বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১১

বুদ্ধদেব গুহ

আমরা আরও কিছুক্ষণ বসে থাকলাম শিলাখণ্ডে। আস্তে আস্তে রোদ প্রখর হচ্ছিল। আমি বললাম, চলো এবার ফিরে যাই। ফিরতেও তো আধ ঘণ্টা লাগবে।
চিকন বলল, চলুন।
মিনিট পনেরো পরে আমরা সেই শিলাখণ্ড ছেড়ে উঠে জোরান্ডা বাংলোর দিকে এগোলাম। সামনে একটা খুব উঁচু গাছ দেখিয়ে চিকন বলল, এটা কী গাছ?
আমি বললাম, কনকচাঁপা। তুমি কি জানো, ভারতীয় জঙ্গলের সবচেয়ে উঁচু গাছ এই কনকচাঁপা।
ছোটবেলায় কবিতা পড়েছিলাম, বাঁশবনের কাছে, ভুঁড়ো শেয়ালি নাচে, তার মাথায় কনকচাঁপা… আরও কীসব ছিল, ভুলে গেছি।
হ্যাঁ। এই সেই কনকচাঁপা। ঋতু শান্তিনিকেতনে বাড়ি করার পরে বাড়ির পাশে একটি কনকচাঁপা গাছ লাগিয়েছিল। ও এসব বনের খবর বিশেষ রাখত না, কনকচাঁপা ওর ভাল লাগত বলেই লাগিয়েছিল। কিন্তু গাছটা এত বড় হয়ে গেল যে তার শিকড় বাড়ি ফাটিয়ে দেওয়ার উপক্রম করল। তবে ও থাকতে থাকতে আমি কিছু করিনি। ও চলে যাওয়ার পরে, সেও প্রায় দশ বছর হতে চলল, গাছটা কেটে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম বাড়ি বাঁচানোর জন্য। দুঃখ হয়েছিল খুব, ওর নিজের হাতে লাগানো গাছ। কিন্তু বাড়িটা বাঁচানোর জন্য আর কোনও উপায় ছিল না। তারপরে আমি একটা কাঁঠালিচাঁপা গাছ লাগিয়েছিলাম। সেটায় এখন ফুল আসছে। আমার বাড়ির পাশেই ছিল লীলাদির বাড়ি।
কে লীলাদি?

লীলাদি মানে লীলা মজুমদার। বিখ্যাত লেখিকা। সত্যজিৎ রায়ের পিসি। লীলাদির বাড়িতে একটি প্রকাণ্ড নাগকেশরের গাছ ছিল। নাগকেশরের ফুলের যা গন্ধ, সে সুবাস তুমি নিজে গ্রহণ না করলে জানবে না। সে গাছের একটি ডাল আমার বাড়ির ওপর চলে এসেছিল। সেই ফুলের গন্ধ সমস্ত পাড়া আমোদিত করে রাখত। তবে আমি ওঁর বাড়ির পাশে জমি কেনার পরে লীলাদি আমায় অনেকবার চিঠি লিখেছিলেন, বুদ্ধদেব, তুমি কি আমি থাকতে থাকতে আমার পড়শি হবে না? বাড়িটা কবে করবে? তখন আমি পেশার কাজে বড় ব্যস্ত। দিল্লি-বম্বে করে বেড়াই। বাড়ি করতে চার-পাঁচ বছর লেগে গেল। সত্যিই যখন আমার বাড়ির কাজ শেষ হল, লীলাদি আর শান্তিনিকেতনে আসতেই পারলেন না। কলকাতার বাড়িতে পড়ে গিয়ে হাঁটু ও কোমরে এত চোট পেলেন যে ওঁর পক্ষে আর যাওয়াই সম্ভব হল না। লীলাদির এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে রঞ্জন দাঁতের ডাক্তার। মেয়ে কমলা। দীর্ঘাঙ্গী, ভারি সুন্দরী মেয়ে। কমলার স্বামী ছিল মনীষী। সম্ভবত সে ইন্ডিয়ান অয়েলের বড় অফিসার ছিল। ক্যালকাটা ক্লাবের মেম্বার হওয়ার পরেই তখনকার প্রেসিডেন্ট ডক্টর অমিতাভ রায়, যিনি খুব সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ ছিলেন, আমায় বললেন, বুদ্ধদেব, ক্লাব থেকে চিরকুমার সভা করব। অক্ষয়ের রোলে গান গাওয়ার লোক ছিল না। এবার তোমায় নিয়ে করব। আমি বললাম করুন। রিহার্সাল শুরু হল। সেক্রেটারি খোকাদার কোয়ার্টারে রিহার্সাল হত। তার পরে অমিতাভ রায়ের বাড়িতেই হত। সে সময়ে কমলা, মনীষী ক্লাবে আসত, দেখা হত। মনীষী অনেকদিন আগে চলে গেছে। কমলাও আর নেই। ওরাও ব্রাহ্ম ছিল। রঞ্জন এখনও আছে কিন্তু ওর শরীর ভাল নেই। তবে রঞ্জন ও কলকাতার সন্তোষের মহারাজার মেজছেলে বাচ্চু, ওরা দুজনেই শান্তিনিকেতনে আসত, বিশেষ করে বর্ষাকালে। বাচ্চু বলত, শান্তিনিকেতনের মতো ঘুমোনোর আর মদ খাওয়ার জায়গা আর নেই। আমায় বলত, তুই বাড়িটা কর তাড়াতাড়ি। বাচ্চুও চলে গেছে। বাচ্চুর ছোটভাই ছিল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে আমার সহপাঠী। সে আরও আগেই চলে গেছে।
আমরা বাংলোর দিকে ফিরতে ফিরতে চিকন বলল, দুপুরে কী খাওয়া হবে?
তুমি সঙ্গে আছ, তুমি যা বলবে, যা করবে, তাই খাব।
এখন তো আমের সময়। হাতিরা এত আম খাচ্ছে, আমরাও আম খাই চলুন।
এ আম তুমি খেতে পারবে না। জংলি আমি। খুব টক।
তাহলে আমের টক তো হতে পারে?
তা হবে।
তাহলে আমের টক করব, আমডাল করতে পারি।
তুমি যা খাওয়াবে তাই খাব। আর আমাদের এঁচোড়ের স্টক তো আছে।
আপনি বুঝি এঁচোড় খেতে খুব ভালবাসেন?
আমি তো এঁচোড়ে পাকা, তাই এঁচোড়ে আমার খুব ভক্তি।
চলুন বাংলোয়। দেখি, কী খাওয়ানো যায় আপনাকে।

বাংলোয় ফিরে চিকন অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল। আমি বাইরের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে জোরান্ডা প্রপাতের শব্দ শুনতে লাগলাম আর কনটেমপ্লেশন করতে লাগলাম। একা থাকলেই তো কনটেমপ্লেশন। আলাদা কিছু আর দরকার হয় না। চিকনের সাবান মাখা গা-ধোয়া জল নর্দমা দিয়ে বাইরে যাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়েই চিকনের স্নানরতা, সিক্তা এবং নগ্নিকা মূর্তির কল্পনা করছিলাম আমি। অনেকে বলতে পারেন, এটা একটা পারভার্সন। আমি বলব, আই বেগ টু ডিফার। সৌন্দর্যপিপাসী মানুষ নারীর মধ্যে যে সৌন্দর্য দেখে, সে সৌন্দর্য ও সুগন্ধ তার গা-ধোয়া জলের মধ্যেও থাকে।
স্নান সেরে চিকন একটি হলুদরঙা সিল্কের শাড়ি আর কালো ব্লাউজ পরে এসে আমার পাশে বসল। ওর দু’কানে দুটি মুক্তোর দুল, গলায় মুক্তোর মালা। মুক্তোগুলি সকালের রোদে টলটলে, ঝলমলে হয়ে উঠছিল। মুক্তো অবশ্য ঝলমল করে না, তবে টলটল অবশ্যই করে। ওর স্নান করে ওঠা গায়ের সুগন্ধ, চুলের তেলের সুগন্ধ, পারফিউমের সুগন্ধ আমায় আমোদিত করছিল। মাথার ওপরে হলুদ-কালো পিউ কাঁহা পাখি ডেকে ফিরছিল পিউ কাঁহা পিউ কাঁহা পিউ কাঁহা বলে।
চিকনকে বললাম, পিউ কাঁহার ইংরেজি নাম জানো?
না তো।
ব্রেনফিভার। সাহেবরা অদ্ভুত নামকরণ করেছিল। এদের ডাকে মস্তিষ্কে সত্যিই জ্বর আসে। একটা কথা জানলে তুমি অবাক হবে, এই একই পাখিকে আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়।
যেমন?
ওড়িশার জঙ্গলে এদের বলে, মু চাষা কুঁয়ো। মানে, আমি চাষার ছেলে। এর ধ্বনির সঙ্গে মিলিয়ে এরা নাম রেখেছে। আমাদের কানে যা পিউ কাঁহা ঠেকে, ওদের কানে তা এমনটা। আবার এই পাখিকেই অন্য নামে ডাকে উত্তরাখণ্ডের মানুষরা। আমি একবার ছাত্রাবস্থায় আলমোড়ার সিভিল সার্জেনের সঙ্গে পায়ে হেঁটে কৈলাস মানস সরোবরের রাস্তায় বড়চিনা বলে একটা জায়গায় গেছিলাম। আমেরিকার কিছু সন্ন্যাসী ডাক্তার সেখানে একটি ছোট্ট হাসপাতাল করেছিল, ওই ভদ্রলোক সেটি দেখতে গেছিলেন। আমরা খচ্চরের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে, দুটো ডুটোয়াল সঙ্গে নিয়ে…
ডুটোয়াল কী?
ও হো, সরি তোমায় বলা হয়নি। ওখানকার কুলিদের বলে ডুটোয়াল— তাদের নিয়ে চলেছি। পথ আস্তে আস্তে উঁচু হচ্ছে, পাহাড়ে যেমন হয়। ঠান্ডাও তেমনি বাড়ছে। উপত্যকা দিয়ে পাহাড়ি ঝরনা বয়ে যাচ্ছে। ভেড়া চরানো কুমায়ুনি ছেলে পথের পাশে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে। সে মেঠো সুরের আওয়াজে চারধার মূর্ছিত হয়ে উঠছে। পাহাড়ের আবহাওয়াই এমন যে যতই ওপরে ওঠা যায়, ততই নিষ্কলুষ, পবিত্র একটা ব্যাপার। একটু দাঁড়ালেই সমস্ত ক্লান্তি অবদমিত হয়ে যায়। জিম করবেটের লেখায় যেমন পড়েছিলাম, ছোট ছোট পাথরের বাড়ি, নিচু কম্পাউন্ড ওয়াল দেওয়া— সেরকমই রয়েছে পথের দু’পাশে। তবে সেদিন খুব ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম। অভ্যাস তো ছিল না। ১৮ মাইল পথ পায়ে হেঁটে, পাহাড়ে চড়ে, আমরা বড়চিনায় পৌঁছনোর আগে একটি ছোট ডাকবাংলোয় গিয়ে উঠলাম। সেই জায়গাটির নাম পানুয়ানালা।

সেই বাংলোয় উঠে আমাদের জিনিসপত্র ঘরে রেখে বারান্দায় এসে বসলাম। তখন ছিল শুক্লপক্ষ। মস্ত বড় চাঁদ উঠেছিল। আর সেই ডাইনি চাঁদের আলোয় বন-পাহাড় ভেসে যাচ্ছিল। চিড় পাইন এবং অন্য নানা কনিফেরাস গাছেদের গায়ের গন্ধে পুরো জায়গাটা মাতোয়ারা হয়েছিল। বাংলোর সামনেই একটি গভীর খাদ। তাতে নিবিড় জঙ্গল। ওক, বার্চ, দেবদারু, আরও নানা গাছের গায়ের গন্ধে উপত্যকা ভরে উঠেছিল। দুটো পাখি সে উপত্যকায় চাঁদের আলোয় ভেসে ভেসে ডাকছিল। ডাকটা শুনেই চিনতে পারলাম, আমাদের পিউ কাঁহা। চৌকিদারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী পাখি? চৌকিদার বলল কাউফল পাক্কৌ। ওখানে বছরের এই সময়ে একরকমের বেরি হয়। তাদের স্থানীয় নাম কাউফল। খেতে বেশ ভাল। সে সময়ে কাউফল পাকে। পিউ কাঁহা পাখিরা যে পিউ কাঁহা করে ডাকছে, সেই ধ্বনির সঙ্গে মিলিয়ে কুমায়ুনিরা পাখির নাম দিয়েছে কাউফল পাক্কৌ। শুনে আমি শিহরিত হলাম। আর নতুন করে আমার এই সুন্দর দেশের বিরাটত্বে এবং একাত্মতায় মুগ্ধ হলাম।
চিকন বলল, তারপরে কি বড়চিনা গেলেন পরের দিন?
হ্যাঁ, তা গেছিলাম। সে আবার অন্য গল্প। এখানে অবান্তর।
আমি স্নান করতে গেলাম। চিকন গেল রান্নাঘরে। স্নান করে উঠতে উঠতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। বারোটা নাগাদ আমরা খেতে বসলাম। চিকন রান্না করেছে। চৌকিদারও সাহায্য করেছে। ঘি, ভাত, কড়কড়ে করে আলুভাজা, আমডাল, এঁচোড়ের তরকারি, আমের চাটনি। শেষে মুখমিষ্টি করতে গুলগুলা আর এন্ডুলি পিঠা। এই দুটি ওড়িয়া মিষ্টি। পুজোপার্বণে পোড়পিঠার সঙ্গে ওড়িয়ারা এসব মিষ্টি বানায় বাড়িতে। চৌকিদারের বউ হয়তো বানিয়েছেন এইসব মিষ্টি। কী উৎসব, জানি না।
চিকন বলল, পোড়পিঠা কী জিনিস?
বলতে পারো, মিল্ক কেক। একে ছানা পোড়ও বলে। দুধের কেকের মতো পুড়িয়ে এই মিষ্টি তৈরি হয়। ভারি সুস্বাদু।
খাওয়াদাওয়ার পরে চিকনকে বললাম, কী করবে এবার?
আমি ওই বসার জায়গায় গিয়ে বসে থাকব।
তাহলে আমার কথার ফল ফলেছে। তুমি কি কনটেমপ্লেশন করবে?
করতেও পারি। সঙ্গদোষে স্বভাব নষ্ট। আর আপনি কী করবেন?
আমি একটু গড়িয়ে নেব। হাঁটার তো অভ্যেস নেই। এখন গড়িয়ে নিই, রাতে চাঁদনি রাত উপভোগ করতে হবে।
অবশ্যই।

অঙ্কন : মৃণাল শীল

(পরের পর্ব আগামী বুধবার)

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ২

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৩

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৪

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৫

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৬

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৭

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৮

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ৯

শেষবিকেলে সিমলিপালে পর্ব ১০

মতামত জানান

Your email address will not be published.