আরও আছে। এই সময়ের ফেরে পড়েই তো অনেকে কাজ হারিয়েছেন। বেঁচে থাকার জন্য, সংসার চালানোর জন্য কুটো আঁকড়ে ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। উৎসবকে ঘিরে যাদের রুজিরোজগার, তাদেরও অনেকে বেহাল। অর্থনীতির বিশ্লেষণ তারা না বুঝলেও অর্থের অর্থ বোঝেন। বাজারের হালও বোঝেন। উৎসব তাদের জন্য কতটুকু?

এই সময়ের জন্য প্রশ্ন আছে আরও। অনিয়ম করলে অসুখ হয়। তবে অসুখ হওয়ার পরে নিয়ম মানার ধুম তুললেও কাজ হয় কি? বেলাগাম কলরোলে বেসামাল হয়ে যাওয়া কোনও কাজের কথা নয়। সাবধানবাণী মানলে তবেই তার সাথর্কতা। নয় তো তা কেবল ঘোষণামাত্র। উৎসব বেপরোয়া হলে বিশৃঙ্খলা হয়।

দুর্গাপুজো মাতৃশক্তির আরাধনা বলে জ্ঞাত। আমরা তাকে উৎসবের চেহারা দিই বটে কিন্তু কন্যা, জায়া, জননীর সম্মান দেওয়ার প্রেরণা সেখান থেকে আসে বলে প্রত্যয় হবে এমন সামাজিক ঘটনার প্রমাণ নেই। উৎসবে আলো জ্বললেই অন্ধকার ঘোচে না।

তবে কি উৎসব হবে না? হোক না। ভাবনায় হোক। এই কঠিন সময়ের ঢেউয়ের মাথায় চড়তে হয়েছে অনেককেই। এই সময় আমাদের শেখাতে চাইছে, শুধু আপনি কোপনি বাঁচলেই হয় না। তুমি যদি কারও প্রতিবেশী হও তাহলে সেও তাই। এ কথা অবশ্য চিরকালীন। এই সময় তা আমাদের বেশি করে মনে করিয়ে দিতে চাইছে। সাহিত্যও সেকথাই বলে। সব সাহিত্য নয় অবশ্য। তবুও অনেক ক্ষেত্রেই চেষ্টা থাকে। ভাবনার সার্থকতার সেও এক অবয়ব। আনন্দের উৎস মন। আর মন অন্নময় হলেও তার সূক্ষ্মাংশে তৈরি হয় ভাবনার পরিসর। এই ঋতুতে সুখপাঠ তার সাহিত্যের পাতায় সেই চেষ্টাটুকুই করতে চায়।

অরিন্দম বসু, সম্পাদক