বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

পাপীতাপী ও যোগিনী – ৪

অভিজিৎ সেন

পশ্চিমবাংলার যেসব চাকরিজীবী বদলির চাকরি করে তাদের কাছে উত্তরের জেলাগুলোয় বদলি বড় অপছন্দ। কারও কারও কাছে শাস্তি, বিভীষিকা, এমনকি সভ্যতা থেকে নির্বাসন।
বিনায়কের ভবিতব্য তাকে উত্তরের জেলাগুলোর সঙ্গে বেশ ভাল করে বেঁধে ফেলেছিল। পাঁচ-ছ’ বছর পরে তাকে ফের উত্তরবঙ্গে আসতে হল। এবার বিনায়ক উত্তরের আঞ্চলিক অফিসের কর্তাদের একজন। মাসখানেকের মধ্যে মোটামুটি থিতু হয়ে ব্রাঞ্চ পরিদর্শনে যাওয়া শুরু করল সে।
বিনয় মোহনপুরাতেই আছে। বদলি এবং প্রমোশন দুটোই সে সযত্নে এড়িয়ে চলেছে। মোনহপুরায় দ্বীপান্তরের জন্য লোক পাওয়া চিরকালই দায়। কাজেই সে কারণে ব্যাঙ্ক তার ওপরে খুশিই ছিল। কিন্তু সে প্রমোশনের জন্য আবেদন সযত্নে এড়িয়ে যাচ্ছে। সামাজিক ও শারীরিক কারণে প্রমোশন পাওয়া অন্যদের থেকে তার বরং সহজই হত। এ কারণে কর্তৃপক্ষকে কোনও কোনও মহল থেকে কখনও কখনও কথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু বিনয় মোহনপুরা তথা তার দেবতা লক্ষ্মীতারাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না।
আঞ্চলিক অফিসে আসার পর বিনায়ক কলকাতার প্রধান অফিসে একদিন কাজে এসেছে, হঠাৎ রেণুকা এসে একপাশে দাঁড়াল। বিনায়ক বলল, কেমন আছ? কিছু বলবে?
সে ঘাড় নেড়ে চুপ করে রইল।
সঙ্গে অন্য অফিসাররা ছিল। বিনায়কের মনে হল রেণুকা আলাদা করে তাকে কিছু বলতে চায়।
তারা অফিস ক্যান্টিনে গিয়ে আগের দু-একবারের অনুরূপ দু’কাপ চা নিয়ে বসল।
রেণুকা বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ে একবার চুমুক দিল। বিনায়ক অগত্যা চায়ে মন দিল।
রেণুকার জীবনে এই সময়ের মধ্যে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে সেই মোহনপুরা থেকে ফিরে আসার মাস তিনেক পরে ভবতোষ একদিন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে বোতল খুলে বসল। সে সময় তার অফিস যাওয়াও খুব অনিয়মিত হয়ে গেছে। মদকে একমাত্র রেহাই ভেবে সে একেবারে অ্যালকোহলিক হয়ে পড়েছিল। তার বাসার স্বল্প আলোকিত একটা কোণে বসে সে দীর্ঘক্ষণ ধরে পান করত।
সেদিন মদের বোতলের পাশাপাশি একটা কীটনাশকের বোতল সে সাজিয়ে নিয়েছিল।
রেণুকা খেয়াল করেনি। খেয়াল করার কোনও কারণও ছিল না। খেয়াল করলেও কিছু করার ছিল না তার।
পরদিন ভোররাতে লক্ষ্মীতারার ভবিষ্যদ্‌বাণী সার্থক করে হাসপাতালে মারা যায় ভবতোষ।

প্রথম পর্বের তৃতীয় সাক্ষাৎকারে লক্ষ্মীতারা বিনায়ককে তার বাড়ির বাইরের ঘরে বসিয়েছিল। তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর ভবতোষের মৃত্যু নিয়ে তার ভবিষ্যদ্‌বাণীকে বিনায়কের বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল। কারণ বিনয়ের জীবনের ছন্দ খুঁজে পাওয়ার ইতিহাস সবাই যেমন জানত তাতে লক্ষ্মীতারার অবদান বিশেষ কিছু ছিল না। বিনয় প্রায় আজন্ম শারীরিক প্রতিবন্ধী। মানসিক দিক থেকেও, প্রতিবন্ধকতার কারণে কিনা কেউ বলতে পারে না, সে দুর্বল ছিল।
সুখেন্দু সরকার নামে একজন অফিসার লাখ পাঁচেক টাকার জালিয়াতি করে আপাতদৃষ্টিতে ফেঁসে যায়। ব্যাঙ্কে এ ধরনের ঘটনা আদৌ দুষ্প্রাপ্য নয়। সুখেন্দু অস্বীকার করলেও দায়িত্ব পুরোপুরি এড়াতে পারেনি। যদিও কার্যকারণ বিচার করে সবাই বুঝেছিল যে টাকাটা সে-ই চুরি করেছে। কিন্তু ভিজিলেন্স তাকে নিঃসংশয় ফাঁসাবার মতো সাক্ষ্যপ্রমাণ হাতে পায়নি। ফলে আইনি ঝামেলায় গেলে সুখেন্দু তো বটেই, আরও দু-তিনজন অসাবধানী সহকর্মীও এ ব্যাপারে জড়িয়ে যাবে এবং শাস্তি পাবে। তাদের অপরাধ ছিল সুখেন্দুর বাড়িয়ে দেওয়া ভাউচারে তারা সাধারণ বিশ্বাসে সই করে দিয়েছে বা এ ধরনের লঘু ত্রুটিতে অংশগ্রহণকারী সাব্যস্ত হয়েছে। অথচ ব্যাঙ্কে যারা চাকরি করে তারা সবাই জানে, পরস্পরকে বিশ্বাস না করলে ব্যাঙ্কে দিনের কাজ শেষ করাই সম্ভব নয়। ফলে, আইনি ঝামেলায় গেলে সুখেন্দু তো বটেই, অন্য দু-তিনজনও পাল্টা মামলা করলে বা সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে মামলায় হেরেও যেতে পারে ব্যাঙ্ক।
এইসব বিবেচনায় ব্যাঙ্ক সুখেন্দুর সঙ্গে একটা অলিখিত চুক্তি করে।
এক, টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে সুখেন্দু অপরাধ স্বীকার করবে।
দুই, শাস্তিস্বরূপ তার ছ’বছরের বেতন বৃদ্ধি, যা মাসিক তিন হাজার টাকার মতো, তার বেতন থেকে চিরকালের মতো কেটে নেওয়া হবে।
উপরন্তু, যেখানে কেউ যেতে চায় না, সেইরকম দূরবর্তী ও যাতায়াতের বিচারে দুর্গম ব্রাঞ্চে থাকে ট্রান্সফার করা হবে।
সুখেন্দুকে দু’বছরের জন্য বদলি করা হয়েছিল মোহনপুরাতে।
সুখেন্দুর এসব মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
কিন্তু মোহনপুরায় দু’বছর ম্যানেজারি করা এবং বনবাস তেমন নিঃসঙ্গ হয়নি তার। সম্ভবত দুঃখের হয়নি। সুখেন্দু সেই সময় একটা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে, যাতে তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না— এমন অনেকেই মতামত দিয়েছিল। তাকে এবং বিনয়ের স্ত্রীকে নিয়ে ব্যাঙ্কে সে সময় মুখরোচক নানারকম গল্প চালু হয়েছিল।
বিনয়ের স্ত্রী এই সময়েই সন্তানবতী হয়।
বিনয় এবং বিনয়ের স্ত্রীর যাবতীয় ডাক্তারি পরীক্ষা কলকাতাতে বিনায়কের ব্যবস্থাপনাতেই হয়েছিল। সেসব রিপোর্টে পোলিওদষ্ট বিনয়ের পিতৃত্বের কোনওরকম সম্ভাবনা একেবারেই বাতিল করা হয়েছিল। কাজেই লক্ষ্মীতারার কেরামতিতেই বিনয় সন্তানলাভ করেছে এ কথা তার বাইরের ঘরে বসে তার মেয়ে সোমানির হাত থেকে চিনি দিয়ে ভাজা ছানার প্লেট এবং ঘোলের শরবত নিয়েও বিনায়ক ভুলতে পারল না। তার ভেতরের শহুরে চালাক বদমাশ লোকটা খানিকক্ষণ পরে আচমকা বেরিয়ে এল এবং লক্ষ্মীতারার সঙ্গে ভবতোষ ও রেণুকাকে নিয়ে অন্তরঙ্গ কথোপকথনের সময় খুব নিরীহ ভঙ্গিতে বিষয়টা উত্থাপন করল।
দেবীজি বিনয়কে সত্যি বাঁচিয়ে দিয়েছেন। কলকাতায় আমরা ওদের ডাক্তারি পরীক্ষার সবরকমের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। ডাক্তারের রিপোর্টে বিনয়ের বাপ হওয়ার—
লক্ষ্মীতারা বিনায়কের মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানলার বাইরে রেখেছিল। অসংখ্য হেরে যাওয়া, পিছলে পড়া, খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে সে আজন্ম দেখে আসছে। হারকে মেনে নিতে শিখিয়েছে। যার পা পিছলে গেছে তাকে ধরে পাশের গাছের ডালটা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে সে। খাদের কিনার থেকে তুলে এনে অন্যপাশের উত্তুঙ্গ পাহাড়ের দেওয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এহেন যোগিনী বা কল্যাণী যক্ষীকে এত লঘুভাবে দেখা বিনায়কের উচিত হয়নি।
জানলা থেকে ঝট করে চোখ ঘুরিয়ে বিনায়কের দিকে তাকিয়ে সে বলল, শুধু আপনারা নন, এখানেও সবাই জানে, ওদের বেটির বাপ ম্যানেজার সুখেন্দুবাবু। মানুষ কি জানে কে তার বাপ আর কে তার দাদা, নানা? আপনি জানেন? হাম্যা ওকারে সন্তান নাই দেললি, দোসরা কোই দিয়া, যা ডাগদারি ইলাজ ওকে দিতে পারেনি।
ধরা পড়ে বিনায়কের পালাবার জায়গা থাকে না। সে বলেছিল, জি, জি, সে কথা আমরা সবাই জানি। সেই কারণেই ভবতোষ আর রেণুকাকে আপনার কাছে নিয়ে এলাম।
লক্ষ্মীতারার তাকে আর কথা বাড়াবার সুযোগ না দিয়ে বলেছিল, আপনি তো আজ চলে যাবেন, না?
ওঃ হো, হ্যাঁ হ্যাঁ। বিনায়ক হাতের ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আচ্ছা, আজ তা হলে—

রেণুকা দ্বিতীয়বার লক্ষ্মীতারার কাছে আসতে চেয়েছিল তার দ্বিতীয় বিবাহের প্রায় পাঁচ বছর পরে।
অফিস ক্যান্টিনে চায়ের কাপ সামনে নিয়ে সে বিনায়কের কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আমি ভাল নেই দাদা। পাঁচ বছর হতে চলল, সুহাসকে আমি বাচ্চা দিতে পারছি না। সুহাস হতাশ হয়ে যাচ্ছে আর আমার ভেতরে জমছে অভিশাপ আর পাপের ভয়।
বিনায়ক ভারি অবাক হয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, কীসের ভয়? কীসের পাপ?
রেণুকা ছ’বছর আগের কথা বিনায়ককে স্মরণ করিয়ে দিল। লক্ষ্মীতারা তাকে সন্তান না নেওয়ার কথা বলেছিল। কলকাতায় ফিরে এসে মাসখানেকের মধ্যে সে টের পায় তার গর্ভে সন্তান এসেছে। সে অত্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিল। গত এক বছরের অধিককাল ধরে ভবতোষের সঙ্গে তার কোনও দৈহিক সম্পর্ক নেই। দীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন ধরনের নার্কোটিক ড্রাগে আসক্ত ভবতোষ দু-আড়াই বছর আগে থেকেই যৌনক্ষমতা নষ্ট করে ফেলছিল। শেষপর্যন্ত তার উত্থানের আর কোনও ক্ষমতাই অবশিষ্ট থাকল না। ডাক্তার, ওষুধ, কোনও কিছুই আর যখন ভবতোষকে ফিরিয়ে আনতে পারল না, রেণুকা অন্য সবার মতোই তখনই তুকতাক কবজ-তাবিজ হয়ে শেষপর্যন্ত লক্ষ্মীতারার কাছে পৌঁছেছিল।
লক্ষ্মীতারা একান্তে তার সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে ইঙ্গিতে সন্তানধারণ করার ব্যপারে নিষেধ করেছিল। রেণুকা সেই সময় ব্যাপারটা অত তলিয়ে ভাবেনি। বরং তার হতাশাই বেড়েছিল কথাটা শুনে। কার মাধ্যমে সন্তান আসবে তার গর্ভে? ভবতোষের তো এই অবস্থা!
কিন্তু ঘটনা ঘটে যাবার পরে সেই সময় খুব সাধারণভাবে হলেও মনে হয়েছিল, লক্ষ্মীতারা কি তাকে এই ইঙ্গিতই দিয়েছিল? মাসখানেক পরে যখন সম্ভাবনাটা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল, সে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।
সেবার মোহনপুরা থেকে মালদা শহরে ফিরে তারা তিন দিন হোটেল-বাস করেছিল। তারা গৌড় দুর্গের স্থাপত্য এবং আদিনা ও একলাখির জমকালো মসজিদ ও সমাধিমন্দির দেখে প্রচুর আনন্দ পেয়েছিল। কিন্তু এই আনন্দের অংশীদার ভবতোষ ছিল না। ভবতোষ গৌড় ভ্রমণের দিন সঙ্গে ছিল কিন্তু গাড়ি থেকে নামেনি। আদিনায় যাওয়ার দিন সে বিছানা থেকেই উঠল না। হোটেলে বসে ড্রাগ নিত। তার নেশার জিনিসপত্র দু-চারবার বাথরুমের কমোডে ফেলে দিয়েও দেখেছে রেণুকা। তাতে তার জীবনযাত্রা আরও দুঃসহনীয় হত।
এই তিন দিন দু’রাত্রি বিনায়কের সঙ্গে একত্রবাসে রেণুকা টের পেয়েছিল তার শরীর-মন কতটা কাঙাল হয়ে আছে। শুধু কোনও পুরুষের ইঙ্গিতের অপেক্ষা। পরে সে অবাক হয়ে ভেবেছিল, এক বছরের অধিক সময় সে সত্যিকার অর্থে পুরুষসংসর্গ থেকে বঞ্চিত হয়েও একবারের জন্যও যে বিকল্পের কথা ভাবেনি। সে অভ্যাসের বা নিষেধের দেওয়াল কি অবলীলায় একমুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেল!
রেণুকা প্রথমে স্বাভাবিক কারণেই বিনায়ককে জানিয়েছিল। বিনায়ক একটু চমকালেও বিশেষ গুরুত্ব দিল না ব্যাপারটায়। বরং বিষয়টা নিয়ে সবিস্তারে অনুসন্ধান শুরু করেছিল।
কী করে জানলে ঘটনাটা আমার সংস্পর্শে এসেই ঘটেছে?
এত বছরেও তো ঘটেনি!
তা হলেও এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না। ভবতোষের তো স্পার্ম কাউন্ট খুবই কম, সে তো আমরা জানি। কিন্তু কাউন্ট কম বলেই তো এ কথা ডাক্তাররা বলে না যে—
তখন রেণুকা তাদের বিগত এক বছরের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় দাম্পত্যের কথা বলেছিল।
বিনায়ক যেন মহাভারতীয় বীজপুরুষ। বলেছিল, তাতেই বা কী হল! থাক না তোমাদের কাছেই আমার একটা চিহ্ন।
কিন্তু এর মাস দুয়েক আগেই লক্ষ্মীতারা তার কাছেই বলেছিল যে ভবতোষ বাঁচবে না। আর ভবতোষ যে বাঁচবে না এ কথা বুঝতে দৈবী মহিমার দরকার আর নেই তখন। সম্ভবত অত্যন্ত স্বার্থপরের মতো মনে মনে বিনায়ক অন্য একটা হিসেব করছিল, কেননা রেণুকা রমণীরত্ন, এ ব্যাপারটা সে টের পেয়েছিল।
তারপরে সে বলেছিল, যাক গে, যাই কর, আমার দরকার হলে জানিয়ো।
রেণুকা অগত্যা তার মায়ের কাছেই সব খুলে বলেছিল। মা বলেছিল, পাগল নাকি! তারপরে তার ব্যবস্থামতো একদিন নার্সিংহোম থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে এল। এ ঘটনা ঘটে ভবতোষ মারা যাওয়ার কুড়ি-পঁচিশ দিন আগে।
ক্যান্টিনের নিরালায় বসে রেণুকা বলেছিল, লক্ষ্মীতারা দেবীর কাছে আমার অপরাধের জন্য আমি ক্ষমা চাইব দাদা। তিনি ইচ্ছে করলে সব পারেন। আমি তার কাছে এবার একটা সন্তান চাইতে যাব।
রেণুকা এসব কথা বলতে বলতে আবেগে কাঁদছিল।
টিফিনের সময় এগিয়ে আসাতে বিনায়ক উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ঠিক আছে, চোখ মোছো। লক্ষ্মীতারার কাছে যেতে আর অসুবিধা কী? আমি রোববার রাত্রের ট্রেন ধরব, রেডি হও।
১০
মোহনপুরার লক্ষ্মীতারা দেবীর সঙ্গে বিনায়কের শেষ দেখা হয়েছিল শতক শেষ হওয়ার বছর দেড়েক আগে। সে বছর গঙ্গা আর মহানন্দা দু’দিক থেকে প্রচুর পরিমাণে জল ঢেলেছিল মালদা জেলায়। গঙ্গা উত্তরপ্রদেশ থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসতে আসতে শেষপর্যন্ত মালদা জেলাকে এবং সংলগ্ন বিহারের কাটিহারকে দীর্ঘ প্রায় দু’মাস জলের নীচেই রেখে দিল।
মহানন্দার দৈর্ঘ্য যেহেতু গঙ্গার তুলনায় সামান্যই, কাজেই তার বয়ে আনা জল গঙ্গার তুলনায় অল্প হলেও মালদা-রাজশাহি পর্যন্ত যখন এল তখন এই দুই জেলার অবস্থা ভয়াবহ দাঁড়াল।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলায় প্রচুর বৃষ্টিপাত আগেই হয়ে যাওয়ার কারণে গঙ্গা এবং পদ্মা ভরাভর্তিই ছিল। কাজেই নিম্নগতির মুখের জেলা মালদার চার ভাগের প্রায় তিন ভাগ কার্যত প্রায় দু’মাস ধরে জলের তলাতেই রইল। সামনের গঙ্গা এবং পদ্মা তো উঁচু হয়ে আছে, কাজেই জল আর কোথায় যাবে? গ্রাম, খেত, মাঠ, বসতবাড়ি, রাস্তা সব জলের তলায়।

অনেকদিন পরে মালদা এসেছে বিনায়ক। তার সঙ্গে আরও জনা তিনেক উচ্চপদস্থ অফিসার আছে। কলকাতা থেকে ট্রেন কিংবা মোটরগাড়ির রাস্তা বহু জায়গাতেই জলমগ্ন এবং ভাঙা। কলকাতা থেকে ছোট প্লেনের সার্ভিস চালু হয়েছে মালদা, বালুরঘাট, রায়গঞ্জ হয়ে বাগডোগরা, বিশেষ করে এই বন্যার কারণেই।
সেইভাবেই উড়োপথে বিনায়ক তার দলবল নিয়ে মালদা এসেছে। অনেকগুলো ব্রাঞ্চ বন্যার প্রথম ধাক্কাতেই জলের তলায় চলে গেছে। কতগুলো আধাআধি। আবার কয়েকটা একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
জেলা অফিসে বসে সবগুলো ব্রাঞ্চের খবর সংগ্রহ করল বিনায়ক এবং তার টিম। কালেক্টরেটে গিয়ে ডিএমের সঙ্গেও সৌজন্যেসূচক দেখা করল তারা। তারপর কোন কোন ব্রাঞ্চ তারা পরিদর্শন করবে তার একটা তালিকা তৈরি হল। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট, ব্লিচিং পাউডার, খাবার জল শোধনের জন্য ক্লোরিনের বড়ি ইত্যাদি দিয়ে কতগুলো প্যাকেট তৈরি হল। ব্যাঙ্কারদের দল যেখানে যেখানে যাবে, দু-এক প্যাকেট করে এইসব বস্তু দিয়ে আসবে।
বিনায়ক এখন স্কেল ফাইভ অফিসার। ইতিমধ্যে মুখ ভারী হয়েছে, চুল পাতলা হয়েছে, জুলফি সাদা হয়ে গেছে। চাকরি এবং সমাজজীবনে ধাপে ধাপে মসৃণ গতিতে উঠে এসে সে জীবনে কৃত-কৃতার্থ। এই ধাপগুলো মসৃণ করতে সমাজে এবং কর্মস্থানে যেসব কলাকৌশল আছে, বিনায়ক সেসব নির্ভুলভাবে প্রয়োগ করেছে এবং সেসবের সুফলও পেয়েছে। দু-একবার যে অসুবিধা হয়নি এমন নয়। তবে বিনায়ক সেসব বাধা সুকৌশলে কাটিয়ে আজ যে অবস্থানে এসে পৌঁছেছে তাতে তাকে আশপাশের সবাইকে ঈর্ষাই করে। আর বিনায়ক এই ঈর্ষাকে দামি হুইস্কির থেকেও বেশি পছন্দ করে।

প্রথমে পনেরো-ষোলো কিলোমিটার মোটরে, তারপর জল ভেঙে পায়ে হেঁটে দেড় কিলোমিটার, অবশেষে নৌকাতে এবং ভ্যানরিকশায় চেপে বিনায়কের দল যখন মথুরাপুরের স্কুলবাড়িতে পৌঁছল তখন বেলা দুটো বেজে গেছে। তারা মালদা শহর থেকে বেরিয়েছিল সকাল আটটার মধ্যে।
বিনায়ক তাদের জেলা অফিস থেকেই খবর পেয়েছিল লক্ষ্মীতারা সপরিবারে মথুরাপুরের স্কুলবাড়িতেই আছে মোহনপুরার আরও অনেক লোকের সঙ্গে। আরও খবর পেয়েছিল যে মোহনপুরা বসতি অঞ্চল, সে বেড়-বাঁধের বাইরেই হোক বা ভেতরেই হোক, প্রায় পুরোটাই জলের তলায়। বিডিও অফিস, থানা, ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ সবই পরিত্যক্ত। অসংখ্য মানুষ তাদের গোরু, মোষ, ছাগল, কুকুর নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বেড়-বাঁধের ওপরে। তাদের বাড়িঘর সবই জলে ভেসে গেছে।
বিনায়কের মনে পড়ল না সে সারাজীবনে একদিনও এরকম কষ্টকর একটা অভিযান করেছে কিনা। তাও অফিসের কাজে।
ক্যাম্পে এসে প্রথমেই দেখা হল বিনয়ের সঙ্গে। বিনয়ও সস্ত্রীক এই ক্যাম্পেই আছে। ভোলেয়া মাকে ছেড়ে সে কোথায়ই বা যাবে। মোহনপুরা ব্রাঞ্চের ভেতরে দু’ফুট জল ঢুকতেই সে সিন্দুক খুলে প্রথমে যে চেন আটকানো ব্যাগে ক্যাশ টাকা, ক্যাশ রেজিস্ট্রার, চেক বইগুলো, টুকিটাকি আরও কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঢুকিয়ে নিল। তারপর হাতে ঝোলানো রেশন-ব্যাগে ক্যাশ বই, সাবক্যাশ বই এবং জেনারেল লেজার ইত্যাদি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বই ও লেজার যতগুলো সম্ভব আলমারির মাথায় এবং আলমারির সব থেকে উঁচু তাকে সাজিয়ে ফেলল। আলমারিকে যথাসম্ভব দড়ি দিয়ে জড়িয়ে দু’পাশের দেওয়ালে গজাল পুঁতে দড়ি বেঁধে দিল।
এইভাবে যতটা সম্ভব ব্রাঞ্চের সম্পত্তি সুরক্ষিত করে সে তার মোটা লাঠিতে ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তার একমাত্র সঙ্গী ছিল ব্রাঞ্চের সাবস্টাফ জামাল। কারণ ব্রাঞ্চের অন্য কর্মচারী, যারা প্রতিদিন মালদা বা মানিকচক থেকে আসত তারা সময় থাকতেই যে যার বাড়িতে চলে গিয়েছিল।
বিনায়ককে দেখে সে যেন হাতে স্বর্গ পেল। গত দশ দিন ধরে ব্যাঙ্কের প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা এবং জরুরি লেজার, রেজিস্ট্রার এবং ফাইল যখের ধনের মতো আগলেছে। এখনও পর্যন্ত মালদা শহরের অফিস থেকেও কেউ আসেনি যাতে তাদের কাছে হস্তান্তর করে সে খানিকটা দায়মুক্ত হতে পারে। এই দশ দিন তার একমাত্র ভরসা ছিল তার মা ভোলেয়া। সে লক্ষ্মীতারার কাছে তার ব্যাগ, থলে সব গচ্ছিত রেখেছিল। এই ঘোর দুর্দিন এবং অরাজকতার দিনে ওই একটা জায়গাই, তার ধারণায়, সুরক্ষিত ছিল।
বিনায়ককে এখন আর তার দাদা বলার অধিকার নেই। সে বলল, স্যার, টাকা, রেজিস্ট্রার ইত্যাদির একটা ডুপ্লিকেট রসিদ আমি করে রেখেছি। রসিদে সই করে আমাকে কপি দিয়ে দয়া করে ওগুলো আপনি এবার জেলা অফিসে জমা দিয়ে দিন। কেননা জল নেমে গিয়ে আবার ব্রাঞ্চ খুলতে হয়তো আরও দেড়-দু’মাস সময় লাগবে।
বিনায়ক একজন অধস্তন অফিসারকে বলল, বিনয়ের কাছ থেকে ব্যাগ এবং থলেগুলো নিয়ে ওর লেখা রসিদটা আমাকে দাও।
রসিদে সই করে একটা কপি বিনয়ের হাতে দিয়ে বলল, রসিদটা সাবধানে রেখো।
বিনয় বলল, দেখে নিলেন না স্যার?
বিনায়ক বলল, তার দরকার নেই বিনয়। এখন তোমার খবর বলো। কতদিন আর চাকরি আছে?
বিনয় বলল, আমি ভালই আছি স্যার। মায়ের আশ্রয় যে এতদিন ধরে আছি, এটাই আমার সেরা পাওনা। আপনাদের কাছেও কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনি না থাকলে এত দীর্ঘদিন ধরে কি আমি এই একটা ব্রাঞ্চে থাকতে পারতাম!
তার চাকরি আছে আর ছ’বছর। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে স্বজাতির একটি ছেলের সঙ্গে। জামাই সেনাবাহিনীর একজন জোয়ান। বর্তমানে আসামে পোস্টিং। বিনয়ের একটি নাতিও হয়েছে, বছর দুয়েক তার বয়স। মেয়ে-জামাই ছেলেকে নিয়ে আসামে থাকে।
চৌধারির সেই পোতা ভরতকে দেখে বিনায়ক হেসে শুভেচ্ছা বিনিময় করল। দ্বিতীয় দফায় রেণুকাকে নিয়ে সে যখন মোহনপুরাতে এসেছিল, সেবার সে লক্ষ্মীতারা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে যায়নি। তখনই শুনেছিল শেষপর্যন্ত লক্ষ্মীতারা ভরতকে কৃপা করে তার মনের ওপর পর্দা টাঙিয়ে তাকে উদ্ধার করেছে। ভরত আর তার বাপ-চাচার কাছে ফিরে যায়নি। তার বাপ-চাচারা পুকুর, জলা, জমি গঙ্গার চর, স্ত্রীলোক এবং জাতপাত নিয়ে একইভাবে জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। সোমানিকে বিয়ে করে সে এখন লক্ষ্মীতারার জামাই। ভরত আর তার নিজের বাড়িতে কোনওদিন ফিরে যাবে না।
বিনায়ক লক্ষ্মীতারা দেবীকে একটু একান্তে চাইছিল। চারদিকে লোকজন, চরম অব্যবস্থা, হই-হট্টগোল। তবুও সে বিনয়কেই অনুরোধ করল। বলল, আমি একটু দেবীজির সঙ্গে দেখা করতে চাই বিনয়, তুমি একটু ব্যবস্থা করো।
বিনয় একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, মায়ের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না স্যার, এই সবে জ্বর থেকে উঠলেন। কারও সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছেন না।
বিনায়ক নিজের অজান্তেই বিনয়ের হাত দু’খানা ধরে ফেলল। বলল, একটু চেষ্টা করো ভাই, এতদূর এলাম এত কষ্ট করে, একবার দর্শন হবে না?

দ্বিতীয়বারে রেণুকার সঙ্গে লক্ষ্মীতারার কী কথাবার্তা হয়েছে, বিনায়ক জানার চেষ্টা করেনি। রেণুকাও নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে কিছু বলেনি।
দ্বিতীয়বারের রেণুকার সঙ্গে তার ছোটভাই এসেছিল। সুহাস আসেনি। সুহাসের এসব কুসংস্কারে ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল না। আবার রেণুকাকেও নিষেধ করেনি সে। কাজের বিনায়কের যদিও পূর্বেকার রোমান্সের স্মৃতি তখনও সতেজ ছিল কিন্তু সেরকম কোনও সুযোগ তৈরি হওয়ার অবকাশ রাখেনি রেণুকা।
সেবার রেণুকাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল লক্ষ্মীতারা। রেণুকাকে তার সামনে পিঠ পেতে উবু হয়ে বসতে দেয়নি সে। যেন দুই সখীর অনেকদিন পরে দেখা হয়েছে এমন সহজে কথা বলেছিল লক্ষ্মীতারা। রেণুকাকে সে বলেছিল, কাউকে সন্তান দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। বলেছিল, যদি তুমি এই পৃথিবীতে ফলে-ফুলে বিকশিত হতে চাও, কিছু নিষেধ তোমাকে মানতে হবে। উঁচু-নিচু সব সমাজে, সব যুগেই কিছু নিষেধ থাকে, সেসব তোমাকে মানতে হবে।
রেণুকা তার সব কথা বুঝতে পারেনি। কিন্তু তার চোখ থেকে লক্ষ্মীতারার কথা শুনে সমানে জল পড়ছিল। লক্ষ্মীতারা তাকে বলেছিল ডাক্তারের কাছে যেতে। বলেছিল, ডাক্তারের চিকিৎসাতেই তার সন্তান হবে।
প্রথমবারে অসুস্থ ভবতোষকে নিয়ে রেণুকা বিনায়কের সঙ্গে এক হোটেলেই ছিল। এ নিয়ে সে সময় বিনায়কের আড়ালে হাসি-ঠাট্টা এবং ইঙ্গিতপূর্ণ রসিকতা কিছুদিন চলেছিল। বিনায়কের যে কানে একেবারেই আসেনি এমন নয়। কিন্তু এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে ফল হয় উল্টো। সুতরাং বিনায়ক কিছু শুনলেও না শোনার ভান করে সময়টা পার করে দিয়েছে।
এবারও কথা উঠল। অফিসের সেই ভূয়োদর্শীরাই পিছন থেকে ইন্ধন দিয়ে ব্যাপারটায় একটা নতুন মাত্রা যোগ করল। এদের মধ্যে দু-তিনজনকে টপকে বিনায়কের প্রমোশন হয়েছিল। জোরালো ইন্ধন পেয়ে একে একে উঠতে লাগল এমন কিছু ঋণদানের বিষয় যাতে বিনায়কের প্রত্যক্ষ হাত ছিল। সেইসব ঋণের মধ্যে কয়েকটা কালক্রমে আবার ব্যাকডেট হয়ে গিয়েছিল। বেহালায় ছ’কাঠা জমির ওপরে তার চারতলা বড়সড় বাড়িটিকে নিন্দুকেরা এই খেলাপি ঋণের পক্ষে জড়াতে চেষ্টা করল। কলকাতার একটা স্কেল ফোর ব্রাঞ্চে থাকাকালীন একটা বড় জালিয়াতিতে পুলিশ শেষপর্যন্ত কোনও কিনারা করতে পারেনি। কিন্তু ব্যাঙ্কের নিজস্ব ভিজিলেন্স দু’জন ক্লার্ককে অন্য কোনওভাবে জড়াতে না পেরে কাজে অপরাধমূলক গাফিলতি এবং অসাবধানতা হয়েছে বলে সাসপেন্ড করে। খবরের কাগজ পালা করে এই জালিয়াতির কেচ্ছা ছাপতে থাকলে ওই দু’জনের একজন, কল্যাণ নামে একটি ছেলে আত্মহত্যা করে।
সেই সময় বিনায়ক সাধারণ কর্মচারীদের ইউনিয়নের একাংশের ভয়ঙ্কর কোপের মুখে পড়েছিল। কেননা এই পুরো ব্যাপারটায় ব্যাঙ্কের অফিসার এবং কর্মীদের একাংশ বিনায়ককেই দোষী সন্দেহ করেছিল। সে সময় ব্যাঙ্কে প্রথম থেকেই বিনায়কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গৌতম, সে বর্তমানে ব্যাঙ্ক অফিসারদের সর্বভারতীয় নেতা, বিনায়ককে বাঁচিয়ে ছিল। সে সময়ে অবস্থা এমন ঘোরালো হয়ে ওঠে যে বিনায়ককে কলকাতা থেকে মাসখানেকের জন্য গা-ঢাকা দিয়ে অন্যত্র থাকতে হয়। তখন ব্যাঙ্গালোরে গৌতমের ফ্ল্যাটে গোপনে সে পনেরো-বিশ দিন ছিল। সেখান থেকে পুরীর একটা ফ্ল্যাটে দশ-বারো দিন কাটিয়ে সে কলকাতায় ফিরে আসে।
পুরীর এই ফ্ল্যাটটিও গৌতমের। দেশের চার-পাঁচটি শহরে গৌতমের ফ্ল্যাট ছিল বলে জনশ্রুতি। তার শত্রুরা বলে বেড়াত, চার বছর অন্তর অন্তর ভারতীয় ব্যাঙ্ক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে অফিসার এবং সাধারণ কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় তার সঙ্গে গৌতম বা তার অনুরূপ নেতাদের একটি করে ফ্ল্যাটের মালিকানা বা অন্য কোনও বিষয়গত লাভ হয়। এসব কথার সবই যে সত্য এমন নয়। তবে সেবারে বিনায়ককে গৌতমই বাঁচিয়েছিল, এ কথাও ঠিক।
১১
এই শেষবারে মথুরাপুরের শরণার্থী শিবিরে লক্ষ্মীতারাকে দেখে বিনায়কের বুকের ভেতরটা সেই প্রথম দিনের মতো গুড়গুড় করে উঠল না। বরং উল্টো। ব্রঙ্কাইটিসের আক্রমণের আগে বুক যেমন ভারী হয়ে ওঠে, তেমনই হতে লাগল। আজ আর লক্ষ্মীতারার চোখে আকর্ণ মোটা কাজলের রেখা আঁকে নেই। সেই শঙ্খের মতো লম্বাটে খোঁপা। মাজা পিতলের উজ্জ্বলতা নেই তার প্রসাধনেও। প্রদীপের পাশে বসা তার প্রোফাইলে কয়েক শতাব্দীর পিছন থেকে ফিরে তাকানো প্রাচীনতা এবং রহস্যময়তাও নেই তার দৃষ্টিতে। কিন্তু বিনায়কের বুক ভারী হয়ে উঠল। মনে হল, সে ভেতরের সব দেখে ফেলছে। এখন একবার তার সামনে পিঠ উদলা করে উবু হয়ে বসার সময় হয়েছে তার।
স্কুলবাড়িটার বাইরের আকাশে প্রবল মেঘ ঘনিয়েছে। গঙ্গার প্লাবনে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবাংলা, বাংলাদেশ পর্যায় করে ভাসছে। মালদার চার ভাগের তিন ভাগ গত দু’মাস ধরে জলের তলায়। মোহনপুরার বিশ-বাইশ মাইলের বেড়-বাঁধের ওপর প্রায় লাখখানেক মানুষ এবং ততোধিক গবাদি পশু মাচা বেঁধে দেড় মাসের ওপরে রোদে-জলে-বৃষ্টিতে ভিজে-পুড়ে অপেক্ষা করছে, কবে জল নামবে। কাছেই সামসেরটোলায় বিনায়কদের একটা নতুন ব্রাঞ্চ অন্তত বিশ-পঁচিশ হাত জলের নীচে। এসব ব্যাপারস্যাপার নিয়ে বিনায়কের অধস্তন অফিসাররা খোঁজখবর নিচ্ছে এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসা বিস্কুটের প্যাকেট, ব্লিচিং পাউডার, ক্লোরিনের বড়ি বিলি করছে।
বিনায়ক একটা ছোট ক্লাসঘরের ভেতরে বসে লক্ষ্মীতারা দেবীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি দুটো বেঞ্চিতে পেয়ে তারা কোনাকুনিভাবে বসা। মেঘ আরও নীচে নেমে এসেছে। ঘরের ভেতরে দিনের বেলাতেই সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। পরস্পরকে ভাল করে দেখতেও পারছে না তারা। তবে অবস্থা স্বাভাবিক হলে তার বাড়ির আসনের সামনে পিঠ উদলা করে বসার বাসনার কথা একবার কোনওরকমে বলে ফেলল বিনায়ক। বলতে গিয়ে তার কণ্ঠস্বর অশ্রুরুদ্ধ হয়ে এল। সে শেষপর্যন্ত বলতে পারল, আমি বড় পাপ করেছি মা। আমাকে একবার আপনার পায়ের ওপর পড়তে দিন। আপনার অশেষ দয়ায়—
লক্ষ্মীতারা এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি।
বিনায়কের কথা শেষ হবার আগেই খুব কাছেই কড়কড় করে বজ্রপাতের শব্দ স্কুলবাড়িটার টিনের চালায় প্রতিধ্বনি তুলে এক দিক থেকে আর এক দিকে ধেয়ে চলে গেল। বজ্রের গুমগুম শব্দ অনেকক্ষণ ধরে উত্তর বিহারের প্রান্তর আর বিস্তীর্ণ নদীর গতিপথ ধরে অনেক দূরে এগিয়ে চলে গেল। মুষলধারে বৃষ্টি নামল। ঘরের ভেতরটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল।
তার ডানধারে তীর্যক কোণে বসে থাকা লক্ষ্মীতারার দিকে চোখ তুলে তাকাতে বিনায়ক চমকে উঠল। ওই তো সেই ভোলেয়ামাই, একটা অনুচ্চ জলচৌকিতে প্রত্যালীঢ় ভঙ্গিতে বসে। তার ডানপাশে খানিকটা উঁচুতে কাঠের পিলসুজের ওপরে বড় আকারের পাথরের প্রদীপ। মোটা শিখায় জ্বলছে সেই দীপ। তার নীচে প্রচ্ছন্ন আলোয় অধিষ্ঠিত দেবী লক্ষ্মীতারা যেন কোনও প্রাচীন যক্ষী! আকর্ণ চোখ কাজললিপ্ত, উজ্জ্বল ব্রোঞ্জের মুখ, মাথায় লম্বাটে শঙ্খের মতো মসৃণ খোঁপা। যোগিনী মূর্তির প্রোফাইল বিনায়কের মুখের দিকে তীব্রদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওই অন্ধকারের মধ্যেও তার চোখের কালো তারা বিদ্যুতের ঝলকের সঙ্গে সঙ্গে বিনায়ক আগুনের শিখার মতো জ্বলে উঠতে দেখল।
বাইরে বিশৃঙ্খল বাজ পড়ার শব্দ। ঘরের মধ্যে বিদ্যুৎ ঝলসাতে লাগল মুহুর্মুহু। তার মধ্যে দেবী লক্ষ্মীতারা তারা আজন্ম সহচরী সীতিয়াকে ডাক দিয়ে চিৎকার করে উঠল— হে সীতিয়া, ই সাহেবকে বাহার নিকাল হিঁয়াসে! ই স্যাব আদমিকে ইলাজ ক্যারনা হাম্যার কাম নাইয়ে! হে সীতিয়া, বাহার ক্যারি দে ই লম্পট, লুটেরা, খুনিকে— হে সীতিয়া—
ঘরের একমাত্র খোলা দরজা দিয়ে গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলক তির্যক এসে বিনায়কের সর্বাঙ্গ ঝলসে দিয়ে গেল।

।। সমাপ্ত ।।

অভিজিৎ সেন ৮ পশ্চিমবাংলার যেসব চাকরিজীবী বদলির চাকরি করে তাদের কাছে উত্তরের জেলাগুলোয় বদলি বড় অপছন্দ। কারও কারও কাছে শাস্তি, বিভীষিকা, এমনকি সভ্যতা থেকে নির্বাসন। বিনায়কের ভবিতব্য তাকে উত্তরের জেলাগুলোর সঙ্গে বেশ ভাল করে বেঁধে ফেলেছিল। পাঁচ-ছ’ বছর পরে তাকে ফের উত্তরবঙ্গে আসতে হল। এবার বিনায়ক উত্তরের আঞ্চলিক অফিসের কর্তাদের একজন। মাসখানেকের মধ্যে মোটামুটি থিতু [...]
আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST
Pujo Special Issue
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$4/-*
One-time payment for one year
*Inclusive of GST