বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৮

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

অসময়ের আগন্তুক : সমর সেন

সমর সেনের কথা মনে এল কেন, এমন অসময়ে? বস্তুত এই হিমের রাতে ঠোঁটকাটা এই বুদ্ধিজীবীর কথা মনে এল খানিকটা বিরক্তি থেকেই। একটি জাতির জীবনে এত বড় বিপর্যয় যা আন্তর্জাতিক সংকটের সঙ্গে জড়িত তা উপলব্ধি করেও সবক’টি প্রতিষ্ঠান, সরকার, মিডিয়া এবং জনসাধারণের নানা মুখ ও মুখোশ প্রত্যেকেই যেভাবে উৎসবমদির হয়ে গেল তাতে আমার মনে হয় সমর সেন নামের কবি ও সাংবাদিকের তিক্ততা ও কটুকৌতুক ধার নিতে পারতাম। কেউ আজকাল কিছুতেই আপত্তি করে না। সমর সেন করতেন। আর অক্লেশে তাই বলতে পেরেছিলেন, ‘কিন্তু বুঝি না তাকে/দুধ ও তামাকে সমান আগ্রহ যার,/দুনৌকার যাত্রী এই বাঙালী কবিকে,/বুঝি না নিজেকে।’ সেইজন্যই এতদিন পরে মনে হল, এই যে তিনি কবিতা লেখার বাধ্যতামূলক অভ্যাস থেকে স্বেচ্ছাবিদায় নিয়েছিলেন তা নির্বিকল্প শ্রদ্ধার। সমর সেনের মৌনব্রত বাঙালি কবিদের মতো বুদ্ধিস্খলিত স্থূলতার অবিরাম প্রজননকে কবির নিয়তি বলে মেনে নেয়নি।
অবশ্য আমরা কোন সমর সেনের কথা বলতে চাইছি? যেমন আমাদের মধ্যবিত্ত ও ঔপনিবেশিক খোয়ারি ভাঙার অভ্যাস থেকে ধারণা যে শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেনের পৌত্রের একমাত্র কীর্তি ইংরেজি ভাষার অত্যুত্তম ব্যবহার। সুতরাং ‘নাও’ ও ‘ফ্রন্টিয়ার’ সম্পাদনা সম্পর্কিত সুস্বাদু স্মৃতিচারণ অথবা— কবিরা যেন সচরাচর অতিমানুষ বা অবমানুষ— সমরবাবুর মনুষ্যত্ব বর্ণনা। অথচ আমরা জানি এইসব সুপ্রচারিত বাগবিভূতি যত ক্ষণপ্রভ, সমরবাবুর কাব্য তা নয়। সমরবাবুর সাংবাদিকতা নিশ্চয়ই দামি কিন্তু আরও দামি তাঁর সাহিত্যচর্চা। যেজন্য আমরা সমর সেনের উত্তরাধিকার বরণ করে নিয়েছি তা এ কারণে নয় যে তিনি ছিলেন একজন বংশগৌরবসম্পন্ন ইংরেজিনবিশ কিংবা একজন অভিজাত উগ্রপন্থী, বরং এই সামান্য কারণে যে তাঁর কবিতাবলি আমাদের ভাষার অলংকার একথা আমরা ভুলতে বসেছি।

গদ্যছন্দ ও নাগরিকতা বিষয়ে তাঁর খ্যাতি সুপরিজ্ঞাত। কিন্তু এবার অন্তত গুছিয়ে বলার সময় হয়েছে যে সমর সেন আদ্যন্ত এলিয়ে পড়া লাবণ্যের বিরুদ্ধে চেতনাচালিত এক দ্রোহকে সম্মুখবর্তী করেছেন। আর তাই যদি হয়, উত্তর-রবীন্দ্র কবিতার বিচারে সমর সেন শকুন্তলার এক আশ্চর্য আংটি।
এরকম একটি কুসংস্কার প্রায় সত্যের মর্যাদা পাচ্ছে যে আমাদের আধুনিকতার আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তী। সমর সেনকে এই পঞ্চপাণ্ডবের শ্রেণিভুক্ত করা হয় না। যুক্তি এক্ষেত্রে এই যে রবীন্দ্রনাথের অলোকসামান্য প্রতিভাকে উত্তীর্ণ হওয়ার আপ্রাণ আয়োজনে অথবা নতুন কাব্যাদর্শের বাধ্যতামূলক সন্ধানে তাঁকে, প্রথমোক্ত পাঁচজনের মতো, সর্বতোভাবে নিযুক্ত হতে হয়নি। অথচ উত্তর-রবীন্দ্র আমাদের কাব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিরিশ দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সমর সেন শুধু উদ্ভাবকের ভূমিকায় নয়, ১৯৩৫-এ প্রকাশিত অমিয় চক্রবর্তীর ‘খসড়া’বা ১৯৩৭-এ প্রকাশিত বুদ্ধদেববাবুর ‘কঙ্কাবতী’-র তুলনায় একই বছরে প্রকাশিত তাঁর ‘কয়েকটি কবিতা’ প্রায় এক সভ্যতা এগিয়ে। প্রথম পথিক তখনও হয়তো বিষ্ণু দে কিন্তু বুদ্ধদেব এবং জীবনানন্দ কুয়াশায় ঢাকা অনিশ্চিত স্বর্গের অভিযাত্রী। সুধীন্দ্রনাথও আত্মসচেতন তবু শহরের আবহাওয়ায় মুদ্রিত নন। কী যে অলৌকিক প্রতিভায় আমাদের কবিতায় আবেগের বিরুদ্ধে বুদ্ধির তপস্যা শুরু করলেন সমর সেন! স্তনযুগভারে ঈষৎ নতা কোনও তন্বীর মদির কটাক্ষ আমাদের স্বাগত জানায় না, অন্যদিকে সহসা, এই প্রথম দেখা মেলে আমিষাশী নাগরিকাদের : ‘শুধু কি সে ক্ষুধার্ত দীপ্তি, কঠিন ইশারা,/কিসের হিংস্র হাহাকার সে চোখে।’ (নাগরিকা)। উর্বর সেইসব মেয়েরা বিষণ্ণ মুখে চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে আসে। অবিরাম বর্ষণধারাকে সাক্ষী রেখে— রবীন্দ্রনাথ তখনও সশরীরে জীবিত— সমর সেন তাঁর মেঘদূতের যক্ষপ্রিয়াদের জন্য রেখে যান একটি সংহত বিদ্রূপ : ‘হে ম্লান মেয়ে, প্রেমে কী আনন্দ পাও,/কী আনন্দ পাও সন্তানধারণে?’ (মেঘদূত)। এই জিজ্ঞাসার সূত্র ধরে বলা যায়, সমরবাবুই আমাদের কবিতায় প্রথম স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বুর্জোয়া সভ্যতার জীব। যেজন্য তিনি আমাদের চিরঋণী করে রেখে যান তা হল, বাংলা কবিতার সেই রবীন্দ্রনাথ আচ্ছন্ন সুনিশ্চিত শান্তিনিকেতনে, শস্যশ্যামল সেই ফিউডালতন্ত্রে গতিসুদ্ধ শাহরিক জলবায়ুর প্রবর্তনে সফল হয়েছিলেন সমর সেন। আজ প্রায় আশি বছরের ব্যবধানে এই সাফল্যটুকু বিস্মরণযোগ্য মনে হতে পারে কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে ধারণা থাকলে শ্রদ্ধায় নত হওয়া ছাড়া পথ থাকে না।

অবশ্যমান্য ঈশ্বর গুপ্তের মধ্যে বিদ্যাপতি ও ভারতচন্দ্রের পরিশীলনের অভাব থাকলেও সাংবাদিকতার ধর্ম সুমুদ্রিত ছিল। তবু আর্থ-সামাজিক কারণেই তাঁরা শ্লথগতি, নিছক কৌতুকপরায়ণ ও চারুত্বে আস্থাশীল। অপরদিকে পুঁজিবাদী দাঁতচাপা সেই বৃদ্ধা গণিকা সমরবাবুর ধাত্রী বলেই তাঁর রচনা বেগবান, ধারালো। আক্রমণোদ্যত এবং অবদমিত আবেগের ভাস্কর্য। কারেন্সি সভ্যতার তিক্ততা ও অবিশ্বাস, ক্রোধ ও বিদ্রূপ, আর্তি ও অস্বীকার তাঁর বিশ্বস্ত সহচর বলেই সমর সেনের ভাষা, উপমা এবং সদর্থে কাব্যরীতিতে অপরিচয়ের জগৎ খুলে দেয়।
১. সাকারিনের মতো মিষ্টি একটি মেয়ের প্রেম।
২. সমস্ত পশ্চিম আকাশ যেন ইন্দ্রজিতের কুণ্ডল।
৩. তুমি কি আসবে আমাদের মধ্যবিত্ত রক্তে/দিগন্তে দুরন্ত মেঘের মতো।
৪. ‘আমি নহি পুরুরবা হে ঊর্বশী’/ মোটরে আর বারে/আর রবিবারে ডায়মন্ড হারবারে/কয়েক টাকার কয়েক প্রহরের আমাদের প্রেম/তারপর সামনে শূন্য মরুভূমি জ্বলে/বাঘের চোখের মতো।
৫. কাঁচা ডিম খেয়ে দুপুরে ঘুম/নাই ধর্ষণের ইতিহাস/পেস্তাচেরা চোখ মেলে প্রতিদিন পড়া/দৈনিক পত্রিকায়।
৬. জানি, রক্তহীন অন্তরে প্রতিদিন বারে বারে আসে/ফুটবল মাঠের চঞ্চলতা/অষ্টপ্রহর কাঁপে ভদ্রমহিলা দেখার তীব্র ব্যাকুলতা;
৭. এপ্রিলে যে সংগ্রাম শুরু, এ্যাসেমব্লি হলে হবে শেষ,/এ হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করে অনেক পার্টির চিত্ত।

আমরা প্রতিমুহূর্তে অনুভব করি তাঁর গদ্যছন্দ মোটেই দোলনরহিত নয় বরং স্বপ্নময়তার বিরুদ্ধে যুক্তির পরিস্রুত প্রকাশ। কবিতা নামের শিল্পমাধ্যমটির প্রতি সমরবাবুর প্রণয় নিঃস্বার্থ। আর লেখাতে ‘মতো’ও ‘যেন’-র অতিরিক্ত প্রয়োগ মনে করিয়ে দেয় উপমার প্রতি আমাদের আলোচ্য কবির মনোভাব পৌত্তলিকতাদোষে দুষ্ট। বাস্তবিক সমর সেন অবদমিত রোমান্টিকতার প্রতিনিধি— কলকাতার অধিবাসী এক তরুণ প্রুফ্রক। তিরিশ দশকের সূচনাতে পাউন্ড, ডলার ও মার্ক রুগ্‌ণ হয়ে পড়লে জনৈক দণ্ডিত যুবাপুরুষের ক্রোধ, অভিমান, হতাশা, বিষণ্ণতা, পরিহাস ও অমসৃণ যৌনতা জ্বলজ্বল করে ওঠে সমর সেনের রচনায়। এতদিন পর্যন্ত যা অশ্রুত ছিল সেই কথ্যভঙ্গিয় প্রাত্যহিকতা, ন্যাকামিবর্জিত ও সাংবাদিকতার সমধর্মী প্রত্যক্ষ উক্তি যার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে একটি অন্তরঙ্গ দীর্ঘশ্বাস— সমর সেন ভগীরথের মতো আমাদের বার্ধক্যচর্চিত কাব্যে নিয়ে এলেন যুবাধর্ম যা অনতিকাল পরে সবান্ধব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও ‘কৃত্তিবাস’পত্রিকার সদস্যদের প্রতিষ্ঠা পেতে সহায়তা দেয়। সমর সেনের যে যুবক ও বেকার প্রেমিক মদির মধ্যরাতে মৃত্যুহীন প্রেম থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করে, যার সকাল শুরু হয় কলতলায় গণিকার ক্লান্ত কোলাহলে সেই পরবর্তীকালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’-তে নিখিলেশের প্রতি প্রশ্নার্ত হয়ে ওঠে।
সমর সেন ও তাঁর ‘রাগী’ উত্তরসূরিরা সকলেই স্বতঃপ্রমাণিত আজ যে বিপ্লব নয়, মধ্যবিত্ত যুবকের বিক্ষোভ। সমর ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ করে আমরা স্বচ্ছন্দে দেখতে পাই প্রচলিত সরস্বতীই কমবেশি পরিবর্তিত প্রসাধনসম্ভারে সজ্জিত হয়ে তাঁদের অঙ্কশায়ী। লাবণ্যটুকু ঢাকা আছে আপাত-নিষ্ঠুরতার আড়ালে। সমর সেন নিজেও হয়তো আতঙ্কিত হয়েছিলেন এই ধরনের কবিতার সম্ভাব্য পরিণতিতে। তিনি আত্মসম্মানসম্পন্ন ছিলেন বলেই বাকচাতুর্য পরিহার করে নীরব হয়ে গেলেন।
অতঃপর একদা ‘কবিতা’ পত্রিকার সহ-সম্পাদককে আমরা অনুবাদক, ইংরেজি সাময়িকীর সম্পাদক এবং একজন বিবেকবান বুদ্ধিজীবী হিসেবে দেখব কিন্তু কবিতার জন্য আর কোনও পুনর্মিলনের আবেদন তিনি রাখেননি। এই সংযম, এই নিঃশব্দতাকে আমি সম্মান করি। তিনি সামাজিক উত্থানপতনে তীব্রভাবে অনুরাগ ও পরিহাস ব্যক্ত করতেন কিন্তু কবিতাকে হালকা চালে সম্পাদকীয়তে পরিণত হতে দিতে তাঁর আপত্তি ছিল। সেই জন্যেই উত্তর শারদীয়া মুহূর্তে এই একক ‘জেহাদি’-র সামনে টুপি নামিয়ে রাখতে আমার কোনও দ্বিধা হয় না।

অঙ্কন : সৌজন্য চক্রবর্তী

(পরের পর্ব ডিসেম্বর সংখ্যায়)

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ১

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ২

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৩

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৪

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৫

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৬

প্রতিপ্রস্তাব পর্ব ৭

মতামত জানান

Your email address will not be published.