বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

বাদল সরকারের বল্লভপুরের রূপকথা : কমেডির খতিয়ান

শুভেন্দু সরকার
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজে যোগ দিয়ে মাইথনে থাকাকালীন একটি ‘রিহার্সাল ক্লাব’ গঠন করেন বাদল সরকার (১৯২৫-২০১১)। কিন্তু অভিনয়ের জন্যে নাটক বাছতে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর মনে হতাশা জাগল। আর তা থেকে শুরু হল নিজে নাটক লেখার চেষ্টা। তাঁর হাত দিয়ে বেরোল পরপর চারটি হাসির নাটক— ‘সলিউশন এক্স’ (১৯৫৬), ‘বড়ো পিসীমা’ (১৯৫৯), ‘শনিবার’ (১৯৫৯) আর ‘রাম শ্যাম যদু’ (১৯৬১)। পরে দুটি একেবারে অন্য স্বাদের সিরিয়াস নাটকের— ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ (১৯৬৩) ও ‘সারারাত্তির’ (১৯৬৩)। পাশাপাশি তিনি লিখলেন আরও দুটি পূর্ণাঙ্গ মজার নাটক : ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ (১৯৬৩-৬৪) আর ‘কবি কাহিনী’ (১৯৬৫)। ঘটনা হল, পরবর্তীকালে আর কখনওই নিছক হাসির নাটক লেখেননি বাদল সরকার। মঞ্চ বা তৃতীয় ধারার থিয়েটার পর্বে কৌতুকের নানা ব্যবহার থাকলেও গোড়ার দিককার নাটকের অনাবিল হাসি আর মুখ্য ভূমিকা নেয়নি। তাই অনেকে মনে করেন, হাসির নাটক লিখে হাত পাকিয়ে তিনি অন্যান্য ‘ভাল নাটক’ লিখেছেন। তা কিন্তু মানতেন না বাদল সরকার। ‘কবি কাহিনী’-র ভূমিকায় তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন—
‘‘এ কথায় আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে দুটো কারণে। প্রথমত, কথাটা পুরো সত্যি নয়। ‘কবি- কাহিনী’ এবং আরও কিছু হাসির নাটক আমি লিখেছি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ লেখার পরে। পারলে আরও লিখবো। দ্বিতীয়ত, এ কথায় একটা ইংগিত আছে, যেন হাসির নাটকের জাতটা নিচু। আমি তা আদৌ মনে করি না। হাসির নাটকে বক্তব্য নেই, যুগ-সমস্যার আলোচনা নেই, বাণী নেই, এ সব কথা যদি মেনেও নিই, তবু হাসি বা হাসানোর মূল্য আমার কাছে কমে না।... হাসি যদি সুস্থ হয়, নিছক ভাঁড়ামি, মুদ্রাদোষ বা মুখবিকৃতির সাহায্য না নিয়ে যদি হাসানো যায়, তবে সে হাসি উদ্দেশ্যহীন বলে আমার মনে হয় না।’’
উঁচু-নিচু নয়, বিষয়বস্তুর নিরিখে বাদল সরকারের মঞ্চনাটকগুলিকে বরং পাশাপাশি তিনটি কামরায় রাখা যায়। নিছক মজা, মানবিক সম্পর্ক ভিত্তিক আর আর্থ-রাজনৈতিক ভাবনা প্রধান নাটক। ১৯৭২-এ পাকাপাকিভাবে প্রসেনিয়াম ছাড়ার পর তিনি যে ধরনের নাটক লেখেন ও প্রযোজনা করেন তার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক একেবারেই আলাদা। সেইজন্যে এই ধারণার জন্ম হয়েছে যে, পরবর্তীকালে বাদল সরকারের কাছে আর্থ-রাজনৈতিক নাটক হয়ে উঠেছে সবচেয়ে মূল্যবান। এমনকি, তাঁর থিয়েটার নিয়ে আলোচনায় সেদিকেই জোর পড়ে বেশি। অথচ বাদল সরকারের ভিন্ন স্বাদের নাটকগুলির গুরুত্ব নেহাত কম নয়। খানিকটা সেই ঘাটতি কাটাতেই এখানে একটি কমেডি— ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ নিয়ে কিছু কথা বলব।

কমেডি হল নাট্যসাহিত্যর এমন একটি শাখা যেখানে সাংস্কৃতিক জগতের ক্রমাগত পরিবর্তন সত্ত্বেও মৌলিক কিছু গুণাবলী বহাল থেকেছে। তার প্রধান কারণ, কমেডির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের এক সহজাত আকাঙ্ক্ষা। সেটি হল : বর্তমান সমস্যার সমাধান ও উন্নত ভবিষ্যতের পথ প্রস্তুত করতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছে। কমেডির বেলায় এই আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয় দু’ভাবে। এক, নানা বাধাবিপত্তি দেখিয়ে সেসব কাটানোর দিকনির্দেশ করেন নাট্যকার। দুই, বিভিন্ন জটিল সমীকরণের ধীরে ধীরে মীমাংসা ঘটানো হয় কমেডিতে। বলা বাহুল্য, দুটি ক্ষেত্রেই ‘হাসি’ মিলনান্ত নাটকের প্রধান উপাদান (যদিও সেটির রকমফের আছে)। প্রথমটিতে নাট্যকার কাজে লাগান ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর দ্বিতীয়টিতে তাঁর সহায় স্রেফ অনাবিল হাসি। এদিক দিয়ে দেখলে, বাদল সরকারের কমেডিগুলির স্থান দ্বিতীয় ধারায়। তাই এখানে এই ঘরানা নিয়েই আলোচনা করব যার সূত্রপাত হয়েছিল প্রাচীন গ্রিসে, ‘নয়া কমেডি’ নামে।
এমন ভাবার হেতু নেই যে, প্রাচীনকাল থেকে নয়া কমেডির ধারায় কোনও অদলবদল হয়নি। বরং বলা ভাল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও (যা নানা নামে পরিচিত) এই ঘরানার মূল কাঠামো ও অনেকগুলি বৈশিষ্ট্য আজও অপরিবর্তিত আছে। আখ্যানের সমস্যাগুলি মিটিয়ে সাধারণত ভোজ বা বিয়ের মাধ্যমে শেষ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত উপায়গুলির দিকে নজর দেওয়া যাক এবার।
উর্বরতা, সুরা ও যথেচ্ছাচারের গ্রিক দেবতা দিওনিসুস-এর উপাসনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমেডিতে আগাগোড়াই হাজির করা হয়েছে বাস্তবের বিচিত্র রূপ। কাহিনি ও চরিত্র ছাড়াও এই ব্যাপারটি ছাপ ফেলে নাটকের সামগ্রিক পরিবেশে। বেশিরভাগ সময়েই কমেডির কাহিনির বিস্তার ঘটে এমন এক স্থানে যা শহর থেকে খানিক দূরে অবস্থিত। চেনাজানা পরিমণ্ডলের বাইরে নগরজীবনের ছকে বাঁধা বাস্তবতাকে নস্যাৎ করে কমেডি তুলে ধরে এমন এক জগৎ যেখানে স্বেচ্ছায় রোধ করা যায় অবিশ্বাস; গড়ে তোলা হয় এক বিকল্প বাস্তবতা। সেই জায়গায় বাধাবিপত্তি যেমন কাটানো সম্ভব তেমনই দুঃখ, রাগ, দ্বেষ বা প্রত্যাখানের বদলে আনন্দ ও সামাজিক সংযুক্তি সেখানে হয়ে দাঁড়ায় প্রধান চালিকাশক্তি। চারশো বছরের পুরনো ভাঙাচোরা রাজবাড়ি, কিংবদন্তি-ইতিহাস মেশানো প্রেক্ষাপট আর যুবরাজ রঘুপতি ভুইঞার প্রেতাত্মার অভিশপ্ত অস্তিত্ব ও মুক্তি— এসব দিয়ে বাদল সরকার এমনই এক জগৎ উপস্থাপন করেন ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-য়। নাটকের মজাদার আজগুবি কাহিনি তরতরিয়ে এগিয়ে চলে নিজের খেয়ালে; বাস্তবের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার তাগিদও অনুভব করেন না পাঠক/দর্শক।

আগেই বলেছি, কমেডির সঙ্গে হাসির সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন। পাঠক/দর্শকের কেন হাসি পায় তা নিয়ে দার্শনিক ও সাহিত্য-বিশারদ কুলে গুরুগম্ভীর আলোচনাও কম হয়নি। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-র বেলায় খাটে হাসির তেমন কয়েকটি সর্বজনগ্রাহ্য শর্তর দিকে তাকাব এখন।
১. প্রকৃত বনাম প্রতীয়মানতা
গোড়া থেকেই রাজার ঠাট বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায় ভূপতি। তিন পাওনাদারকে বাদশাহি আদব-কায়দায় তালিম দিয়ে আর জমকালো উর্দি-পাগড়ি পরিয়ে বন্দুকধারী প্রহরী সাজাল, পুরনো চাকর মনোহর হেড-খানসামা রূপে মোগলাই বুলি আওড়াল আর মস্ত গোঁফ লাগিয়ে বন্ধু সঞ্জীব দেওয়ান সাহেব হল। বি পি হালদার ও তাঁর স্ত্রী-কন্যার সামনে এক চমৎকার দুনিয়া মেলে ধরতে অন্য কোনও গতি ছিল না। পাঠক/দর্শক জানেন, দেনায় জর্জরিত ভূপতি বিলকুল মরিয়া; সম্ভাব্য ক্রেতাকে তাক লাগানোর জন্যেই মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়েছে রাজাবাবুকে। আসল আর নকলের ফারাকই এভাবে হাসির উৎস হয়ে ওঠে ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-য়। খেয়াল রাখা দরকার, ভূপতি কিন্তু ঠগ নয়, বরং তার সততার নানা নমুনা ছড়িয়ে আছে সমগ্র নাটক জুড়ে। নৈতিকতার প্রশ্ন নেই বলে পাঠক/দর্শকের মজায় ছেদ পড়ে না একবারও।
২. দ্বৈত ভূমিকা ও ভ্রান্তিবিলাস
আসল-নকলের সংঘাতের মতো একই অভিনেতাকে দুটি আলাদা চরিত্রে দেখানো আর তা নিয়ে অন্যান্যদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সাহায্যে হাস্যরস জাগানো কমেডির একটি অত্যন্ত পরিচিত প্রকৌশল। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-য় তা-ই নজরে আসে যখন রঘুপতির ভূতকে সংস্কৃত কাব্য আবৃত্তি করতে দেখে ছন্দা ও তার মা স্বপ্না মনে করেন সে আদতে ভূপতি। এই ভুলের জন্যে ঘটে চলে একের পর এক মজার ঘটনা। আর একইসঙ্গে সেই ভুল ভাঙানোই হয়ে দাঁড়ায় নাটকের লক্ষ্য।
৩. অসঙ্গতি
কৌতুক জাগানোর আর এক প্রথাগত শর্ত হল অসঙ্গতি। বাস্তবের সঙ্গে বেমানান নিরীহ পরিস্থিতি পেশ করা তার ভাল নমুনা। অন্য কথায়, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যেসব অক্ষতিকর ঘটনা অপ্রত্যাশিত ঠেকে, সেসবই মজা জোগায় নাটকে। যেমন, বল্লভপুরের রাজবাড়ি কেনার পেছনে হালদারের একটাই উদ্দেশ্য— প্রতিযোগী ব্যবসায়ী শিবনারায়ণ চৌধুরীকে টেক্কা দেওয়া। পুরনো বাড়ির প্রতি আর কোনও মোহ তাঁর নেই। তাই সস্তায় কিনেও সেটি মেরামত করার কথা ভাবতেও পারেন না তিনি।
“হালদার : মেরামত? রাজমিস্ত্রিকে হাত দিতে দেবো ভেবেছেন এ বাড়িতে?
ভূপতি : অ্যাঁ?
স্বপ্না : তোমার আবার বাড়াবাড়ি। এদিকে একটু সারিয়ে না নিলে একরাত্তির বাস করাও যে যাবে না!
হালদার : (বহুকষ্টে) আচ্ছা, এদিকটা বরং— কিন্তু ওদিকে একদম নয়। যে মহলটা দেখলাম টর্চ জ্বেলে। ঐ রুইনস্, ঐ বাদুড়— সব ইন্ট্যাক্ট থাকবে।’’

এর চেয়ে আরও অপ্রত্যাশিত হল রক্তমাংসর মানুষ স্বপ্নাকে দেখে ভয়ে রঘুপতির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা। রঘুপতির মুখে কালিদাসের কাব্য শুনে ছন্দা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। ‘দুই বাহু অল্প প্রসারিত’ করে ‘আবিষ্টভাবে রঘুপতির দিকে অগ্রসর’ হতে পর্যন্ত বাকি রাখেনি সে। কিন্তু সেই মুহূর্তে স্বপ্নার হুঙ্কার সব মাটি করে দিল। রঘুপতি (যে কিনা ইন্দ্রনারায়ণের বংশকে শায়েস্তা আর মানসিংহর সঙ্গে লড়াইয়ের পণ করেছিল) এখন গুটিগুটি পায়ে সরে গিয়ে আশ্রয় নিল নাটমন্দিরে। নাটকের শেষ দিকে চৌধুরীর আসল পরিচয় (প্রতাপগড়ের ইন্দ্রনারায়ণের বংশধর) না পেলে সেখান থেকে কখনওই ধেয়ে আসত না রঘুদা। চারশো বছর ধরে জমে থাকা মুক্তির তাড়না দিয়েই সে তার ভয়কে জয় করতে পারল।
৪. ভাষার স্বাচ্ছন্দ্য
ভাষার কৌতুকপূর্ণ প্রয়োগ যে কমেডির অমোঘ অস্ত্র— এ তো সকলেরই জানা। বাদল সরকারের কলমের ডগায় উঁচুমানের রসিকতা আসত অনায়াসে। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-য় তার দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে ছত্রে ছত্রে। তার মধ্যে দুটি নমুনা এখানে তুলে দিচ্ছি।
‘‘মনোহর : হেই-ই-ই হপ্! বলে এমনি করে সিধে হয়ে দাঁড়াবে। সিধে তাকিয়ে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো। নাও— করো দিকি?
[পবন চেষ্টা করিল, কিন্তু একেবারেই হইল না]
ওটা কী হোলো? এতোক্ষণ ধরে কী দেখালুম তবে? বন্দুকখানাকে অতো তফাতে ধরছো কেন?
পবন : বন্দুক যে?
মনোহর : বন্দুক— তা কী? ফটকের দারোয়ান— বন্দুক ছাড়া হয়?
পবন : যদি ফুটে যায়?
মনোহর : (বিরক্ত হইয়া) কতোবার বলবো এক কথা! ফুটবে যে— গুলি আছে এতে?
পবন : না, গুলি নেই। তবু— বন্দুক তো?’’
***
‘‘ছন্দা : এ বাড়ির যে মালিক, তার এমনিই হবার কথা।
স্বপ্না : মস্ত বুঝেছিস!
ছন্দা : নিশ্চয়ই! দেখলে না, রাত এগারোটায় খেয়াল হোলো— দেওয়ানের গোঁফটা ভালো না— ব্যস কামিয়ে ফেলো! একে বলে রাজার মেজাজ।
স্বপ্না : আর মাঝরাত্তিরে শ্লোক আওড়ানো— এও রাজার মেজাজ বল্?
ছন্দা : নিশ্চয়ই। আমরা করি ওরকম?
স্বপ্না : চুপ কর। বাজে বকিসনি।
হালদার : না, কথাটা খুব ভুল বলেনি ছন্দা। এ ছাড়া পনেরো হাজার এক কথায় ছেড়ে দেবার আর কোনো এক্সপ্লেনেশন পাওয়া যায় না।
স্বপ্না : কেন পাওয়া যাবে না? হয়তো বাড়িটার এমন কোনো দোষ আছে—
হালদার : দোষ আছে? পনেরোশো একষট্টি খ্রীষ্টাব্দ!
স্বপ্না : তুমি তো পনেরোশো একষট্টি ব’লেই অজ্ঞান।
হালদার : কী দোষ থাকা সম্ভব বলো? এ কি নতুন বাড়ি যে, ছাদ দিয়ে জল পড়ে কি না, ড্যাম্প ওঠে কিনা— এই সব প্রশ্ন উঠবে? এখানে একমাত্র কথা হোলো পনেরোশো একষট্টি, তার অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছে।
[স্বপ্না হঠাৎ কোনো জবাব খুঁজিয়া পাইলেন না। তাই বলিয়া তর্কে তো হারা যায় না?]
স্বপ্না : তাই বলে মাঝরাত্তিরে অমন বিদঘুটে হাসবে?
হালদার : হাসুক না? নিজের বাড়িতে হাসছে। তোমার বাড়ি যখন হবে, তখন তো আর হাসতে যাবে না? তখন তুমি হেসো।”

এবার হাসির প্রসঙ্গ ছেড়ে অন্য কথায় আসা যাক। কমেডিতে যাতে রক্তারক্তি খুনখারাপি বা বড় কোনও অপরাধ না ঢুকে পড়ে— সে-ব্যাপারে নাট্যকারকে সজাগ থাকতে হয় সর্বদা। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-র অনন্যতা এখানেই যে, প্রতিহিংসা একটি মুখ্য উপাদান হওয়া সত্ত্বেও নাটকের মজাকে তা ছাপিয়ে যায় না। বরং বলা চলে, মৃত্যু ও প্রতিশোধ— দুটি ঘটনাই পাঠক/দর্শকের মজা আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। রঘুপতি ও রমাপতির মৃত্যু ঘটে এভাবে—
“ভূপতি : দাঁড়া রে বাবা, সিগারেটটা ধরাতে দে।— তারপর রঘুপতি আর কী করে? তরোয়াল টরোয়াল বেঁধে বাল্যসখীদের কাছ থেকে বিদায় টিদায় নিয়ে মনের দুঃখে ঘোড়ায় উঠে রওনা হোলো। পেছনে বল্লভপুরের ফৌজ। মানসিংহের সঙ্গে লড়বার আগে ইন্দ্রনারায়ণকে শায়েস্তা করতে চললো।
সঞ্জীব : করলো শায়েস্তা?
ভূপতি : আরে দূর! তা করতে পারলে আর এই যন্ত্রণা এ্যাদ্দিন ধরে?
সঞ্জীব : তার মানে?
ভূপতি : আরে হবি তো হ, ঠিক সেই সময়ে নদীর ওপারে ইন্দ্রর সেপাইরা তাদের নতুন কায়দার কামানের ট্রায়াল দিচ্ছে। শূন্যে গোলা চালিয়ে দেখছে কদ্দূর যায়। কামানটা কতোখানি আল্ট্রা মডার্ন লঙ রেঞ্জ তারাও বোঝেনি। গোলা নদী টপকে রঘুপতিকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো।
সঞ্জীব : অ্যাঁ?
ভূপতি : রঘুপতির ফৌজ ফিরে গেলো। গিয়ে রমাপতিকে খবর দিলো। রমাপতি তখন অপমান ভুলতে মদ খেয়ে ধাতের বাইরে। ধাত ছেড়েছে, কিন্তু অপমানের জ্বালা ছাড়েনি। বিড়বিড় করে পুরোনো অভিশাপটি কায়েম রেখে তিনি দু চক্ষু মুদলেন।
সঞ্জীব : পুরোনো অভিশাপ?
ভূপতি : ঐ যে বলেছিল না? ইন্দ্র বা তার বংশের কাউকে নাক খৎ না দেওয়াতে পারলে রঘুপতির আত্মার মুক্তি নেই? সেই অভিশাপ।’’
সেই অভিশাপ কাটাতে চৌধুরীর বন্দুকের গুলির তোয়াক্কা না করে রুদ্রমূর্তি রঘুপতির ভূত তরোয়াল ধরল তার শত্রুর গলায়। কথা না বাড়িয়ে সঞ্জীবের পরামর্শে সটান মাটিতে উপুড় হয়ে প্রাণের মায়ায় নাকে খত দিতে থাকলেন চৌধুরী। মুক্তির স্বাদ পেয়ে অবশেষে অদৃশ্য হল আনন্দে আত্মহারা রঘুদার ভূত।

এ তো গেল কমেডির চিরাচরিত গুণাবলীর নিরিখে ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-র আলোচনা। তা হলে কি এই ছকের বাইরে সেখানে কিছু নেই? মেনে নেওয়া ভাল যে, এসব শর্ত মাথায় রেখে একটি সার্থক কমেডি নামানোও মুখের কথা নয়। পরিবেশ, চরিত্র বা মজার সংলাপ লেখার ক্ষমতা সকলের থাকে না। তবু বৈশিষ্ট্যর বাইরে গিয়ে কথা যদি বলতেই হয় তাহলে দুটি ব্যাপার খেয়াল করা দরকার যেগুলি ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-য় বাড়তি মাত্রা যোগ করে। রাজা, রাজবাড়ি, কিংবদন্তী, প্রেতাত্মার সাহায্যে নাটকে আগাগোড়া রূপকথার মেজাজ অক্ষুণ্ণ থাকলেও পাঠক/দর্শক টের পান যে, এখানে এমন কিছু আছে যা রূপকথার ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না। সূত্রধারের ভূমিকায় হাজির হয়ে সঞ্জীবও সে কথা জানিয়ে দেয় প্রথমে। ফ্যান্টাসির আধারে এমন কিছু বাস্তবোচিত সমস্যা (অর্থকষ্ট, বাড়ি বিক্রির চেষ্টা আর দাঁতের চিকিৎসার জন্যে চেম্বার খোলার স্বপ্ন) ‘বল্লভপুরের রূপকথা’-কে একটি ব্যতিক্রমী কমেডি করে তোলে। রূপকথা আর বাস্তবের মিশেলে আরও বেশি মজা পাওয়া যায়।
‘বল্লভপুরের রূপকথা’-র মঞ্চনির্দেশ নিয়ে দু-এক কথা না বললে অবশ্য চলে না। শুধু এখানে নয়, বাদল সরকারের সবক’টি কমেডির বেলাতেই তা প্রযোজ্য। এমনিতে নাট্যকারের নিজের মনোভাব সরাসরি জানানোর অবকাশ থাকে না। যা কিছু বলার তা তাঁকে বসাতে হয় কারও না কারও সংলাপে। কেউ কেউ আবার সে কাজের জন্যে বেছে নেন মঞ্চনির্দেশ। এ ব্যাপারে সবার আগে মনে আসে বার্নার্ড শ-এর নাম। তাঁর নাটকের মতোই বাদল সরকারের কমেডির মঞ্চনির্দেশগুলি আলাদা করে পড়া জরুরি। সেখানে অভিনেতার উদ্দেশে ওঠা-বসা-তাকানোর মতো মামুলি নির্দেশই শুধু থাকে না, তা বরং হয়ে ওঠে নাট্যকারের নিজস্ব স্বর যা সংলাপের সঙ্গে চলতে থাকে সমান্তরালভাবে। সেটিও কম মজার নয়। মঞ্চনির্দেশ সাধু কোডে লেখা বলে বাড়তি আকর্ষণও তৈরি হয়। কিন্তু তার আস্বাদ পাওয়া যায় শুধু নাটক পড়ার সময়, দেখার সময় নয়। দুটি নমুনা দিয়ে শেষ করব।
‘‘সঞ্জীব : আমি কী হবো মানে?
ভূপতি : মানে— তুই কে? তোর কথা কী বলবো ওদের?
সঞ্জীব : কী আবার বলবি? বলবি— বন্ধু!
ভূপতি : না না, তুই বুঝতে পারছিস না। এই বাদশাহি স্কীমে বন্ধু ঢোকাই কী করে?
[মনোহরের প্রবেশ।]
মনোহর, রাজার কি বন্ধু থাকতে পারে এরকম?
মনোহর : বন্ধু?
ভূপতি : তুই রায় রায়ান চক্রবর্তী সব ঝাড়লি। আমি গোলাপ শুঁকলাম। তারপর বললাম— আমার বন্ধু সঞ্জীব বোস! কীরকম ইয়ে হয়ে যাচ্ছে না?
[সত্যিই যেন কীরকম ‘ইয়ে’ হইয়া যাইতেছে।]’’
***
‘‘মনোহর : বন্দেগি আমির মেহমান। গরিবখানায় তসরিফ রাখতে হুকুম হোক। আমি রাজাবাহাদুরকে এত্তেলা দিই।
[মনোহর ভিতরে গেল। হালদারের মুখের বিষ্ময় আবার মুগ্ধতায় পরিণত হইল।]
হালদার : ক্যাপিটাল! ক্যাপিটাল! সুপার্ব।
[পরম তৃপ্তিতে দুই হাত ঘসিয়া চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। চোখ আটকাইল সিংহাসনটিতে। মনোহরের প্রবেশ। পিছনে ভূপতি ও সঞ্জীব। মনোহরের ঘোষণায় মিঃ হালদার চমকাইয়া ফিরিলেন।]
মনোহর : রায় রায়ান রাজচক্রবর্তী শ্রীল শ্রীমান রাজা ভূপতি রায় ভুইঞা বাহাদু—র!
[ভূপতি এক পা অগ্রসর হইয়া রাজকীয় কায়দায় ঘাড় ঝুঁকাইল। অর্থাৎ যে কায়দা তাহার রাজকীয় মনে হইল।]’’

ঋণ : বাদল সরকার। রঙ্গনাট্য সংকলন। অপেরা, ১৪০৫ ব.।
Palmer, D. J. Ed. Comedy: Developments in Criticism. A Casebook. London: Macmillan, 1984.
Stott, Andrew. Comedy. New York, London: Routledge, 2005. 

শুভেন্দু সরকার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজে যোগ দিয়ে মাইথনে থাকাকালীন একটি ‘রিহার্সাল ক্লাব’ গঠন করেন বাদল সরকার (১৯২৫-২০১১)। কিন্তু অভিনয়ের জন্যে নাটক বাছতে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর মনে হতাশা জাগল। আর তা থেকে শুরু হল নিজে নাটক লেখার চেষ্টা। তাঁর হাত দিয়ে বেরোল পরপর চারটি হাসির নাটক— ‘সলিউশন এক্স’ (১৯৫৬), ‘বড়ো পিসীমা’ (১৯৫৯), ‘শনিবার’ (১৯৫৯) আর [...]

আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST