বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

শিল্পীদের জীবন নদীর মতো : তানভীর মোকাম্মেল

খেলতেন ক্রিকেট। এলেন চলচ্চিত্র পরিচালনায়। হয়ে উঠলেন বাংলাদেশে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর ঘুমঘরের দেওয়ালজুড়ে থাকেন ভ্যান গগ আর ঋত্বিক ঘটক। ‘লালসালু’, ‘চিত্রা নদীর পারে’, ‘লালন’, ‘জীবনঢুলী’র মতো সিনেমা জাগিয়ে রাখে বাঙালিকে। চিত্রনির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল-এর সঙ্গে কথা বললেন শ্যামলেশ ঘোষ

শ্যামলেশ :  কিছুদিন আগেই ‘তানভীর মোকাম্মেল : এক বিকল্প ভাবনার চলচ্চিত্রকার’— এই নামে আপনার জীবনের ওপর তৈরি তাপস বিশ্বাসের একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারির স্ক্রিনিং হল কলকাতায়। কেমন লেগেছে?

তানভীর : আমার নিজের ওপর নির্মিত একটা ছবির বিষয়ে আমার পক্ষে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। কারণ নৈর্ব্যক্তিক থাকা যায় না। তবে আমি দেখেছি, তাপস বিশ্বাস ছবিটার জন্যে অনেক পরিশ্রম করেছেন। এপার-ওপার দুই বাংলাতেই শ্যুটিং করেছেন। আমার পরিবারের সদস্য, আমার বাল্যবন্ধুদের, আমার ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা-সদস্যদের সাক্ষাৎকার শ্যুট করেছেন। যে কোনও ডকুমেন্টারি বা প্রামাণ্যচিত্রের মূলশক্তিটাই হচ্ছে— গবেষণা। তাপস বিশ্বাস যথেষ্টই গবেষণা করে ছবিটা বানিয়েছেন। আমার ভাল লেগেছে। আমি যতদূর জানি, বাংলাদেশের এক চলচ্চিত্রনির্মাতা প্রসূন রহমানও আমার জীবন ও কাজ নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করছেন।

শ্যামলেশ : আমরা জানি, আপনি কলকাতায় এলে অনেকটা সময় থাকেন, নানা কাজ নিয়ে আসেন। কলকাতা আপনার কেমন লাগে?

তানভীর : কলকাতায় আমার আসার ও মাঝে মাঝে কিছুটা বেশি সময় রয়ে যাবার কারণটা মূলত থাকে আমার ছবির সম্পাদক, আমার বন্ধু মহাদেব শী ও আমি কলকাতায় আমাদের ছবিগুলির সম্পাদনার কাজ করে থাকি। মহাদেব ঢাকাতেও আসেন ছবির সম্পাদনার কাজে। ভিসার সমস্যার কারণে কখনও কখনও আমাকেও আসতে হয়। এ ছাড়া কলকাতা থেকে আমার বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। আমার বইয়ের প্রকাশকদের সঙ্গেও আমার কিছু কাজ থাকে। এ ছাড়া আমাকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে আসতে হয়। সেটাও এ দেশে আসার একটা কারণ। যেমন, এবারে কলকাতায় আসার কাজের মাঝে একটা কাজ ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেওয়া। তা ছাড়া কলকাতায় আমার বেশ কিছু ভাল বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী রয়েছেন। ফলে কলকাতায় আসতে আমার ভালই লাগে।

শ্যামলেশ : প্রামাণ্যচিত্র বা তথ্যচিত্রে আপনার অসামান্য সব কাজ রয়েছে। সেই কাজগুলির মধ্যে কোনগুলিকে এখনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করেন যার প্রভাব সমাজজীবনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে?

তানভীর : নিজের ছবির মূল্যায়ন নিজে করা বেশ কঠিন। তবে এতদিন ধরে কাজ করছি, ফলে কিছু অভিজ্ঞতা তো হয়েইছে। যদিও আমার সব ছবিই সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। অন্যথায় সে ছবি তো আমি বানাতামই না। তবে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে আমার ‘সীমান্তরেখা’, ‘১৯৭১’, ‘স্বপ্নভূমি’, ‘কর্ণফুলীর কান্না’, ‘নিঃসঙ্গ সারথি’— এসব প্রামাণ্যচিত্র এবং সমাজজীবনের ক্ষেত্রে ‘লালসালু’, ‘চিত্রা নদীর পারে’, ‘লালন’ বা ‘জীবনঢুলী’— এসব ছবির একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে বলে আমি মনে করি।

শ্যামলেশ : বাংলাদেশে বিকল্পধারার যে চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু করেছিলেন আপনারা, এবং এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধারাটিকে ধরে রাখার ইচ্ছে কতটা? না কি তারা বাজারের ধারাতেই কাজ করে চলেছেন?

তানভীর : তরুণদের মধ্যে নানারকম প্রবণতাই রয়েছে। কেউ কেউ সৎভাবে বিকল্পধারায় ছবি করতে চান। অনেকে আবার কর্পোরেট পুঁজি বা বিদেশি পুঁজির মোহতে পড়ে যান। তবে সময়টাও তো পাল্টে গেছে। এখন ছবি নির্মাণের প্রযুক্তি অনেক সহজ হয়ে গেছে। অনেক নতুন নতুন তরুণ-তরুণী তাই চলচ্চিত্র নির্মাণে আসছেন যাদের তেমন কোনও কারিগরি জ্ঞান ও নান্দনিক প্রস্তুতি নেই। আর আমাদের সময়ে ভাল ছবির বিষয়ে রাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের যেসব বাধা ও বিরূপতা ছিল, বর্তমানে সেসব অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে ছবি বানাতে ততখানি সংগ্রামস্পৃহা তরুণদের মধ্যে আর না থাকলেও চলছে। তবে সাধারণভাবে আমাদের তরুণ বয়সের তুলনায় এখনকার তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা কিছুটা কম। বরং খুব দ্রুত অর্থবিত্ত করা বা তাড়াতাড়ি বিখ্যাত হওয়ার কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব প্রবণতা বিকল্পধারার ছবি নির্মাণের পক্ষে সহায়ক নয়।

শ্যামলেশ : আপনার ছবিতে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠে আসে বারবার। আপনার অনেক ছবি এবং কাহিনিতে নদী বিশেষ গুরুত্ব পায়। আপনার আগামী চলচ্চিত্রের নামও ‘রূপসা নদীর বাঁকে’। বিষয়গুলি ফিরে ফিরে আসার কারণ জানতে আগ্রহী।

তানভীর : আমাদের জাতির ইতিহাসে ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ— দুটি মাইলফলক ঘটনা। আমি দেশভাগ দেখিনি। তবে দেশভাগের অভিঘাত দেখেছি। পূ্র্ববঙ্গ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের করুণ ও ব্যাপক দেশত্যাগ আমাকে ব্যথিত করেছে, এখনও করে। সাতচল্লিশের দেশভাগ আমার বেশ কয়েকটি ছবিতে তাই বারবার ফিরে এসেছে, অনেকটা leitmotif-এর মতো— ‘চিত্রা নদীর পারে’, ‘সীমান্তরেখা’, ‘স্বপ্নভূমি’, ‘রূপসা নদীর বাঁকে’। আর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তো আমাদের যাপিত জীবনেরই অংশ। এই যুদ্ধটা ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ধ্বংস ও নৃশংসতা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। বয়সটা খেয়াল করুন। তখন আমি সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ এক তরুণ, যে বয়সে একজন মানুষের সংবেদনশীলতা সবচেয়ে তীক্ষ্ম থাকে, তখনই আমি দেখলাম একাত্তরের ভয়াবহ সব গণহত্যা, নারী নির্যাতন, শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের নৃশংস সব কার্যকলাপ, সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক নিপীড়ন, আবার একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা, সাহস ও দেশপ্রেম। এসবই হয়তো আমার অবচেতন মনে এত গভীর অভিঘাত ফেলেছিল যে এখনও যখন আমি কোনও চলচ্চিত্র নির্মাণ করার কথা ভাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কোনও ঘটনার কথাই আমার মনে আসে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আমার ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘রাবেয়া’, ‘জীবনঢুলী’— এসব কাহিনিচিত্র রয়েছে। এ ছাড়া আমি বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ‘১৯৭১’, ‘স্মৃতি একাত্তর’, ‘তাজউদ্দীন আহমদ : নিঃসঙ্গ সারথি’ ইত্যাদি।

আর আমার অনেক ছবিতে নদী কেন গুরুত্বপূর্ণ? আসলে, আমাদের পূর্ববঙ্গ তো নদীমাতৃক দেশ। প্রতি পাঁচ-দশ কিলোমিটার পরেই একেকটা নদী। নদীগুলির কিনারেই গড়ে উঠেছে আমাদের নগর, গ্রাম, সভ্যতা। ফলে আমার ছবিগুলিতে নদী যে বারবার ফিরে আসে সেটা বোধহয় অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। তা ছাড়া নদীর একটা নান্দনিক সৌন্দর্য্য রয়েছে— ভোরে এক রূপ, বিকেলে এক রূপ, সন্ধ্যায় আরেক রূপ। নদীর এই বহুমাত্রিক সৌন্দর্য্য যে কোনও দৃশ্যগত শিল্পীকে আকর্ষণ করবে, তা তিনি চিত্রকরই হন বা ক্যামেরা-শিল্পীই হন। আমাকেও করে থাকে। তা ছাড়া নদীর আরেকটি বিষয়ও আমাকে খুব টানে। তা হচ্ছে, নদীর চিরন্তন প্রবাহমানতার দার্শনিক দিকটি। চারপাশে এত কিছু ঘটে কিন্তু নদী তার মতো বয়েই চলে। আমাদের শিল্পীদের জীবনও তো প্রায় তাই! আমার সর্বশেষ ছবি ‘রূপসা নদীর বাঁকে’-র বিষয়বস্তু একজন ত্যাগী বামপন্থী নেতার জীবন নিয়ে, যাঁকে ১৯৭১ সালে রাজাকাররা মেরে ফেলেছিল। এখানে খুলনা জেলার রূপসা নদীর নামটা এসেছে মূলত স্থানিক পরিচয় হিসেবে। কারণ ছবিটার অধিকাংশ ঘটনা ঘটে রূপসা নদীর পারের অঞ্চলগুলোতে।

শ্যামলেশ : ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ ছবিটি সম্পর্কে আলাদা করে জানতে আগ্রহী। যে চরিত্রকে কেন্দ্র করে অনেকটা সময় কাহিনিকে ধরেছেন সে সম্পর্কেও জানতে চাই।

তানভীর : আগেই বলেছি, ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ ছবিটি একজন ত্যাগী বামপন্থী কমরেডের জীবন নিয়ে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ একবার আমাকে গুনে বলেছিলেন যে, সারাদেশে এরকম একশো ছত্রিশজন বৃদ্ধ কমরেড ছিলেন যাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ওপরই পূর্ববঙ্গের বামপন্থী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এঁদের কেউ কেউ ছিলেন আন্দামান ফেরত। অনেকে বিশ-তিরিশ বছর জেল খেটেছেন। এঁরা জীবনের সব প্রলোভন ছেড়ে শ্রমিক-কৃষকদের জীবনে পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছিলেন। সত্যিকারের ত্যাগী খাঁটি সব মানুষ ছিলেন এঁরা। এরকমই একজন বামপন্থী নেতার জীবন নিয়ে ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ ছবিটি। খুলনা অঞ্চলের কমিউনিস্ট নেতা কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জির জীবনের অনেক ঘটনা এ ছবিটাতে থাকলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক কমরেডের জীবনাভিজ্ঞতার ছায়াপাতও চরিত্রটাতে ঘটেছে। বলতে পারেন, ছবিটার মূল প্রোটাগনিস্ট কমরেড মানব মুখার্জি এক আর্কিটাইপ চরিত্র। ছবিটার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বেশ বড়। সেই ব্রিটিশ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন থেকে পঞ্চাশের মন্বন্তর, তেভাগা আন্দোলন, পাকিস্তান সৃষ্টি থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত।

শ্যামলেশ : দেশের সমাজ-রাজনৈতিক জীবনে বর্তমান বামপন্থীদের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন? বামপন্থীরা কি ক্রমশ বিরল হয়ে পড়ছেন না?

তানভীর : বামপন্থীদের অবস্থা একেক দেশে একেক রকম। আমার পক্ষে কেবল বাংলাদেশের বামপন্থীদের অবস্থাটা বলাই শোভন হবে। একটা মুসলিমপ্রধান সমাজে বামপন্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ নয়। তারপরও যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি একসময় কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল তার কারণটা ছিল ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ ছবিতে যে ধরনের কমরেডের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে সে ধরনের কমরেডদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সাংগঠনিক দক্ষতা। এ ছাড়া তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে বিশ্বে অবস্থান করছিল। মূলত দু’ধরনের সামাজিক স্তর থেকে বাংলাদেশের নেতা-কর্মীরা আসতেন। এক, যে ধরনের ত্যাগী বৃদ্ধ কমরেডদের কথা আমি আগে বলেছি। তাঁদেরকে বলা হত ‘দাদা কমরেড’। ওঁরা মূলত আসতেন হিন্দু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে। ওঁরা অনেকেই খুব উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং সত্যিকারের ত্যাগী মানসিকতার ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টিতে আরেক ধরনের কর্মী ও নেতাও ছিলেন। এঁরা ছিলেন মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত, যাঁরা মূলত ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বামপন্থী আন্দোলনে এসেছিলেন। এঁরা কমিউনিস্ট পার্টি করলেও এঁদের অনেকের মধ্যেই মধ্যবিত্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত ছিল। ফলে বয়সের কারণে বৃদ্ধ দাদা কমরেডরা পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে গেলে এঁরা নেতৃত্বে আসেন। এবং বলতে পারেন, তখন থেকেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি দুর্বল হতে শুরু করে। এ ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনও এ ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে।

শ্যামলেশ : আপনার আগামী প্রামাণ্যচিত্র ‘মধুমতী পারের মানুষটি : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে চাই।

তানভীর : ছবিটি হবে বঙ্গবন্ধুর ওপর একটা জীবনীচিত্র বা বায়োপিক। এখনও ছবিটার শ্যুটিং শুরু হয়নি। আমরা এখন দেশ-বিদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর ওপর ফুটেজ সংগ্রহ করছি এবং বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করছি। ফলে ছবিটা নিয়ে বিশদভাবে বলার সময় এখনও আসেনি।

শ্যামলেশ : ছেলেবেলায় ভাল ক্রিকেট খেলতেন, তাপস বিশ্বাসের তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে সে কথা। কবে থেকে আপনার মনের মধ্যে সিনেমা তৈরির ইচ্ছেটা তৈরি হয়েছিল? কোন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্রকার হিসাবে নিজেকে তৈরি করলেন?

তানভীর : আমি প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলতাম। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলেছি। একসময় আমার মনে হল, ক্রিকেট বুর্জোয়া খেলা, উপনিবেশবাদীদের খেলা। একজন বামপন্থী হিসেবে আমার ক্রিকেট খেলা সঠিক নয়। তখন আমি ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিই এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা কয়েক বন্ধু মিলে একটা ফিল্ম সোসাইটি তৈরি করেছিলাম। ফিল্ম সোসাইটির যে কাজ— দেশ-বিদেশের ধ্রুপদ ছবিসমূহ দেখানো, চলচ্চিত্র নিয়ে সেমিনার-ওয়ার্কশপের আয়োজন, চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালিখি বা মননশীল পত্রিকা বের করা— এসব আমরা করতাম। একসময় মনে হল, নিজে হাতেকলমে ছবি তৈরি করলে হয়তো বেশি ভাল হবে। তখন আমি ‘হুলিয়া’ নামে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করি। বলতে পারেন, তখন থেকেই চলচ্চিত্রের পথে যাত্রা শুরু।

শ্যামলেশ : আপনি পৃথিবীর নানা দেশে গিয়েছেন, বিভিন্ন দেশে আপনার ছবি দেখানো হয়েছে, হচ্ছে। এই নিরিখে জানতে ইচ্ছে করে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মান কেমন? আগের তুলনায় কতটা বেড়েছে এবং তার প্রভাব জনজীবনে কতটা?

তানভীর : বাংলাদেশের কোনও কোনও ছবি বা কারও কারও ছবি আন্তর্জাতিক মানের হলেও সামগ্রিকভাবে উন্নত বিশ্বের তুলনায়, এমনকি এই উপমহাদেশের তুলনাতেও, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-শিল্প প্রায় বিশ বছর পিছিয়ে রয়েছে। মেধায়, মননে ও প্রযুক্তিতে, সব দিক থেকেই। বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র তো বর্তমানে খুবই দুরবস্থায় রয়েছে। সিনেমাহলগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রে সাফল্য যেটুকু আছে, তা মূলত বিকল্পধারার চলচ্চিত্রে। তবে সামগ্রিকভাবে সে সাফল্যের প্রভাব ও পরিধি জনজীবনে বেশ কম।

শ্যামলেশ : আপনার তৈরি কোন কোন চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে, দর্শকরা খুব পছন্দ করেছেন? এর কারণ কী বলে মনে হয়?

তানভীর : আমার ছবিগুলি খুবই স্বল্প বাজেটে তৈরি, তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রীও নেই। তারপরও আমার কিছু ছবি দর্শক বেশ পছন্দ করেন বলে শুনেছি। দর্শক হয়তো পর্দায় সামাজিক বাস্তবতা ও ইতিহাসের সঠিক চিত্রায়নটা দেখতে চান। আমাদের ছবিতে হয়তো সেটা খুঁজে পান। আমি ও আমার ইউনিট খুব সৎভাবে ও আন্তরিকভাবে আমাদের ছবিগুলো তৈরি করি। হয়তো আমাদের এই সততা ও আন্তরিকতা দর্শকদেরও স্পর্শ করে। আমাদের ছবিগুলি সে কারণেই হয়তো তাদের ভাল লাগে।

শ্যামলেশ : প্রতিবছর চলচ্চিত্রের বহু ছাত্র তৈরি করেন। ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে তারা কী করেন, দেখতে পান?

তানভীর : অনেকেই ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়তে আসেন কিন্তু সবাই তো সৃজনশীল নন। ওই যে জীবনানন্দ বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। তা ছাড়া বাংলাদেশের মতো একটা দেশে শিল্পসম্মত ছবি করা তো সহজ নয়। অনেকেরই সেরকম মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনসংযোগ থাকে না। ফলে অনেকেই শেষপর্যন্ত আর ছবি তৈরি করে উঠতে পারেন না। তবে কেউ কেউ অবশ্য ছবি তৈরি করেছেন, বিশেষ করে প্রামাণ্যচিত্র। এবং বেশ ভাল করেছেন।

শ্যামলেশ : সিনেমা তৈরির সঙ্গে লেখালেখিও আপনি বরাবর সমান গুরুত্বের সঙ্গে করেন। এই সময় কোন ধরনের লেখা লিখতে ভাল লাগছে?

তানভীর : সব ধরনের লেখা লিখতেই আমার ভাল লাগে। তবে ইদানীং কবিতা, উপন্যাস আর ছোটগল্প লিখতে বেশি অনুপ্রাণিত বোধ করছি।

শ্যামলেশ : ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি বাঁচাতে আপনারা আন্দোলন করেছেন। আপনার জীবনে ঋত্বিক ঘটক কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

তানভীর : ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, এঁদের ছবি দেখেই আমরা বড় হয়েছি। ঋত্বিক ঘটককে আমি একজন অত্যন্ত সৎ ও আন্তরিক শিল্পী বলে মনে করি। ওঁর একটা নিজস্ব চলচ্চিত্র-ভাষা রয়েছে যা পশ্চিম প্রভাবিত চলচ্চিত্র-ভাষা থেকে আলাদা। খুবই মৌলিক একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। দেশভাগের বেদনা তাঁকে আজন্ম তাড়িত করেছে। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পী হিসেবে ঋত্বিক ঘটককে তাই আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। আমার শোবার ঘরে কেবল দু’জন শিল্পীর ছবি টাঙানো রয়েছে— ভ্যান গগ ও ঋত্বিক ঘটক।

শ্যামলেশ : এপার বাংলা ওপার বাংলা— দুই বাংলা তত্ত্ব মানতেন না ঋত্বিক ঘটক। বিষয়টি নিয়ে আপনি কী বলবেন?

তানভীর

খেলতেন ক্রিকেট। এলেন চলচ্চিত্র পরিচালনায়। হয়ে উঠলেন বাংলাদেশে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর ঘুমঘরের দেওয়ালজুড়ে থাকেন ভ্যান গগ আর ঋত্বিক ঘটক। ‘লালসালু’, ‘চিত্রা নদীর পারে’, ‘লালন’, ‘জীবনঢুলী’র মতো সিনেমা জাগিয়ে রাখে বাঙালিকে। চিত্রনির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল-এর সঙ্গে কথা বললেন শ্যামলেশ ঘোষ। শ্যামলেশ :  কিছুদিন আগেই ‘তানভীর মোকাম্মেল : এক বিকল্প ভাবনার চলচ্চিত্রকার’— এই নামে [...]

আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST