বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১৫

শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য

যুদ্ধং শরণং গচ্ছামি : আমেরিকা বনাম চিন

“Considering the weight of a country’s strength in science and technology in its comprehensive power, as well as the re-positioning of China as a “strategic rival” by a large part of the U.S. policy and even business circles, the tech war is likely to continue for quite a few years into the future, and its negative effects will spill over to other countries and further undermine the existing international political and economic order” —Sun Haiyong, Senior Research Fellow at the Center for American Studies, Shanghai Institutes for International Studies.

বেদব্যাসের মহাভারত থেকে হোমারের ইলিয়াড— কুরুক্ষেত্র ও ট্রোজান যুদ্ধের কথা উঠলে দ্রৌপদী ও হেলেনের নাম না নিলেই নয়। সেই অতি পুরনো পুরাণ-কল্পলোকই হোক বা উপনিবেশ দখলের জন্য বিশ শতকের দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মোক্ষম প্রতিশোধ নিতে ব্রহ্মাস্ত্র, সুদর্শন চক্র থেকে লিউইস মেশিনগান বা আন্টিট্যাঙ্ক বাজুকা, এইসব ছাড়া কোনও পক্ষেরই যেন চলে না। অতএব যুদ্ধের বাজিমাতে অস্ত্র অপরিহার্য। ১৯৪৭ সালের পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যের ঠান্ডা যুদ্ধে (cold war) একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার না হলেও পরোক্ষভাবে সেইসব মারাত্মক হাতিয়ারের ব্যবহার হয়েছে কিন্তু বিপুল। যুগ বদলেছে। সেইসঙ্গে বদলে গিয়েছে যুদ্ধের কৌশল। কে হবে এখন অর্থনীতি-জগতের একচ্ছত্র অধিপতি, রাজনৈতিক ক্ষমতার একমেবাদ্বিতীয়ম রাজরাজেশ্বর। বিশ্ব দখলের লড়াইয়ে সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুই সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও চিনের মধ্যে। মূল উদ্দেশ্য একে অপরকে টেক্কা দিয়ে বিশ্ববাণিজ্য দখল। মুদ্রা যুদ্ধে (currency war) নিজেদের মুদ্রার মূল্য কমিয়ে রফতানি বাড়িয়ে বিশ্ববাণিজ্যে নিজেদের জায়গা মজবুত করে বিরোধী দেশগুলির বাণিজ্যক্ষেত্র দখল করা থেকে এই লড়াই শুরু। তারপরেই আমদানি শুল্কের ব্যাপক বৃদ্ধি। মুদ্রা যুদ্ধ রূপান্তরিত হল বাণিজ্য যুদ্ধে (trade war)। চিন থেকে আসা বিশ হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর প্রায় দ্বিগুণ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা। পণ্য বলতে প্রায় সবরকম। খাবারদাবার থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, কিছুই বাদ যায়নি। চিনও ছাড়ার পাত্র নয়। আমেরিকার ছ’হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছিল এমনইভাবে যাতে জাতীয় ক্ষেত্রে ব্যবসাবাণিজ্যের জায়গাটিতে কোনওরকম আঁচ না লাগে। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং— এই দুই মহারথীর মধ্যের সম্পর্ক ছিল আদায় কাঁচকলায়। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন শি জিনপিং। এঁদের মধ্যে সম্পর্ক কীরকম হবে তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু মুদ্রা, বাণিজ্য হয়ে টানাপড়েনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র এখন প্রযুক্তি যুদ্ধই (tech war)।
অমলকান্তির জানা-বোঝার জায়গাটা এখন আগের চেয়ে অনেকটাই বড়। চারপাশে যা ঘটছে তার কার্যকারণ এখন সে ঢের বেশি বোঝে। বায়োইনফরমেটিক্স, ব্লকচেন আর কোয়ান্টাম দুনিয়ায় বিভোর হয়েও সে কিন্তু ঠিক খেয়াল করেছে যে ইদানীং প্রচুর পরিমাণ চাইনিজ জিনিসপত্রে বাজার ছেয়ে গিয়েছে। সে নিজেও দু-এক পিস কিনেছে। টেকসই হওয়ার কোনও গ্যারান্টি না থাকলেও নামে, দামে আর চেহারায় প্রথম দৃষ্টিতে জিনিসগুলোর প্রেমে পড়তেই হয়। সে ভাবে, ভারতে চিনা দ্রব্য বেশি বিক্রি হলে মেড ইন ইন্ডিয়া লেখা জিনিসপত্রগুলির কী হবে। সে খবর পায় যে ভারত নাকি আমেরিকাকে ৭৫৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ব্যাপারটা ভাল না মন্দ তা না বুঝে সে ধরে নেয়, বিশ্ববাণিজ্যে ভারত এবার বুঝি সাত কদম এগিয়ে গেল। এই আনন্দে ভারতীয় বাণিজ্যের ক্ষতি না করে কম দামে হরেক চিনা দ্রব্য টপাটপ কিনে সেও তার ব্যক্তিগত সঞ্চয় খানিক রঙিন করে ফেলবে। খবরে সে আজকাল প্রায়ই দেখে, আমেরিকা আর চিনের নাম বারবার ঘুরে ফিরে আসে, যুদ্ধ-যুদ্ধ আবহাওয়া তৈরি হয়। ভারত চিনের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ ব্যাপারস্যাপারগুলো লাদাখ আর সীমান্ত অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করে কিন্তু আমেরিকা ময়দানে এলেই যুদ্ধের পরিসর যেন একলাফে কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
তার চোখে ব্যবসাবাণিজ্য তো দিব্যি চলছে চারদিকে। করোনাকালে অনেক কিছু এদিক-ওদিক হলেও সব কিছু পুরনো ছন্দে ঠিকই ফিরবে, সে বিশ্বাস তার আছে। তাহলে আমেরিকা-চিনের মধ্যে রণং দেহি মনোভাব কেন? আমেরিকার তো কত জিনিস আছে সারা পৃথিবীতে রপ্তানি করার মতো। চিনের সেইসব জিনিস কেনার মতো টাকাও আছে প্রচুর। তাহলে হ্যান্ডশেক করে নিলেই তো হয়। দু’দেশেরই লাভ। অমলকান্তি বুঝতেই পারেনি যে এইসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর জিওপলিটিক্স, জাতীয়তাবাদী অহং, অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং সম্প্রতি যোগ হয়েছে প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া অধিকারের অভূতপূর্ব মিশ্রণের অদ্ভুত এক খেলা।
আগুনে ঘি পড়েছিল যখন চিনা সংস্থা হুয়াওয়ের (huawei) সিএফও-কে (chief financial officer) আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগ আটক করে। ৬৫ বিলিয়ন ডলারের সংস্থা হুয়াওয়ে এই মুহূর্তে স্যামসাংয়ের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে বিশ্বের এক নম্বর টেলিকমিউনিকেশন সংস্থা হওয়ার দৌড়ে। অ্যাপলকে (Apple) পেছনে ফেলে মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং স্মার্টফোনের দুনিয়ায় বেশ বড়সড় থাবা বসিয়েছে। আমেরিকার সন্দেহ হয়, এই সংস্থা চিনের হয়ে নজরদারি করছে না তো দেশের গোপন সমস্ত কারবারের ওপর! স্মার্টফোনের মধ্যে দিয়ে আজব সব প্রযুক্তির সাহায্যে দরকারি সব আমেরিকান তথ্য হয়তো চিনে বেমালুম পাচার হয়ে যাচ্ছে! সন্দেহ অমূলক নয়, কারণ প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় চিন আমেরিকার ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে অনেকদিন হল।

5G প্রতিশ্রুতি নিয়ে হুয়াওয়ে।

এ কথা সত্য যে, আজকের বিশ্ব করোনার প্রভাব কাটিয়ে এখনও গ্লোবাল ভ্যালু অ্যাডেড চেনের (global value added chain) মধ্যে দিয়ে একে অপরের সঙ্গে চাহিদা যোগানের খেলায় আঁটসাঁট হয়ে যুক্ত থাকার চেষ্টা করছে। আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে বা বিশেষ কোনও সংস্থাকে শত্রু দেশের গুপ্তচর ধরে নিয়ে একঘরে করে দিলেও সমস্যার সমাধান অত সহজে হবে না। উল্টে নিজেদের দেশেরই সাধারণ মানুষকে খেসারত দিতে হবে অনেক বেশি দাম দিয়ে জিনিসপত্র কিনে। তবুও ক্ষমতার লোভ আর অহংয়ের মাশুল দিতে হল হুয়াওয়েকে। হুয়াওয়ে ইতিমধ্যে শুধু টেলিকম জগৎকেই দখল করেনি, ভবিষ্যতের ডিজিটাল বিপ্লবের প্রস্তরফলক ফাইভ-জি প্রযুক্তিতেও রীতিমতো হাত পাকিয়েছে। নিজের দেশের হাতের মুঠোয় এই প্রযুক্তিকে ধরে রাখতে পারলেই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আগামী কয়েক দশকের জন্য এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা চূড়ান্ত। এইসবই আমেরিকার কাছে ভয়ের কারণ। পাছে প্রযুক্তির লড়াইয়ে চিন জিতে বেরিয়ে যায় তাই আগেভাগেই হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে একেবারেই সময় নষ্ট করেনি ট্রাম্প পরিচালিত বিশেষ দলটি।
হুয়াওয়ে আমেরিকার অন্যতম তিনটি প্রথম সারির প্রযুক্তি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। ইনটেল, কোয়ালকম এবং গুগল। গুগলের অ্যানড্রয়েড সিস্টেম হুয়াওয়ের বিভিন্ন প্রোডাক্টে বহুল ব্যবহৃত। নিষেধাজ্ঞার জন্য এই তিনটি আমেরিকান সংস্থার সমস্তরকম বাণিজ্যিক পরিষেবা থেকে হুয়াওয়েকে ছেঁটে ফেলা হল। গুগল জানিয়ে দিল, ভবিষ্যতের হুয়াওয়ে ফোনগুলিতে গুগলের কোনও লাইসেন্সড অ্যাপ থাকবে না। জাতীয় অহং ও আন্তর্জাতিক ধনতন্ত্রের জটিল দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে গুগলকেও বুকে পাথর রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। বেশি নয়, গুগলকে রেভেনিউতে মাত্র হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি কিছু আর্থিক ক্ষতি মেনে নিতে হয়!
অমলকান্তির মতোই অনেক প্রযুক্তিপ্রেমী মানুষ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে আছেন। আমেরিকা থেকে হংকং। হংকংয়ের তেমনই একজন খরিদ্দার হুয়াওয়ের ফোন কেনার কথা ভাবছিলেন। তিনি জানতে পারেন, গুগল ম্যাপ ও অন্যান্য আরও চমৎকার সব গুগল অ্যাপ এখন থেকে আর সেই মোবাইলে পাওয়া যাবে না। অতএব কিনতে হলে হুয়াওয়ে নয়, অন্য কোনও মোবাইল। বড় সংখ্যার মানুষ যদি এই কাণ্ডটি ঘটাতে শুরু করেন, হুয়াওয়ে তো বটেই, যে সমস্ত খুচরো দোকান এই মোবাইল বিক্রির ওপর নির্ভরশীল, তাদেরও কপালে দুর্ভোগ অবধারিত। তবে চিন মোটেই দমে যাওয়ার মতো দেশ নয়। প্রযুক্তির আঙিনায় যে দেশ লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে তারা গুগলের অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেমের বিকল্প (harmonyOS) তৈরিতে খুব বেশি দেরি করেনি।
একে অপরকে টেক্কা দিতে এই দুই দেশ সবসময় হাতা গুটিয়ে প্রস্তুত। ঠান্ডা প্রযুক্তি যুদ্ধ যখন জমে উঠছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ও সেরা হওয়ার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে গড়ে উঠছে এক অদৃশ্য দেওয়াল। এর কেতাবি নাম ডিজিটাল আয়রন কার্টেন (digital iron curtain)।
মজার কথা হল, চিনের মানুষরা কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন না। সে জায়গা নিয়েছে উইচ্যাট। এছাড়াও সেখানকার লোকজন যে সমস্ত অ্যাপ মোবাইলে রাখেন সেগুলি অমলকান্তির পছন্দের অ্যাপের সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। সে কারণে অমলকান্তি যদি চিন বেড়াতে গিয়ে নিজের পছন্দের অ্যাপগুলির আনন্দ নিতে চায়, তার দুটো আলাদা ফোন ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। আমেরিকার কোনওরকম প্রযুক্তিগত সাহায্য ছাড়াই জাতীয় স্তরে ধুরন্ধর সব প্রযুক্তিবিদদের কলাকৌশলে চিনে তৈরি হচ্ছে আশ্চর্য সব উদ্ভাবন। এসবই কিন্তু একান্তভাবে চিনের মানুষদের জন্য। তাবড় তাবড় ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা বিনিয়োগ করছেন প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। বাতাসে খবর ভাসছে যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির রাজ্যে সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে চলেছে চিন। এই মুহূর্তে চিনের লক্ষ্য ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ (Made in China 2025) প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হয়ে প্রযুক্তির বাজার কবজা করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা।

কিছু জনপ্রিয় চাইনিজ অ্যাপ।

আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা জারি করে শত্রুতা ঘোষণা করেছে বটে কিন্তু নিজেও পড়েছে ফ্যাসাদে। চায়নায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণে রেয়ার আর্থ মৌল (rare-earth element) পাওয়া যায়। সারা পৃথিবীর প্রায় সত্তর শতাংশ। এইগুলির মূল ব্যবহার হয় বিভিন্ন ইলেকট্রনিক দ্রব্য, বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, মিলিটারি জেট ইঞ্জিন, টিভি মনিটর, লেসার ইত্যাদিতে যা বর্তমানে প্রযুক্তি সম্রাট আমেরিকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকাকে বিপাকে ফেলতে চিন কি আদৌ দু’বার ভাববে! ২০১০ সালে জাপানকে এই একই জায়গায় বঞ্চিত করতে পারলে আমেরিকাতেও রেয়ার আর্থ মৌলগুলির যোগান বন্ধ করে দেওয়া কী এমন কঠিন সিদ্ধান্ত। কঠিন না হলেও সবই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলিতে দুই দেশের প্রভাব, কূটনীতি এবং চুলচেরা ক্ষেত্রসমীক্ষার ওপর। কোনও বড়সড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই দেশকেই বুঝে নিতে হবে খাল কেটে কুমির আনতে আন্তর্জাতিক জলাশয় ছেড়ে দেশীয় জলে সংকট ছড়িয়ে না পড়ে।
প্রকৃত অর্থে ডোনাল্ড ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের আগামীর চিন গড়ার সমস্ত আয়োজনকেই বানচাল করতে চেয়েছেন যেন তেন প্রকারেণ। যেসকল চিনা ছাত্ররা আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রযুক্তির পাঠ নিতে এসেছেন তাদের ভিসাতে পর্যন্ত কড়াকড়ি করা হয়েছে। পাছে প্রযুক্তির গূঢ় বিষয়গুলি বুঝে নিয়ে তারা চিনা প্রযুক্তিকেই না মজবুত করে দেয়। তাই আগেভাগেই কাটছাঁট। এমনকি বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থাগুলির সঙ্গে অ্যাপলকেও চিন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিনা প্রযুক্তি বাণিজ্যের শৃঙ্খলা ভাঙতে আমেরিকা এতটাই তৎপর।
একই কথা আবার উল্টো মেরুতেও খাটে। চিন ভাল করেই জানে যে, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিকে কবজা করতে পারলেই সমস্তরকম অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলিও চলে আসবে হাতের মুঠোয়। কী ঘটবে তা জোর দিয়ে বলা মুশকিল কিন্তু যাই ঘটুক না কেন, একথা স্পষ্ট যে লাভের গুড়ের সিংহভাগ চেটেপুটে নিতে পারবে যেকোনও একটি দেশ। আমেরিকা অথবা চিন।
দু’জন মহারথী যুদ্ধে মেতে উঠলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল। অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এশিয়ায় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। অন্যান্য দেশের মতোই সিঙ্গাপুরের মতো জায়গায় গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক সংস্থাগুলি গ্লোবাল সাপ্লাই চেনেরই অংশ এবং এই সাপ্লাই চেনের সিংহভাগ আমেরিকা, চায়নার দখলে। প্রযুক্তির বিভিন্ন মালমশলায় নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়বে। সমস্যা গভীরতর হতে পারে যদি এই দ্বন্দ্বে বিশ্ব অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির রাজ্যে দুটো বিপরীত মেরু তৈরি হয়। দুটি পরস্পরবিরোধী নতুন গোষ্ঠী আমেরিকা এবং চিনের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠবে। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্য গ্লোবাল ভ্যালু অ্যাডেড চেইনের মধ্যে জড়িয়ে আছে বলেই এই দুই মহীরুহ দেশের যেকোনও একটিকে বাদ দিয়ে ধনতান্ত্রিক কাঠামোয় মুনাফা বাড়িয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তিগত গবেষণা এবং কাঠামোর বিচারে আমেরিকা অনেক এগিয়ে থাকলেও প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন অতি প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনে চিনই প্রথম। অতএব দুই দেশের মধ্যের প্রযুক্তির লড়াই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখবর নয়।

কাঁটায় কাঁটায়, স্যামসাং হুয়াওয়ে অ্যাপল।

কয়েক দশক আগেও চিনকে শ্রেষ্ঠ কপিক্যাট (copycat) হিসেবেই ভাবা হত। সস্তায় বিশ্বের সবরকম প্রযুক্তিরই বিকল্প পাওয়া যেত চিনা বাজারে। নকল করে অবিকল আসলটির মতো যন্ত্র তৈরি করতে তাদের জুড়ি মেলা ভার। আসলের মতো, আবার দামেও বেশ সস্তা, আর সস্তা বলেই একসময় বাজার উপচে পড়েছিল চিনা দ্রব্যে। কিন্তু এখন আর নকলনবিশি নয়, প্রকৃত উন্নতমানের উদ্ভাবনে বিশ্বকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে চিন। টেলিকমিউনিকেশন থেকে রোবোটিক্স, সবেতেই দক্ষ মৌলিক গবেষণার ছাপ। আমাজন, গুগল বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ইন্টারনেট ইকোসিস্টেমে দৈনিক এন্তার লেনদেন চালাচ্ছেন কোটি কোটি চিনা মানুষ দিনের পর দিন। তরুণ প্রতিভাবান প্রযুক্তিবিদদের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে নিয়ে মৌলিক উদ্ভাবনে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কাজ এগিয়ে চলেছে। সাবধানবাণী পৌঁছে গিয়েছে হোয়াইট হাউসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা উসকে দিয়েছিল চিনের জাতীয়তাবাদী অহংকে। প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে অবিচল চিন এগিয়ে চলেছে ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’-কে সামনে রেখে। বুদ্ধিজীবীদের দেওয়া নাম মারকেট লেনিনিজমের (market Leninism) আদর্শে আখেরে ধনতন্ত্রকেই আঁকড়ে ধরে আমেরিকাকে প্রত্যুত্তর দিতে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন একঝাঁক শিল্পপতি। কৃত্রিম মেধায় বিশেষজ্ঞ ডক্টর কাই-ফু লি (Kai-Fu Lee) অবশ্য চিনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যথেষ্টই আশার আলো দেখছেন। এই মুহূর্তে প্রযুক্তি গবেষণায় আমেরিকা একচেটিয়া হলেও চিনের সিলিকন ভ্যালি খুব তাড়াতাড়ি আমেরিকাকে সমানে টেক্কা দেবে বলে জোর গলায় দাবি করেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন যে, চিন বর্তমানে নতুন একটি শহর গড়ার পরিকল্পনা করছে যেখানে মাটির তলা দিয়ে চলবে কৃত্রিম মেধায় পুষ্ট চালকহীন গাড়ি। মসৃণ হাইওয়েতে থাকবে সঠিক সেন্সর যা গাড়িগুলিকে সাহায্য করবে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সবচেয়ে কম সময়ে। মাটির ওপর দিয়ে নিশ্চিন্তে পথচারীরা হেঁটে যাবেন। বাইসাইকেল নিয়ে আনন্দে মেতে উঠবে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে ভবিষ্যতের এই শহর। চিনা সরকার ম্যামথ পরিমাণে ডলার বিনিয়োগ করছে এইসকল উদ্যোগের বাস্তবায়নে।
এইরকম পরিস্থিতিতে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরোর সঙ্গে চিনা মুদ্রা ইউয়ানের উঠে আসার সম্ভাবনাও ক্রমশ বাড়ছে। আমেরিকান পুঁজিপতিরা সহজে চিন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছেন না। হালের ভারতে পাশ হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতির (NEP) সুযোগে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভারতে প্রবেশ করিয়ে আমেরিকা একধরনের মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, ছোট করে হলেও ভ্যালু চেন যাতে মুখ থুবড়ে না পড়ে। ভারতের মতোই তাদের তাঁবেদারি করা দেশগুলিকে নিয়ে চিনের বিস্তারকে প্রতিহত করতে ফেসবুকের মতোই আরও অনেক কর্পোরেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্র ও ধনতন্ত্রকে দুধে-ভাতে রাখার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে আমেরিকা আগের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে।
গত বছরের ঘটনা। ফেসবুকের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক বেশ অনেকবারই শিরোনামে জায়গা করেছে। জানা গিয়েছে যে, ২০ নভেম্বর ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ ও ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ডিনার সেরেছেন। সুস্বাদু খাবার মুখে বৈঠকি চালে কী কথাবার্তা চলেছে তা অবশ্য গোপনই রাখা হয়েছে। সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক মাধ্যমটিকে আসন্ন ভোটের স্বার্থে একটি আদর্শ বিজ্ঞাপনের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ ট্রাম্প হারাতে চাননি এবং বিনিময়ে জাকারবার্গ পান মামলা মোকদ্দমা থেকে রেহাই ও ট্রাম্প বিরোধী মার্কিন সেনেটেরদের জোয়াল থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্র।

রাষ্ট্র ও কর্পোরেট আঁতাত।

অমলকান্তি জানে, ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের হেরে যাওয়ার আড়ালে ফেসবুক ও কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার কারসাজির কথা। সে ইতিমধ্যেই খেয়াল করেছে যে, ফেসবুকের পেজে বিশেষ কিছু ছবি বা লেখা হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়ে সেই জায়গায় ‘Content not available’ জাতীয় কিছু কথা এসে হাজির হচ্ছে আজকাল। অমলকান্তি জানে যে ফেসবুকের community standard মেনে না চলা পোস্টগুলিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই কমিউনিটি স্ট্যান্ড্যার্ন্ডের এর অন্যতম প্রধান বিষয়টি হল Hate speech। ফেসবুকের নিজস্ব বয়ানে, “We do not allow hate speech on Facebook because it creates an environment of intimidation and exclusion, and in some cases, may promote real-world violence.”। স্পষ্ট এই ঘোষণার জন্য ফেসবুককে বাহবা না দিলেই নয়। কিন্তু অমলকান্তির মনে প্রশ্ন ওঠে, এই যদি ফেসবুকের গাইডলাইন হয় তাহলে সর্বজনবিদিত একজন উগ্র হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টকে ক্ষমতায় আনতে ফেসবুকের এত উৎসাহ দেখা দিয়েছিল কেন? সে আরও লক্ষ করেছে, ঘৃণা উসকে দেওয়া ভীষণ উগ্র কিছু লেখা ফেসবুকের পাতায় আজকাল দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। তাহলে কি ভেতরে ভেতরে আঁতাতবদ্ধ রাষ্ট্র ও কর্পোরেট! ক্ষমতার জন্য! আরও আরও অনেক মুনাফার জন্য! নিজেদের ক্ষমতাকে চূড়ান্ত করতে মানুষগুলো মনুষ্যত্বের কতটা অংশ জলাঞ্জলি দিতে পারে! অমলকান্তির প্রচণ্ড রাগ হয়। সে ভাবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হাত ধরে কি আমেরিকা নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন বিশ্ব গড়ে তুলবে। কেমন হবে সেই পৃথিবী! মুদ্রা, বাণিজ্য আর প্রযুক্তি যুদ্ধের ঠান্ডা জল কোনদিকে গড়ায় সেদিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কি তার কিছুই করার নেই!

ছবি : ইন্টারনেট

(পরের পর্ব আগামী বুধবার)

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ২

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৩

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৪

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৫

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৬

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৭

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৮

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ৯

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১০

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১১

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১২

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১৩

প্রযুক্তি, তক্কো, গপ্পো পর্ব ১৪

মতামত জানান

Your email address will not be published.