বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

পাপীতাপী ও যোগিনী – ৩

অভিজিৎ সেন
চা ও সামান্য জলখাবার খাওয়ার পর ভবতোষ রেণুকাকে নিয়ে লক্ষ্মীতারার বাড়িতে এল বিনায়ক। আগের বারের মতোই বাইরের উঠোনের ইতস্তত পড়ে থাকা কাঠের গুঁড়িগুলোর ওপরেই বসল তারা। আগের দিনের মতোই আরও বেশ কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে ছিল।
আগের বারে বিনায়ক ভাল করে লক্ষ করেনি, এবার করল— কাঠের গুঁড়িগুলোর মধ্যে কয়েকটা যেন ফসিল হয়ে গেছে এমন মনে হতে কোনও বাধা নেই।
বিনয় আগের দিনই খবর দিয়ে গিয়েছিল। দ্বাররক্ষী সেই পূর্বেকার সীতিয়া নামের মহিলাই আছে। তার চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে। বিনায়ককে দেখে সে চিনতে পারার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ভবতোষ ও রেণুকাকেও দেখল। সম্ভবত বিনয় তাকেও বলে গিয়েছে। আগের বারে লক্ষ্মীতারাকে ভবতোষের কথা বলে গেলেও ভবতোষকে আনতে পারেনি এখানে। ভবতোষ কিংবা রেণুকা তার কথায় আস্থা রাখতে পারেনি। আস্থা তো বিনায়কেরও ছিল না। এখনও কি আছে? শুধু নিরুপায় একটা ব্যবস্থা হিসেবে এখানে আসা।

যথাসময়ে সীতিয়া তাদের ডেকে ভেতরে নিয়ে গেল। সেই আলো-আঁধারি ঘরখানি তার সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে একইরকম আছে। সেই বড় আকারের পাথরের মাটির প্রদীপে মোটা সলতে জ্বালিয়ে ঘরটাকে আলো-অন্ধকারে অলৌকিক করার ব্যবস্থা। তার মধ্যে নিজের আসনে সেই দেবাংশিনী, যোগিনী অথবা প্রাচীন যক্ষীর মতো এক নারী লক্ষ্মীতারা বসে আছে। তার চোখের চারপাশে ঘন কালো করে কাজলের মসীরেখা টানা যা তার চক্ষুদ্বয়কে অতিরিক্ত গভীরতা, অধিকতর তীব্রতা দিয়েছে তার চাহনিতে।
ঘরের ভেতরে ঢুকে সদাই অন্যমনস্ক ভবতোষ যেন অকস্মাৎই লক্ষ্মীতারাকে দেখল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এক প্রাচীন দেবী তার দিকে অপলক তাকিয়ে। বড় শিখার প্রদীপের কিছুটা নীচে যেন প্রাচীন দেবীমূর্তি।
সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মগজের মধ্যে কেউ যেন একটা কবিতা বলে উঠল— কোথায় যাচ্ছ তুমি ভবতোষ?/ফুলহার পেরিয়ে এসে গঙ্গার কিনারে,/কোনও এক যক্ষী কিংবা যোগিনীর কাছে/অথবা এই বিশালাক্ষী দেয়াসিন,/দেবী— ক্রমশ হবে একদিন/আমাকে কী দেবে তুমি দেয়াসিনি?
লক্ষ্মীতারা সামনের দিকটা দেখিয়ে বলল, ব্যয়ঠো।
ভবতোষ বাধ্য বালকের মতো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
লক্ষ্মীতারা রেণুকার সঙ্গে কথা বলা দূরস্থান, তার দিকে তাকালই না। বিনায়কের দিকে তাকিয়ে সে বলল, তুমলোক ঘরকে বাহার যাও।
বিনায়ক এবং রেণুকা তার আদেশ পালন করল।
রেণুকার সঙ্গে সে একটা কথাও বলল না। বস্তুত, ভবতোষের এই পরিণতিতে রেণুকার সপ্রতিভতা— যে কারণে তাকে, ভবতোষকে তার সহকর্মী এবং বন্ধুরা প্রায় সবাই-ই ঈর্ষা করত— হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার এমন অবস্থান হয়নি যে গ্রাম্য অশিক্ষিত একজন দেয়াসিন তাকে এমন অবহেলা করতে পারবে। বাইরে একটা কাঠের গুঁড়িতে বসতে বসতে বিনায়ক রেণুকার চোখ-মুখ লক্ষ করছিল। সে সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিতা এবং ইংরেজি স্কুলে পড়া আকর্ষণীয় সপ্রতিভতা তার একসময়ের অহংকার ছিল। সে বেশ খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কাঠের গুঁড়ির ওপরে বসে রইল।
তারপর একসময় হতবুদ্ধির মতো উচ্চারণ করল, কী সুন্দর আর রহস্যময় দেখতে! তারপর স্বপ্নমাখা কণ্ঠে আবার বলল, দেবীর মতো— নিশ্চয়ই অনেক কিছু জানেন।

প্রায় আধ ঘণ্টা বাদে সীতিয়ার সঙ্গে ভবতোষ বেরিয়ে এলে বিনায়ক এবং রেণুকা দু’জনেই খুব আগ্রহ নিয়ে তার চোখ-মুখ লক্ষ করতে লাগল। বিনায়কের মনে হল ভবতোষের চোখ-মুখের সেই অসহায় ছলছল ভাবটা যেন অনেকটাই অন্তর্হিত হয়েছে। কিন্তু সেখানে গভীর বিষণ্ণতা এসে আশ্রয় নিয়েছে সেটাও ঠিক। এই দ্বিতীয় উপলব্ধি আরও গভীর হতাশা, না জীবন সম্পর্কে ফিরে আসা আগ্রহের দ্যোতক, বিনায়ক সঠিক তা অনুমান করতে পারল না।
ভবতোষের জন্য বিনায়ক জায়গা ছেড়ে দিল। ভবতোষ রেণুকা আর বিনায়কের মাঝখানে বসল। রেণুকা ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে একটা হাত ভবতোষের পিঠের ওপর দিয়ে বেড় দিয়ে আকুল হয়ে তার মুখ-চোখ লক্ষ করতে লাগল।

পরদিন রেণুকা এবং ভবতোষকে মোহনপুরা থেকে বিশাল একখানা দেশি নৌকায় উঠিয়ে দিল বিনায়ক। আসার সময় তারা এসেছিল মানিকচক থেকে বাসে মথুরাপুর, তারপরে ফুলহার নদীর খেয়ানৌকায় মোহনপুরা। ফেরার সময় দ্বীপের দক্ষিণ দিকের গঙ্গার ঘাট দিয়ে সোজা মানিকচকের ঘাটে। সঙ্গে বিনয়ের ভাইপো অনিল। অনিল তাদের মানিকচকের ঘাটে নামিয়ে মালদা শহরের বাসে বসিয়ে দিয়ে আসবে। বাস ছেড়ে গেলে সে আবার ফিরতি পথ ধরবে।
নৌকাখানা বিশাল। চলে ডিজেল মোটরে অর্থাৎ ভুটভুটি। অন্তত দুশো-আড়াইশো মণ মাল বহন করতে সক্ষম। মালের বদলে মানুষ হলেও প্রায় সমান সংখ্যক। এত মানুষ অবশ্য মোহনপুরা থেকে যাতায়াত করে না। তবে সকালে একখানা নৌকা মানুষ এবং মাল নিয়ে মোহনপুরা যায়, আবার বিকেলে ফিরে আসে। মাল বলতে দুধ, ছানা, দুগ্ধজাত অন্য দ্রব্য, শাকসবজি, অন্যান্য তরকারি, এইসবই প্রধান।
বিশাল আকারের নৌকার গলুইখানা জল থেকে অনেকটাই উঁচুতে। সেই গলুইয়ের বাইরের দিকে বড় একটা চোখ আঁকা। নৌকায় ওঠার আগে ভবতোষ সেই চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে যেন শিউরে উঠল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখে চাপা দিল সে।
বিনায়ক তাকে হাত ধরে পাতা তক্তার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নৌকায় ওঠাল।
নৌকার সামনের দিকটায় একখানা তালপাতার চাটাই পাতা। অনিল রেণুকাকে নিয়ে সেখানে বসাল। বিনায়কও ভবতোষকে নিয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল।
নৌকা ছাড়তে খানিকক্ষণ দেরি আছে। বিনায়কও বসল ওদের সঙ্গে।
কতক্ষণ লাগবে অনিল?
এক ঘণ্টার ওপরে সময় লাগবে স্যার।
অনিল গতকালই একবার বিনায়কের কাছে নিজের জন্য ব্যাঙ্কের একটা চতুর্থ শ্রেণির চাকরির আবেদন করে রেখেছে। সম্ভবত সেই কারণেই বিনায়ককে সে স্যার বলতে শুরু করেছে।
বিনায়ক বলেছিল, তুমি ক্লাস ফোর স্টাফের চাকরি চাচ্ছ কেন? মাধ্যমিকটা পাশ করো, তারপর না হয় চাকরির চেষ্টা করবে।
অনিল ইতিমধ্যে বার দুয়েক মাধ্যমিকে ফেল করেছে। সে ভাল করেই জানে যে মাধ্যমিক পাশ করলে সে তৃতীয় শ্রেণির চাকরির যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু বার দুয়েক ঘায়েল হয়ে সে আশা সে আর করছে না। না হলে পিছিয়েপড়া জাতি হিসেবে সে তো অনেকটাই সুবিধা পেত।
বিনয় কাছেই ছিল। সেও বলল, সে আশা আর করবেন না দাদা। যদি সুযোগ হয় একটু দেখবেন।
বিনায়ক বলেছিল, তুমি তো ভাল করেই জান, আমার মতো অফিসারের কতটুকু ক্ষমতা। আর ব্যাঙ্ক তো ইদানীং নতুন লোক নেওয়া প্রায় বন্ধই করেছে।
বিনয় বলেছিল, সে তো জানিই দাদা, তবুও বলা রইল, যদি সুযোগ পান, তা হলে—
তখনকার মতো ‘আচ্ছা’ বলে বিনায়ক পার পেলেও অনিল কিন্তু ব্যাপারটাতে লেগেই আছে। আর এখন ভবতোষ ও রেণুকাকে মানিকচক পৌঁছবার দায়িত্ব পেয়ে সে যেন বর্তে গেছে। সে ধরেই নিয়েছে বিনায়ককে এখন থেকে ‘স্যার’ বলার অধিকার তার অর্জন হয়েছে।
বিনায়ক বলল, এক ঘণ্টা লাগবে? তা হলে তো অনেকটাই দূরত্ব!
অনিল বলল, হ্যাঁ স্যার।
নদী এখানে বিশাল। যে নদী দিয়ে তারা মোহনপুরায় এসেছিল, সেই ফুলহার এই সময়ে ভরাভর্তি হলেও গঙ্গার তুলনায় সামান্যই।
ভবতোষ নদীর ভেতর দিকে দূরে নিশ্চুপে তাকিয়ে আছে। নদী সেখানে অত্যন্ত গভীর, জলের রং দেখে সেকথা সহজেই অনুমান করা যায়। রাজমহল পাহাড়ের বাধায় গঙ্গা এখানে সীমাবদ্ধ।
বিনায়ক ভবতোষের একটা হাত তখনও ধরে ছিল। সেইভাবে বসে থাকতে থাকতেই সে বলল, মালদা শহরে পৌঁছে বাসস্ট্যান্ড থেকেই ব্রাঞ্চে সমীরণকে একটা ফোন করবে। ও এসে তোমাদের লজে নিয়ে যাবে। আমার মনে হয় এগারোটার মধ্যে তোমরা শহরে পৌঁছে যাবে। আগেকার প্রোগ্রাম মতো তোমরা যদি আদিনা দেখতে যাও তা হলে খুবই ভাল লাগবে। গৌড়ের স্বাধীন সুলতানি আমলের বিশাল কীর্তি। আশা করি ভবতোষেরও ভাল লাগবে। আগামীকাল তা হলে সকালের দিকেই তোমরা গৌড় দেখতে বেরিয়ে পড়তে পারবে। আমার পৌঁছতে পৌঁছতে হয়তো সন্ধে হয়ে যাবে। ঠিক আছে? তা হলে আমি এখন নামছি, কেমন?
নদীর দক্ষিণ পাড়ে কিছু দূরে রাজমহল পাহাড়ের বিস্তীর্ণ ঢেউ দেখা যাচ্ছে। তার ওপরে নীল আকাশের গায়ে শরতের পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘ। সেই দিকে তাকিয়ে এবং বিনায়কের ধরা হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আশপাশে অন্য মানুষজন। গতকালের পর থেকে ভবতোষের একটা পরিবর্তন হয়েছে এতে কোনও ভুল নেই। কিন্তু বিনায়ক এ ব্যাপারটা নিয়ে নানা সংশয়ে। ভবতোষ নিজে যেহেতু কাউকে কিছু বলছিল না, কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু রেণুকা ধরেই নিয়েছিল যে ভবতোষের মনের মেঘ কেটে যাচ্ছে।
হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ভটভটিতে স্টার্ট দিল মাঝির সহকারী। একরাশ কালো ধোঁয়া বেরিয়ে মেশিন চালু হয়ে গেল। ভবতোষের হাতে একটা চাপ দিয়ে সে নীচে নেমে এল। এবং এই কাজটা করতে গিয়ে বিনায়কের নিজের গলার কাছেও যেন একটা শক্ত ডেলা এসে আটকে থাকল।

নদীর ঘাটে বিনয় দাঁড়িয়ে ছিল। তারা পাঁচজনে ঘাটে এসেছে একটা টাঙ্গায় চেপে। সামনের দিকে পা ঝুলিয়ে বিনায়ক এবং রেণুকা। ভবতোষ মাঝখানে। পিছনে পা ঝুলিয়ে বিনয় এবং তার ভাইপো অনিল। দ্বীপের এই পুব-দক্ষিণ দিকটায় ব্লক অফিস, থানা এবং অন্য একটা ব্যাঙ্কের একটা শাখা আছে।
দ্বীপের এই দিকটাই প্রাচীন। ফলে রাস্তাঘাটের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভাল। সেই কারণেই গোটা দুয়েক টাঙ্গা চলে। বিনয় টাঙ্গার ওপরে বসে অপেক্ষা করছিল।
মালদা জেলায় বা তার আশপাশের পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের জেলাগুলোর গ্রামাঞ্চলে টাঙ্গার প্রচলন ঐতিহাসিক কাল ধরে। বিনায়কদের ব্যাঙ্ক টাঙ্গা ও ঘোড়ার জন্য ঋণ দেয়। এখানকার টাঙ্গা একইসঙ্গে স্টেজ এবং কন্ট্র্যাক্ট ক্যারেজ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট রুটে যখন চলে তখন সে গাড়ি স্টেজ ক্যারেজ। আবার চুক্তি অনুযায়ী গন্তব্যে যাওয়া-আসার জন্য কন্ট্র্যাক্ট ক্যারেজ।
আজকের জন্য বিনায়কই টাঙ্গা ভাড়া নিয়েছিল।
বিনায়ক এগিয়ে আসতে বিনয় টাঙ্গার ভেতর দিকে সরে বসল। এ জেলায় টাঙ্গা ব্যাপারটা একটা উল্টোনো তক্তাপোশ যেন, শুধু দু’পাশে খানিকটা উচ্চতায় ধারি তোলা। সামনের দিকে ডানপাশে টাঙ্গাওয়ালা চাবুক হাতে বসে। বাঁপাশে কোনও বিশিষ্ট সওয়ারি বা যে ব্যক্তি আগে উঠেছে। পিছনের দিকেও পা ঝুলিয়ে জনা তিনেক বসতে পারে। মেয়েরা এবং বাচ্চারা মাঝখানে বসবে। দশ-বারোজন যাত্রীকে একটা টাট্টু দিব্যি টেনে নিয়ে যাবে।
বিনায়কের ভাড়া করা টাঙ্গায় আপাতত দু’জন সওয়ারি। বিনায়ক স্বয়ং এবং বিনয়। টাঙ্গা দ্রুতই চলছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিনায়কের পূর্বে দেখা সেই লেগুনের কাছাকাছি এসেছে তারা।
একখানা নৌকা ঢুকেছে সেই লেগুনে। নৌকার চালক, আরোহী সবাই স্ত্রীলোক। টাঙ্গা আরও খানিকটা কাছাকাছি এলে বিনয় টাঙ্গাওয়ালার পিঠে হাত দিয়ে বলল, আনোয়ার, থামা।
টাঙ্গাওয়ালা অর্থাৎ আনোয়ার টাঙ্গার গতি রুদ্ধ করলে বিনয় তার সদাসঙ্গী মোটা দণ্ডখানায় ভর দিয়ে লাফিয়ে নীচে নামল। সে টাঙ্গার পিছন ঘুরে সামনের দিকে এল।
সামনে বিশ-পঁচিশ হাত তফাতে নৌকারোহী সেই স্ত্রীলোকরা নৌকা থেকে নেমে বাঁধের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের প্রত্যেকের মাথায় একটা করে বেশ বড় আকারের বোঝা। একটু সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বিনয় তার দণ্ডের সঙ্গে তার অশক্ত পা-খানা আঁকশির মতো পেঁচিয়ে দু’হাত কপালে ঠেকাল। এবং সেইভাবেই প্রণামের ভঙ্গিতে পাঁচ মিনিট অন্তত দাঁড়িয়ে রইল।
নৌকা থেকে স্ত্রীলোকরা যে যার ঘাসের বোঝা মাথায় নিয়ে নেমে বাঁধের দিকে এগোতে লাগল। তারা প্রায় সবাই যুবতী এবং স্থানীয় কৃষ্টি ও লোকাচার অনুযায়ী রঙিন শাড়ি পরা। দু’হাতে শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বেলোয়ারি চুড়ি। তাদের পিছনে নদী, ডানপাশে নদী এবং সামনে দূরে রাজমহলের পাহাড়শ্রেণি এই মুহূর্তে অতি সুন্দর দৃশ্যমান।
তারা সবাই কলরব করতে করতে এগোচ্ছিল। তাদের ওই অবস্থায় এবং ওই পরিবেশে দেখে বিনায়কের হঠাৎ মনে হল, এরা সেইসব নারী যারা ঋষ্যশৃঙ্গকে ভুলিয়ে নগরে নিয়ে এসেছিল বৃষ্টি পাবার আশায়। বিনায়কের কেন এমন মনে হল, সে তা ভেবে পেল না। সে ভবতোষের মতো কবিতা লিখত না বটে কিন্তু তার পাঠাভ্যাস একসময় ভালই ছিল। রামায়ণের কাহিনি তার পড়া ছিল। এখন নৌকা, নদী, পাহাড় এবং একদল উচ্ছল স্ত্রীলোকের হঠাৎ উপস্থিতি তার মধ্যে এই চিত্র প্রতিফলন সম্ভব করেছে।
প্রণামের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিনয়কে লক্ষ্মীতারা দূরের কথা, তার দলের অন্য স্ত্রীলোকরাও কেউ খেয়াল করল কিনা সন্দেহ। কিন্তু বিনয়ের তাতে কোনও ভাবান্তর হল না। সে তার ভক্তি জানাতে পেরে তৃপ্ত। স্ত্রীলোকরা কলরব করতে করতে তাদের গন্তব্যে চলে যেতে সে আবার খোঁড়াতে খোঁড়াতে টাঙ্গার পিছনে গিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে লাফিয়ে টাঙ্গায় উঠে গেল। টাঙ্গা চলতে শুরু করতে বিনায়ক জিজ্ঞেস করল, তোমার ভোলেয়ামাই দলবল নিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন?
বিনয় বলল, মোহনপুরার পুব দিকে কয়েক বছর হল নতুন চর জেগে উঠেছে। চাষবাস কিংবা বসবাস এখনও হয়নি বটে তবে বাহুবলীরা সকলেই তৈরি হয়ে আছে। যে মুহূর্তে সেখানে পটলের লথ ফেলা যাবে বা কলাই ছড়িয়ে ফসল ওঠানো যাবে, ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে লড়াই। এখন সেখানে প্রচুর ঘাসের জঙ্গল তৈরি হয়েছে। ভোলেয়ামাইয়ের দলবল সেই ঘাস কেটে আনতেই সেখানে গিয়েছিল।

তিন দিনের মধ্যে বিনায়কের অডিটের কাজ শেষ হয়ে গেল। বিনায়কের মতো একজন স্কেল থ্রি অফিসারের এত দূরবর্তী এবং এত ছোট একটা ব্রাঞ্চের অডিট করতে আসার কথা নয়। আসতে হয়েছে যে কারণে তা হল— বিগত তিন-চার বছরে মোহনপুরা ব্রাঞ্চের বেশ কিছু দুর্নাম হয়েছে। কুড়ি-পঁচিশ লক্ষ টাকার মতো ঋণের কাগজপত্রের নানা রকমের গোঁজামিল এবং অস্তিত্বহীন ঋণ গ্রহীতার তৈরি দলিল ধরা পড়েছে। সেই কারণেই বিনায়ককে কলকাতার প্রধান অফিস এখানে পাঠিয়েছে।
বিনায়কের টিমের কাজকর্ম শেষ হয়ে গেছে। আগামীকাল তারা মোহনপুরা ছেড়ে চলে যাবে।
পরদিন দুপুর দুটোর পর কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে বিনায়ক ব্রাঞ্চ ছেড়ে একা বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্য একটু ঘুরেফিরে আশপাশটা দেখবে।
হাতে ঘণ্টা দুয়েক সময় ছিল বিনায়কের। ব্রাঞ্চের ছেলেদের মধ্যে একমাত্র বিনয় ছাড়া আর পাঁচজনই হয় মালদা শহর, না হলে মানিকচকের বাসিন্দা। এরা সবাই সাড়ে চারটের মধ্যে হিসেবপত্র মিলিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
বিনায়কের ইচ্ছে ওদের সঙ্গেই একত্রে ফুলহার পার করে মালদার বাস ধরবে।
বাঁধের ওপরে উঠে সে তার ডান হাত বরাবর হাঁটতে শুরু করল। বাঁধটা খুব ধীরে পুব-দক্ষিণে বেঁকে গেছে। ব্যাঙ্কের ছেলেদের কাছে সে শুনেছিল যে বাঁধের পরিধি দশ-বারো মাইল। হাঁটতে হাঁটতে বিনায়ক ঘনবসতি লোকালয় ছাড়িয়ে অপেক্ষাকৃত বিরল বসতি অঞ্চলের দিকে এগোতে লাগল। একটা বাঁকের আড়াল পার হলে আচমকা তার চোখের সামনে দিগন্তজোড়া একটা কাশফুলের জঙ্গল, সিনেমার পর্দায় যেমন হয় তেমনই যেন ঝাঁপ দিয়ে উঠে এসে তার সম্পূর্ণ দৃষ্টিসীমাকে আড়াল করে দাঁড়াল।

বিনায়ক ব্যাঙ্ক অফিসার। অফিস এবং ব্যক্তিগত যাবতীয় হিসেবনিকেশে ডেবিট-ক্রেডিটের অমোঘ কর্তৃত্ব মেনে চলে। এহেন বিনায়ক একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন পরীরা তার চোখ বেঁধে এই স্বর্গীয় কাশবনের সমুদ্রে এনে ছেড়ে দিয়েছে।
চারপাশে অন্য কোনও জনপ্রাণী নেই। সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বাঁধের ওপরের রাস্তাটা ধীরে ধীরে সেই জঙ্গলের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলে সেই হুলুস্থুল কাশের সমুদ্রে অথবা কাশফুলের মেঘের রাজ্যে বিনায়কের নিজেকে কেমন যেন পালিয়ে আসা সুখী বালকের মতো বোধ হতে লাগল। বাঁদিকের গঙ্গার ঢাল বেয়ে কাশফুলের জঙ্গল উঠে এসে বাঁধের জমি পার হয়ে ডানদিকের নিচু উপত্যকার দিকে উধাও হয়ে গেছে। সামনের দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় গঙ্গার পাড় ধরে শুধু সাদা শরতের মেঘের মতো কাশের জঙ্গল। নিঃশব্দ চরাচর জুড়ে শুধু হাওয়ার গুঞ্জন, সেই হাওয়া কখনও কখনও শনশন শব্দ করে ওঠে। সামান্য সময় পরে আবার স্তিমিত হয়। আবার একটু পরেই শনশন শব্দ ওঠে। সেই তীব্রতার সময় কাশফুলের ছেঁড়া টুকরো বাঁদিক থেকে ডানদিকে কখনও কখনও জ্যামুক্ত তিরের মতো ছুটে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বিনায়ক শেষপর্যন্ত এমন একটা জায়গায় এল যেখান থেকে ডানে, বামে, সামনে, পিছনে এবং মাথার ওপরে শুধু কাশফুলের শুভ্রতা। অবিশ্বাস্য এবং মায়াবী মনে হতে লাগল বিনায়কের নিজের অস্তিত্বই।

একসময় মুগ্ধতার মায়াবী আবেশ আর একটি সমান স্বর্গীয় দৃশ্যে বিনায়কের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করল। বাঁদিকের নদীর চরের কাশের জঙ্গল ভেদ করে একজোড়া মোষ খুব ধীরগতিতে বাঁধের ওপর উঠে এল। মোষদুটো পুরোপুরি দৃষ্টিগোচর হত বিনায়ক সবিস্ময়ে দেখল পিছনের মোষের পিঠে লক্ষ্মীতারা স্বয়ং এবং সামনের মোষের পিঠে তার মেয়ে সোমানি। এই নামটি সে আগের বারেই জেনে গিয়েছিল।
নিঃশব্দ বনভূমি। নিঃশব্দ এবং প্রবল দুটি মোষের পিঠে সওয়ার দুই রমণী। যেন চিনা চিত্রকরের তুলি থেকে সদ্য মূর্তিমতী হয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রাণবস্তুও সচল হয়েছে। কী অপূর্ব এবং অভাবিত অভিজ্ঞতা।
বিনায়ক রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়াল। মোষদুটি পরপর ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে এল।
প্রথম মোষের পিঠে মেয়ে সোমানি বিনায়ককে চিনতে পেরে মায়ের দিকে তাকাল। দুজনেই বাঁদিকে পাশ ফিরে বসা, মোষের পিঠে যেমন বসার নিয়ম।
মেয়ের ইঙ্গিতে বিনায়ককে দেখতে পেয়ে লক্ষ্মীতারা অল্পবয়েসি বালিকার মতো ঝাঁপ দিয়ে নেমে এল মাটিতে। বাঁ হাতে যুবতীসুলভ ব্রীড়ায় পিছনের কাপড় টেনে ঠিক করল।
নমস্তে দেবীজি।
বিনায়ককের কণ্ঠস্বরে মুগ্ধতা আড়ালের কোনও উপায়ই ছিল না।
লক্ষ্মীতারা হাত তুলে তাকে প্রতিনমস্কার করল। দু’দিন তাকে আধো-অন্ধকার ঘরে এবং একদিন বেশ খানিকটা দূর থেকে দেখেছে বিনায়ক। আজ দেখল এই পরীদের রাজ্যে।
তার এক এক হাতে অন্তত একডজন করে ঘন বেগুনি রঙের কাচের চুড়ি। লাল আর হলুদে মেশানো ছাপা শাড়ি তার পরনে। বেগুনি রঙের টিপ তার কপালে। অনুমানের চল্লিশ ছুঁই ছুঁই বয়সের স্ত্রীলোকটি, বিনায়ককের মনে হল, স্থিরযৌবনা। অসম্ভব মোহময়ী। এই প্রখর দিনের আলোতেও। দু’দিন আগে প্রায়ান্ধকার ঘরে তাকে যেমনটি দেখেছিল, আজ যেন তার থেকে একদম আলাদা।
আপনাকে দর্শন করতে আর একবার আপনার কাছে যাব ভেবেছিলাম, সময় হল না। আজই চলে যেতে হচ্ছে। ভালই হল, দর্শন হয়ে গেল।
বিনায়ক একটু প্রগলভ ভঙ্গিতেই এসব কথা বলল।
লক্ষ্মীতারা হাসল। এই কাশফুলের মেঘ নেমে আসা শুভ্রতার মধ্যে তাকে দেখাচ্ছিল পত্রপল্লবপুষ্পে ঠাসা একটা বোগেনভেলিয়ার সবল শাখার মতো।
হেসে সে বলল, চলে যেতে হবে কেন? আর দো-চারদিন রহিকে যান।
স্থানকালের প্রভাব পাত্রের গুরুত্বকে লঘু করে দেখতে প্ররোচনা দিচ্ছিল বিনায়ককে। তার মনে হল এই সময়ে তার বন্ধু এবং সহকর্মী অশোক যদি থাকত, তা হলে নির্ঘাত লক্ষ্মীতারাকে সে প্রগলভ করতে পারত। যেমন বাকপটু, তেমনি দুঃসাহসী অশোক।
বিনায়ক প্রায় ভিখিরির গলায় শেষপর্যন্ত বলেই ফেলল, এই কাশফুলের জঙ্গলের মধ্যে কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে আপনাকে!
স্তুতিতে, বিশেষ করে সৌন্দর্যের প্রশংসায় বিগলিত হয় না এমন স্ত্রীলোক বিরল হলেও, বিনায়ক আগেও যে দেখেনি এমন নয়। উপরন্তু লক্ষ্মীতারা ও তার মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি সৌন্দর্যবোধেরও একনদী ফারাক আছে। কথাটা বলার পর বিনায়ক ভয়ে ভয়ে তার মুখের ভাব লক্ষ করতে লাগল।
লক্ষ্মীতারা তার হাতে ধরা মোষের দড়ি কিছুটা দূরে এগিয়ে যাওয়া মেয়ের দিকে ছুড়ে দিলে মেয়ে সেটা অভ্যস্ত নৈপুণ্যে ধরেও ফেলল। মেয়ে তার মোষ নিয়ে চলতে থাকলে পিছনের মোষও দড়ির টানে তাদের পিছে পিছে চলতে থাকল। লক্ষ্মীতারার এই সূক্ষ্ম চাতুরিতে তার মনের ভাব আঁচ করতে পারল না বিনায়ক।
সে বলল, আপকা— আপনার বন্ধুলোক চলে গেল?
বিনায়ক আরও নার্ভাস হয়ে বলল, জি— জি—
লক্ষ্মীতারা বলল, যদি ঠিক বুঝেন, ওর বহুকে বল্যে দেবেন, আপনার বন্ধু সুস্থ না হল্যে যেন বাচ্চা না ল্যায়।
ও কি সুস্থ হবে না বলে ভাবছেন আপনি?
বিনায়ক বেশ ভীত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল।
লক্ষ্মীতারার কথাবার্তায় বাংলা বেশ স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। সে বলল, বিনয়বাবুকে খুদখুশির রাস্তা থেকে ফিরিয়ে আনা হামার সম্ভব হল্যেও, আপনার বন্ধুকে সম্ভব হবে না।
এ কথা শোনার পর বিনায়ক এমন দমে গেল যে চট করে আর কথা বলতে পারল না।
লক্ষ্মীতারা তার আগের কথার জের টেনে এনে বলল, বিনয় হাম্যাদের আদমি, ও বাবু শহরকে আদমি। শহরকে আদমির মনমে বহুত কূটবুদ্ধি, হাম্যাদের সাথে মিলে না।
বিনায়কের মনে হল সে যথার্থই বলেছে। ‘কূটবুদ্ধি’ শব্দটা সম্ভবত ‘জটিল’ অর্থে ব্যবহার করতে চায় সে।
বিনায়ক যেন কথা হারিয়ে ফেলেছিল। ভবতোষ আত্মহত্যা করবে?
বিনায়কের চোখের সামনে এই কাশের জঙ্গলের অম্লান শুভ্রতা মলিন হয়ে এল। তার মাঝখানে বোগেনভেলিয়ার মতো রঙিন সুন্দরী সেই ছায়াছন্ন ঘরের মধ্যে বসে থাকা অন্তর্যামী হয়ে উঠল।
লক্ষ্মীতারা চলতে শুরু করলে বিনায়কও তার পাশে পাশে চলতে লাগল। মোষ-আরোহী একটি বালক একেবারে নিঃশব্দে তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলে বিনায়ক চমকে ওঠে পিছনে ঘুরে তাকাতে দেখল দশ-পনেরো হাত পরপর একসারি মোষ বালক-বালিকা কিংবা স্ত্রীলোকদের পিঠে নিয়ে একটা বাহিনীর মতো এগিয়ে এসেছে। তাদের কাউকে পুরো, কাউকে আধা, কাউকে পাশমাত্র, কাউকে শুধু শিঙে দেখা যাচ্ছে। কাশের বনের ভেতর দিয়ে নদীর ঢাল ছেড়ে তার বাঁধের রাস্তায় এগিয়ে আসছে।
বিনায়কের বিস্ময়ের উত্তরে লক্ষ্মীতারাই যেন বিস্মিত হল। বলল, আপ ওইসি না বললি? বিস্ময়ে তার মুখ থেকে মিশ্র বুলি বেরিয়ে এল।
হ্যাঁ, বিনায়কই তো বলেছিল। বলেছিল কলকাতার সতেরোতলা অফিসের ছাদ থেকে ভবতোষ লাফিয়ে পড়তে চায়। বলেছিল ট্রাকের চলন্ত চাকা তাকে ‘আয় আয়’ বলে ডাকে। কিন্তু সেসব কথা এই ভূয়োদর্শিনীর মুখ থেকে শোনার পর বিনায়কের মেরুদণ্ডের হাড়ের ভেতর দিয়ে হিম তরল যেন গড়িয়ে নেমে এল।
দেবী লক্ষ্মীতারা হঠাৎ গলা তুলে বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়া তার মেয়েকে ডাক দিয়ে বলল, হে সোমানি, হে ছাউড়ি, আহিস্তা যো।
তারপর ফের বিনায়কের দিকে ফিরে পরিষ্কার বাংলায় বলল, ভবতোষবাবুর বাঁচার কোনও আশ্‌শা নেই।
বিনায়ক থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
লক্ষ্মীতারা বিনায়ককে ছাড়িয়ে খানিক দূর এগিয়ে গিয়ে থেমে দাঁড়াল।
বিনায়ক স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। যারা জীবন ও মৃত্যুর সব কিছু জানে, সেরকম একজন মানুষ হিসেবে লক্ষ্মীতারাকে ভাবতে তার ইচ্ছে হল না। সে বলল, সেদিন রেণুকার সঙ্গে আপনি দুটো কথাও বললেন না, ও বেচারা একটু সান্ত্বনা পেত হয়তো।
ও আমার কাছে এসেছিল, আপনি জানেন না?
ব্যাপারটা জানত না বিনায়ক। ভারি অবাক হল সে। জিজ্ঞেস করল, কখন?
পরদিন দুপুরে।
হবে নিশ্চয়ই। সেদিন অডিটের কাজ নিয়ে বিনায়ক এবং তার টিম খুব ব্যতিব্যস্ত ছিল। সেই সুযোগে রেণুকা হয়তো গোপনে এসেছিল।
একা এসেছিল?
বিনয়কা বহু নিয়ে এসেছিল।
কিছুই জানতে পারেনি বিনায়ক। একটু আহতও হল যেন। কেন এসব কথা গোপন করল ওরা তার কাছে?
তো রেণুকাকে ব্যাপারটা আপনি বলে দিলেই পারতেন।
কোন ব্যাপারটা?
ওই বাচ্চা নেওয়ার ব্যাপারটা।
বলেছি তো।
তবে?
ভবতোষবাবু বাঁচবে না, এটা বলিনি।

যে জায়গাটায় তারা এসে পৌঁছেছে সেখান থেকে ফুলহার নদী মকাই খেতের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। অক্টোবরের ভরা নদী, উঁচু নদী, তাই দেখা যাচ্ছে এখানে-সেখানে। অন্য সময় হলে এই দূরত্ব থেকে হয়তো দেখা যেত না।
মোহনপুরা এবং আরও তিন-চারটে দ্বীপ বা উপদ্বীপ গঙ্গা ও ফুলহারের প্রায় সমান্তরাল প্রবাহের মাঝে মাঝে। হয়তো গঙ্গাই কোনও দূর অতীতে দু’ভাগ হয়ে এইসব দ্বীপ বানিয়েছিল। নদীর কথা কিছুই বলা যায় না। ফুলহার এবং গঙ্গা এক হয়ে গেছে মালদা জেলার মানিকচকের কাছে। পশ্চিমে মরাকোশী নামে কৌশিকীর একটি অতি প্রাচীন পরিত্যক্ত খণ্ড ফুলহার এবং গঙ্গাকে জুড়েছে। উত্তরে বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার দূর দিয়ে গেছে মহানন্দা। গেছে গঙ্গার সঙ্গে কখনও কিছুটা সমান্তরাল, কোথাও আবার কোনাকুনিভাবে। শেষে রাজশাহিতে গিয়ে সে গঙ্গায় পড়েছে। আবার কালিন্দী নামে ছোট একটি নদী, যার গতিপথ খুব বেশি হলে পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার, ফুলহার থেকে বেরিয়ে মালদা জেলার কোতোয়ালির কাছে মহানন্দার সঙ্গে মিশেছে।
এসবই গঙ্গা, কোশী, মহানন্দার খাত পরিবর্তনের খেলা। ফুলহার মহানন্দার পরিত্যক্ত অংশ, এখন মনে হয় গঙ্গা থেকে বেরিয়ে কিছু দূর সমান্তরাল গিয়ে গঙ্গাতেই মিশেছে। আবার কালিন্দী-মহানন্দার মিলিত খাত, যা এখন মালদা ও রাজশাহি জেলাকে বরিন্দ ও দিয়ারা, এই দুই ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে বিভক্ত করেছে, আসলে গঙ্গার একসময়ের প্রধান ধারা। এই যে খাত পরিবর্তন, এর সঙ্গে ওর মিশে যাওয়া, আবার ছাড়াছাড়ি, এসবের পিছনে রাজমহল পর্বতমালার আবার একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। গঙ্গা বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে দক্ষিণে সরতে সরতে রাজমহলের পাথুরে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়েছে। তার আর দক্ষিণে সরার জায়গা নেই।
বিনায়ক যেহেতু এ জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিল, এসব ভূগোল-ইতিহাস কিছুটা তার জানা ছিল।
পশ্চিমবাংলা থেকে স্থলপথে মোহনপুরাতে যাওয়া যায় না। মালদার ভালুকা কিংবা দেবীপুর থেকে নৌকাতে যেতে হয় সেখানে। কিন্তু বিহারের কাটিহার থেকে খরার সময়ে মরাকোশীর ওপরের কালভার্ট পেরিয়ে স্থলপথেই মোহনপুরাতে যাতায়াত করা যায়।
মোহনপুরার চারদিক ঘিরে রয়েছে কাটিহার, ভাগলপুর, সাহেবগঞ্জ, রাজমহল, মুর্শিদাবাদ ও মালদার শত শত বছরের পাঠান-মোগল সূর্যবংশী-চন্দ্রবংশী শাসন। প্রবল মৈথিলী ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র চারদিকে। প্রবলতর পাঠান জমিদার-জোতদারদের হাতে মাথা কাটা প্রতাপ।
এর মাঝখানে বিস্তীর্ণ দ্বীপ-দিয়ারায় মাল্লা-মুসাহর-বিন্দ-চাঁই-নগর-ধানুক, নিম্নবর্গের সামাজিক ভূগোল। এরই মধ্যে একটি দ্বীপে দেবী লক্ষীতারা, দেবী দেয়াসিন যোগিনী যক্ষিণী— যে নামেই ডাক— তার অবস্থান। সে সব ভুলিয়ে দেয়। দুঃখ, কষ্ট, পাপভয়, আতঙ্ক, কৃতকর্মের ক্ষত, যা অনুশোচনা, আত্মপীড়ন পর্যন্ত দূর করতে পারে না, যোগিনী লক্ষ্মীতারা সেসব থেকে তোমাকে মুক্তি দেবে!
বাঁধের ওপর থেকে লক্ষ্মীতারা বাড়ির দিকে যাওয়ার ঢালটায় এক পা নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর পিছন ফিরে বলল, আইয়ে— আসুন।
বিনায়ক তার গলায় আগ্রহ খুঁজে পেল। এতক্ষণের মধ্যে এই প্রথমবার তার মনে হল স্তুতির জন্য যেন প্রশ্রয়ের ইঙ্গিত আছে তার আহ্বানে।
বিনা বাক্যব্যয়ে লক্ষ্মীতারার পিছন পিছন বিনায়ক তার টিলার ওপরের বাড়ির বাইরের উঠোনে উঠে এল।
উঠোনে উঠে দাঁড়াতেই যাকে দেখে সে বিস্ময়ে চমকে উঠল সে হল চৌধারিদের সেই পোতা ভরত, যাকে মাস ছয়েক আগে এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে দেখেছিল বিনায়ক।
ভরত একটা মাঝবয়েসি ছাতিম গাছের তলায় বসে ছিল। অত্যন্ত বিষণ্ণ তার আয়োজন। বেড়ে ওঠা বেশ কয়েক দিনের দাড়ি তার মুখমণ্ডলে। বেশভূষা যথার্থই মগহি দিওয়ানার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভরত না? বিনায়ক জিজ্ঞেস না করে পারল না।
লক্ষ্মীতারা বলল, জি হাঁ।
চৌধারিরা ওকে নিয়ে যায়নি?
ও যাবে না এখান থেকে। আপনা ঘর আর যাবে না ভরত।
এই ছ’মাস ধরে—
হ্যাঁ, ওই গাছতলাতেই পড়ে আছে।
বিনায়ক বলল, তাজ্জব! বলল, ও কি ওর কৃতকর্মের অপরাধবোধ থেকে মুক্ত?
এতক’টা সাধু এবং তৎসম শব্দ লক্ষ্মীতারা বুঝতে সক্ষম হবে কিনা পরক্ষণেই ভাবল বিনায়ক। কিন্তু যাকে সারাজীবন ধরে মানুষের অনুতাপের কথা শুনতে হচ্ছে, উপলব্ধি করতে হচ্ছে আত্মপীড়নের মাত্রা, গভীরতা ও ব্যথা, তার পক্ষে ভাষা কোনও প্রতিবন্ধকতা নয়।
লক্ষ্মীতারা বলল, এখনও হয়নি। যখন ওর গায়ের রং সবুজ-কালো শ্যাওলার মতো হবে, ওর মাথার ওপরের গাছটার মতো স্থির হতে শিখবে, সর্বংসহ হবে, তখন ওর মুক্তি হবে।
মুক্তি পেয়ে ও কোথায় যাবে দেবী?
যেখানে ওর খুশি, ও সেখানে যাবে। ভরত ওর বাপ-মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাইলে, ফিরে যাবে। অন্য কোথাও যেতে চাইলে, সেখানে যাবে। এমনকি, এখানে থাকতে চাইলে, এখানেই থাকবে।
লক্ষ্মীতারা তার সুললিত মৈথিলী মিশ্রণের বাংলায় এই কথাগুলো বলল। বিনায়কের মনে হল সে যেন দৈববাণী শুনছে।
কতদিনে ওর মুক্তি হবে?
হাম কী জানু?
এবং সঙ্গে সঙ্গে হাঁক দিয়ে বলল, গঙ্গাদাস, ভরতকো গঙ্গাপানি মে নাহাকে লে আনু।
ভরত এতক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে গাছের পাতার দিকে তাকিয়ে ছিল। গঙ্গাদাস এসে তার হাত ধরতে সে উঠে নদীর দিকে চলতে শুরু করল।
এই হল লক্ষ্মীতারা দেবীর সঙ্গে বিনায়কের তৃতীয়বার সাক্ষাতের বৃত্তান্ত।
অঙ্কন : শুভ্রনীল ঘোষ
পরের অংশ...

অভিজিৎ সেন চা ও সামান্য জলখাবার খাওয়ার পর ভবতোষ রেণুকাকে নিয়ে লক্ষ্মীতারার বাড়িতে এল বিনায়ক। আগের বারের মতোই বাইরের উঠোনের ইতস্তত পড়ে থাকা কাঠের গুঁড়িগুলোর ওপরেই বসল তারা। আগের দিনের মতোই আরও বেশ কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে ছিল। আগের বারে বিনায়ক ভাল করে লক্ষ করেনি, এবার করল— কাঠের গুঁড়িগুলোর মধ্যে কয়েকটা যেন ফসিল হয়ে [...]

আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST
Pujo Special Issue
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$4/-*
One-time payment for one year
*Inclusive of GST