বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

নদীকে বুঝতে গেলে তার কাছে যেতে হবে : কল্যাণ রুদ্র

নদী শুধু তাঁর চর্চার বিষয় নয়। ভালবাসারও বিষয়। গত চার দশক ভারত বিশেষত বাংলার নদীকে তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর কাছে নদী মানে শুধু প্রবাহমান জলধারা নয়, জীববৈচিত্র্যের এক বহমান ধারা এবং তার চারপাশের অসংখ্য মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি। নদীর উৎস, মোহনা, তার প্রবাহপথ, তার নানা বৈশিষ্ট্য যেমন তাঁর আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে তেমনই নদীর ধারের জনজীবনও লক্ষ করেছেন গভীর আগ্রহের সঙ্গে। নদী নিয়ে তাঁর অনুভব এবং ভাবনার প্রসঙ্গ উঠে এল এই কথোপকথনে। নদীকে নিয়ে তাঁর অসংখ্য লেখা দেশ-বিদেশের নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তবু থেকে গেছে না বলা নানা অনুভবের কথা। সেসব জানা-অজানা মণিমুক্তো উঠে এল এই আলাপচারিতায়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী-বিজ্ঞানী কল্যাণ রুদ্র-র সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁর ছাত্র জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী।

প্রশ্ন : আপনার ছোটবেলা কি কোনও নদীর ধারে কেটেছে? ছোটবেলার সেই নদী দেখার স্মৃতি কি পরবর্তীর নদীচর্চায় কাজে লেগেছে?

আমার জন্ম লালবাগ শহরে পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে। মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ শহরের একটু উত্তর দিয়ে গঙ্গা-পদ্মা বয়ে যেত। আমি তখন এত ছোট যে আমার স্মৃতিতে এই নদী নেই। বাবা সরকারি চাকরি করতেন, দু-চার বছর পর বদলি হত, তাই লালবাগ থেকে আমরা আসি আরামবাগে। ওখানে আমাদের বাড়ির কাছ দিয়ে দ্বারকেশ্বর নদী বয়ে যেত। আমি আমার ঠাকুমার সঙ্গে মাঝে মাঝে নদীর ধারে যেতাম। বালুচরের ভেতর দিয়ে দ্বারকেশ্বর আঁকাবাঁকা পথে বয়ে যেত, রোদ পড়লে চিকচিক করত। ঠাকুমা ঘটিতে জল ভরে স্নান করতেন আর পাড়ে বসে দেখা সেই স্মৃতি আমার মনে পড়ে।
ওখান থেকে আমরা চলে যাই কালিম্পংয়ে; তখন আমার বয়স তিন বছর। কালিম্পংয়ের কথা আমার মনে আছে। মেঘমুক্ত আকাশ থাকলে আমাদের বাড়ির জানলা দিয়ে সকালবেলা কাঞ্চংজংঘা দেখা যেত। সকালে সোনালি, একটু পরেই ঝকেঝকে সাদা! শহর থেকে একটু দূরে আমাদের যাতায়াতের পথে তিস্তা দেখতাম। এ এক ভিন্ন ধরনের নদী, পাহাড়ের মধ্যে গভীর খাত ধরে বয়ে গেছে। তার একটা তীব্র গর্জন ছিল এবং দু’পাশের পাহাড় তখন একদম সবুজ। তখনও এত বেশি নগরায়ন হয়নি।
এরপরে বাবা আসেন ব্যারাকপুরে। ব্যারাকপুরেও আমাদের বাড়ি গঙ্গার খুব কাছেই ছিল। সেখানে আমরা নদীতে স্নান করতে যেতাম। আমার সেই স্মৃতিও বেশ পরিষ্কারভাবে মনে আছে। নদীটা কেমন ছিল, কেমন করে একটু একটু পাড় ভাঙত, সেইসব দৃশ্য মনে পড়ে। আমরা নদীতে বান এলে দেখতে যেতাম। এই সময় আমার স্কুলের পড়া শুরু হল। আমার স্কুল-জীবন একটু দেরিতে শুরু হয়েছিল। আমি একেবারে ক্লাস টু-তে ভর্তি হই। ব্যারাকপুর থেকে আমরা চলে আসি দমদমে। দমদমে আমাদের বাড়ির কাছে নদী ছিল না কিন্তু দমদমে আমরা ছিলাম মাত্র এক বছর।
সেখান থেকে আমরা যাই হাওড়ায়। সেখানেও আমাদের বাড়ি নদীর পাড়ে। হাওড়া থেকে আমরা আসি হুগলি-চুঁচুড়াতে। হুগলিতে তো আমাদের বারান্দায় দাঁড়ালে জুবিলি ব্রিজ এবং গঙ্গা দেখা যেত। তখন আমি স্কুল-জীবনের শেষের দিকে, হুগলি ব্রাঞ্চ গভর্মেন্ট স্কুলে পড়ি। আমাদের স্কুলও নদীর পাড়ে। তখন আমি নদীকে খুব গভীরভাবে দেখেছি। দেখেছি মজে যাওয়া সরস্বতী নদী, সপ্তগ্রাম ও হুগলি বন্দরের ধ্বংসাবশেষ, ব্যান্ডেল চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পর্তুগিজ জাহাজের মাস্তুল।
সেখান থেকে আমরা চলে আসি আলিপুরে। আলিপুরে আমাদের বাড়িটা ছিল আদিগঙ্গার পাড়ে, যে নদীপথে চাঁদ সদাগর বাণিজ্যে যেতেন আর ওই পথেই মহাপ্রভু নীলাচলে গিয়েছিলেন। তখনও আদিগঙ্গা খুব একটা ভাল অবস্থায় না থাকলেও এতটা দূষিত নয়। তখন একবার আদিগঙ্গা খননের কাজও হয়েছিল। আলিপুরে থাকাকালীনই বাবা অবসর নেন। আমরা বেহালাতে একটা নিজস্ব ছোট বাড়িতে বসবাস করতে আরম্ভ করি। সেটা হচ্ছে ১৯৭৪ সালের শেষের দিক। এই সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ফলে আমার শৈশব এবং কৈশোর স্মৃতিতে নানা ধরনের নদী থেকে গেছে।
আমরা যখন কালিম্পং থেকে ব্যারাকপুর আসছি তখনও শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি ট্রেনে কলকাতা আসা যায় না। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন তখনও হয়নি। শিলিগুড়ি থেকে মিটারগেজ ট্রেনে উঠতে হত, রাজমহল পাহাড়ের কাছে সকরিগলি ঘাট আর মণিহারি ঘাট এপার-ওপার। ওইখানে ছোট ট্রেন এসে দাঁড়াত। মনে আছে বালির ওপর দিয়ে অনেকটা হেঁটে এসে একটা বড় স্টিমারে উঠেছিলাম। এপারে আরেকটা ব্রডগেজ ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। ওই ট্রেনে উঠে শিয়ালদায় এসেছিলাম। নদী পার হওয়ার সময় দেখেছিলাম গঙ্গার বিপুল জল-পলির স্রোত আর মাঝে মাঝেই একটা শুশুক লাফিয়ে উঠে আবার ডুবে যাচ্ছে।
এই ভাবেই নদীর যে স্মৃতি আমার মনের মধ্যে ছিল তা হয়তো গভীরে লালিত হয়েছিল বলেই নদীকে ঘিরে আমার একটা কৌতূহলও আস্তে আস্তে মনের ভিতর তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনার নদী নিয়ে চর্চার শুরু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার তাগিদে, না কি আরও আগে? বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার গবেষণার বিষয় কী ছিল? যাঁদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ কোনও শিক্ষকের কথা মনে পড়ে যাঁর বা যাঁদের পড়ানো আপনাকে পরবর্তীকালে নদীচর্চায় আগ্রহী করে তুলেছে?

আমি যখন হাওড়ায় রামকৃষ্ণপুর হাইস্কুলে পড়তাম তখন ক্লাস নাইনে আমাদের একজন মাস্টারমশাই ভূগোল পড়াতেন। তাঁর নাম ছিল অনিল দাস। ওঁর পড়ানোর ভঙ্গিটা আমার খুব ভাল লাগত। বোধহয় তারপর থেকেই আমার ভূগোলের প্রতি প্রথম অনুরাগ জন্মায়। হুগলির ব্রাঞ্চ স্কুল থেকে পাশ করার পর আমি সাতের দশকের গোড়ায় কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে পড়তে আসি। ১৯৭০ সাল; একটা উত্তাল সময়, প্রেসিডেন্সি কলেজ বন্ধ। অন্যান্য কলেজের সঙ্গে আমাদের কলেজ মাঝে মাঝে খুলছে, মাঝে মাঝে বন্ধ হচ্ছে। গোটা পশ্চিমবঙ্গে অস্থির পরিবেশ। ১৯৭০-এর দশক মুক্তির দশক হবে এমন স্বপ্নে বিভোর হয়ে অনেক ছাত্র গ্রামে চলে গেছে, শুরু হয়ে গেছে পুলিশের অতিসক্রিয়তা। একাধিক দিন সকালবেলা উঠে দেখছি পুরো পাড়াটা মিলিটারিরা ঘিরে ফেলেছে। পাড়ার মোড়ে কাঁটাতারের ফেন্সিং লাগানো হয়েছে। প্রত্যেকটা বাড়িতে ঢুকে অল্পবয়সি ছেলেদের সম্বন্ধে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তাই আমাদের বাড়িতে কখনও পুলিশ আসেনি।
বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময় একজন অসাধারণ শিক্ষক মহাশয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তাঁর নাম অধ্যাপক সুনীল মুন্সী। যদিও দুর্ভাগ্যক্রমে প্রথম বর্ষ আমাদের পড়ানোর পর তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। কিন্তু স্যারের মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। উনি শুক্রবার সকালে আমাদের জিওমরফোলজির একটা ক্লাস নিতে আসতেন। এই ক্লাসটা আমাকে মুগ্ধ করত। আমি সারা সপ্তাহ এই ক্লাসটার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম।
আমি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনওদিনই সেই অর্থে মার্কশিটের বিচারে ভাল ছাত্র ছিলাম না। কলেজ থেকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাম তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে অধ্যাপক মনোতোষ বন্দোপাধ্যায় জিওমরফোলজি পড়াতেন। উনি তার কয়েক বছর আগে আমেরিকার উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা করে ফিরেছেন। উইলিয়াম থর্নবেরির ছাত্র ছিলেন। কয়েকটি বিষয়ে তাঁর শিক্ষকতা এবং সময়ানুবর্তিতা আমাকে মুগ্ধ করত। দ্বিতীয় বর্ষে যখন আমি নদী-বিজ্ঞানকে আমার স্পেশাল পেপার হিসেবে নিলাম তখন মনোতোষবাবুর সঙ্গে অধ্যাপক সুভাষরঞ্জন বসুও পড়াতেন।
এতদিন পরে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষা খুব ভাল হয়েছিল এমন কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল দেখেছি, মন্দও দেখেছি। কখনও কখনও শিক্ষকদের মধ্যেও দলাদলি, পরশ্রীকাতরতা ও নীতিবোধের চূড়ান্ত অভাব মনকে ভারাক্রান্ত করত। পাশ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না। সেই সময় আমি কলকাতার বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা শুরু করি; নদী নিয়ে আরেকটু জানা, আরেকটু বোঝার একক চেষ্টা বলা যায়। কাজটা যখন শুরু করি তখন কিন্তু আমার পিএইচডি রেজিস্ট্রেশন হয়নি। কারণ আমি যেমন রেজাল্ট করেছিলাম তাতে কোনও শিক্ষকেরই আমাকে নিয়ে কাজ করার খুব একটা উৎসাহ ছিল না। অবশ্য আমার খারাপ রেজাল্ট করার পিছনে একটা অন্য কারণও ছিল। নিজেদের দলাদলিতে একজন শিক্ষক আমাকে অপব্যবহার করেছিলেন। গোপন থাকবে এই আশ্বাস দিয়ে এক শিক্ষক আমাকে দিয়ে উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়ার জন্য একটি প্রতিবাদপত্র লিখিয়ে নেন; কিন্তু বিষয়টা গোপন থাকেনি এবং তার প্রভাব আমার রেজাল্টে পড়েছিল। সে সময় শিক্ষকদের একটা দল অন্তত আমাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না।
তখন আমি উড়িষ্যার বুড়িবালাম নদীর বিবর্তন নিয়ে একটা কাজ আরম্ভ করি। বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে একটা নিবন্ধ লিখব ভেবে। এককভাবে আমি লেখাটা শেষ করি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জিওগ্রাফিক্যাল রিভিউ অফ ইন্ডিয়া’-কে আমরা ভাবতাম খুব ভাল পত্রিকা। সেখানে পাঠালাম লেখাটা। অধ্যাপক মিহির মাইতি তখন পত্রিকাটি দেখতেন। লেখাটা যখন প্রকাশিত হল তখন দেখা গেল লেখক হিসেবে আমার নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের নামও যুক্ত হয়ে আছে। এমন ঘটনা অনেক দেখেছি। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি বলা চলে। ছাত্ররা গবেষণা করে এবং লেখে কিন্তু অর্ধেক কৃতিত্ব চলে যায় গাইড বা সুপারভাইজারের ঝুলিতে।
এই সময় আমি ইন্টারভিউ দিয়ে পরপর দুটি চাকরি পেয়েছিলাম। একটা ভুটানের একটা সেন্ট্রাল স্কুলে। সেই চাকরিটা আমি করিনি। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে টাকি গভর্মেন্ট স্কুলে আর একটা চাকরি পাই। ইছামতির পাড়ে টাকি একটি পুরনো শহর। ওখানে বছর দেড়েক পড়িয়েছিলাম। শিক্ষকদের একটা মেস ছিল, ওখানেই থাকতাম। সপ্তাহের শেষে বাড়ি আসতাম। প্রতিদিনই ইছামতিকে দেখতাম। নদীর ওপারে ছিল বাংলাদেশ।
এর এক বছর আগে ১৯৭৮ সালে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। গোটা দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে এক ভয়াবহ বন্যা হয়। আমরা তখন বেহালায় একটি একতলা বাড়িতে থাকি। আমাদের বাড়িটি জলে ডুবে যায়। সেই বন্যা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এখনও স্মরণীয়। আমি ওই বন্যা নিয়ে দুটো ছোট প্রবন্ধ লিখি। একটি প্রবন্ধ পান্নালাল দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘কম্পাস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেটাই আমার লেখা প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ। তারপরে একই বিষয় নিয়ে আমি ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ লিখি। সেই প্রবন্ধটি ১৯৭৯ সালে ‘জার্নাল অফ পাওয়ার অ্যান্ড রিভার ভ্যালি ডেভলপমেন্ট’ নামে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।
১৯৭৯ সালের জুন মাসেই আমি টাকিতে শিক্ষকতা শুরু করি। আমি তখন ভাবতে আরম্ভ করি, আমার পক্ষে এখানে থেকে উড়িষ্যার সিমলিপালে গিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়, যেহেতু আমাকে চাকরিটা করতে হবে। আমি খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে, বাবা তখন অবসর নিয়েছেন, বাবার ওপরে প্রবল আর্থিক চাপ। দিদিদের তখনও বিয়ে হয়নি। সৌভাগ্যক্রমে টাকিতে একটা ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরি ছিল। আমি বিকেলবেলা ওখানে গিয়ে পড়াশোনা করতাম। এই লাইব্ররিতে অনেক পুরনো নথিপত্র আছে। তখন ওখানে লাইব্রেরিয়ান ছিলেন প্রণববাবু এবং তাঁকে সহযোগিতা করতেন নিমাইবাবু। ওঁরা আমাকে একটা বই এনে দিলেন। বললেন, আপনি যেসব বই খুঁজছেন, হয়তো এই বইটা আপনার কাজে আসতে পারে। সেই বইটা ছিল ম্যাকক্রিন্ডল সম্পাদিত ‘এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া অ্যাজ ডিসক্রাইব বাই টলেমি’। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত বইটি তখন ভঙ্গুর। আমি ওই লাইব্রেরিতে প্রতিদিন বিকেলবেলা গিয়ে ওই বইটা পড়তে আরম্ভ করি।
টলেমি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে ভূগোল, অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা ও সঙ্গীতের চর্চা করতেন। বিস্তীর্ণ পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গা সে সময় মানুষের অজানা ছিল। প্রথম শতাব্দীতে টলেমি প্রায় আট হাজারটি স্থানের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করেছিলেন। তিনি পরিব্রাজকদের বর্ণনা শুনে গঙ্গার মোহনা সম্বন্ধে বিস্তারিত লেখেন। উনি লিখেছিলেন— গঙ্গার মোহনা তখন পাঁচটি শাখা দিয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে। সেগুলোর তিনি নিজের মতো নামকরণ করলেন। যেমন, যে ভাগীরথী-হুগলি নদী গঙ্গার সবচেয়ে পশ্চিমের শাখা তার নাম দিলেন কামবাইসন। পরেরটার নাম দিলেন মেগা। এরকমভাবে তিনি পাঁচটা শাখানদীর নামকরণ করলেন। ঐতিহাসিক নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৯৪১ সালে সায়েন্স অ্যান্ড কালচার পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে এই পাঁচটি শাখাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিলেন অর্থাৎ যে পাঁচটি শাখার কথা টলেমি বলেছিলেন সেগুলি কোন কোন পাঁচটি নদী।
এখন ভারত এবং বাংলাদেশ মিলিয়ে গঙ্গার তেরোটি শাখা আছে যেগুলোকে আমরা বলি টাইডাল ক্রিক বা মোহানা। তার মধ্যে কোন পাঁচটির কথা টলেমি উল্লেখ করেছিলেন ভট্টশালী সে বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। আমার সেই প্রবন্ধটা পড়ে মনে হল, এই বিষয়ে আরও একটা প্রবন্ধ লেখা যায়। আমি নতুন করে পড়াশোনা করে একটা প্রবন্ধ লিখি। সেটা ১৯৮০ সালে জিওগ্রাফিক্যাল রিভিউ-তে জমা দিই। তখন জিওগ্রাফিক্যাল রিভিউ-এর সম্পাদক ছিলেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট-এর অধ্যাপক সত্যেশ চক্রবর্তী। তিনি লেখাটা পড়ে মুগ্ধ হন। অত্যন্ত রাশভারী মানুষ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি অধ্যাপকদের খুব একটা পাত্তা দিতেন না। এই লেখাটি হাতে নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোতোষবাবুর ঘরে যান এবং জিজ্ঞেস করেন এই ছেলেটি কে? কারণ লেখাটির নীচে আমি মনোতোষবাবুর কাছে ঋণ স্বীকার করেছিলাম। সত্যেশবাবু বলেন, এবারের সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে এই লেখাটি প্রকাশ করব। এটা ছিল একটি বিরল ঘটনা কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপকরা যে সংখ্যায় লিখছেন সেখানে আমার মতো একজন অল্পবয়সি স্কুলশিক্ষকের লেখা প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে।
সেই সময় থেকে আমার সঙ্গে সত্যেশবাবুর একটা ঘনিষ্ঠতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। আমি সত্যেশবাবুর কাছে সরাসরি পড়িনি কিন্তু উনি আমার পিএইচডি থিসিসটা দেখে দিয়েছিলেন খুব যত্ন করে। সুনীল মুন্সীও দেখে দিয়েছিলেন। সত্যেশবাবু আমার পিএইচডি থিসিস দেখে বলেছিলেন, এ পর্যন্ত জিওগ্রাফির ছেলেমেয়েদের যেমন লিখতে দেখেছি তার তুলনায় তুমি অনেক ভাল লিখেছ। তবে আমার আর অনেক কিছু বলার আছে। তিনি আরও অনেক কথা বলেছিলেন যা হলে থিসিসটা আরও ভাল হত। আমার এখন মনে হয় উনি যদি দেখে না দিতেন তাহলে হয়তো আমার পিএইচডি থিসিসটা জমা দেওয়াই হত না। সুনীল মুন্সীও একইভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তবে এখন এই বয়সে এসে মনে হয়, ওই থিসিসটা খুব একটা কাজের কিছু হয়নি। আরও ভাল করে করা যেত।
যাইহোক, সত্যেশবাবুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ওঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে উনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন যার বিষয় ছিল ‘গঙ্গা ডেল্টা ও বেঙ্গল বেসিন’। তখন তিনি অসুস্থ, হুইলচেয়ারে বসে থাকেন। আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, তুমি আমাকে তথ্য দিয়ে একটু সাহায্য করতে পার? আমি সমস্ত তথ্য, যা কিছু আমার কাছে ছিল, ওঁকে পৌছে দিয়ে আসি। হুইলচেয়ারে বসেই এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তৃতা করেছিলেন। ওঁর একটা ইচ্ছা ছিল যে, বেঙ্গল বেসিন নিয়ে আমরা দু’জন একটা বই লিখি, সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তবে ২০১৮ সালে যখন আমার ‘গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র মেঘনা ডেল্টা’ বইটি প্রকাশিত হয় তখন আমার মনে হয়েছিল উনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমাকে সহযোগিতা করতেন।
যাইহোক, জিওগ্রাফিক্যাল রিভিউতে লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর মনোতোষবাবু আমাকে ডেকে বললেন ওঁর কাছে পিএইচডি করার জন্য। এর আগে পর্যন্ত কোনওদিনই আমাকে পিএইচডি করার কথা উনি বলেননি। আমি রেজিস্ট্রেশন করি। আমার পিএইচডির বিষয় ছিল ভাগীরথী হুগলির নদীর বিবর্তনের ইতিহাস।
এরমধ্যে ১৯৮০ সালে আমার একবার প্যারিসে যাওয়ার সুযোগ হল। ইন্টারন্যাশনাল জিওলজিক্যাল কংগ্রেস যোগদান করার জন্য। সিকিমের ভূমিধস নিয়ে ২৫০-৩০০ শব্দের যে ছোট লেখাটির জন্য আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম সেটি মনোতোষবাবুই লিখেছিলেন, আমি তাঁকে শুধু সাহায্য করেছিলাম। প্যারিসে যেতে অন্তত ১৪ হাজার টাকা চাই। আমি তখন টাকি গভর্মেন্ট স্কুলে পড়াই; সেই সুবাদে সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য আবেদন করি। দু’জন মানুষ আমাকে এই সময় খুব সাহায্য করেছিলেন। ব্রাঞ্চ স্কুলে আমার সময়কার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শক্তি ভট্টাচার্য তখন কলকাতায় অ্যাডিশনাল ডিপিআই হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন, আরেকজন হলেন বসিরহাটের এমএলএ নারায়ণ মুখার্জি। সরকার থেকে আমাকে ১৪ হাজার টাকা সাহায্য করা হয়।
১৯৮০ সালে আমি ১৪ দিনের জন্য প্যারিসে যাই। তখন আমার ২৭ বছর বয়স। অতবড় একটা আন্তর্জাতিক সেমিনার, যেখানে সারা পৃথিবী থেকে জিওলজিস্টরা এসেছেন, আমি মূলত শুনতে আর শিখতে গিয়েছিলাম। এই প্রথম আমি দেখলাম আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কী পর্যায়ে হয়। ফিরে আসার পরে আমি আর সিকিমের ল্যান্ড স্লাইড বা ভূমিধস নিয়ে মাথা ঘামাইনি। কারণ তখন আমাকে বদ্বীপ আর গঙ্গা টানছে।
এরপর ১৯৮৬ সালে আমি পিএইচডি থিসিস জমা দিই। সেই সময়ে সন্তোষ ভট্টাচার্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ টালমাটাল অবস্থা চলছে। তার মধ্যেই আমি পিএইচডি অ্যাওয়ার্ডেড হই। ইতিমধ্যে ১৯৮১ সালে আমি কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে হাবড়া শ্রীচৈতন্য মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি পেয়ে যাই। এই সময় ট্রেনে যাতায়াত করতে হত। কলকাতা থেকে যাওয়ার পথে আমরা গুমার কাছে বিদ্যাধরী অতিক্রম করতাম; দু’পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এবং প্রতিদিন সবুজ প্লাবনভূমিটাকে দেখতাম। দেখতাম কীভাবে নানা ফসল হয় বিভিন্ন সময়ে। ১৯৮১ সালে দেখেছিলাম কৃষকরা এক পাইপ বা ২০ ফুট নীচে থেকে শ্যালো পাম্প দিয়ে সেচের জল তুলছেন। তিন দশক পর যখন হাবড়ার কলেজ ছেড়ে এলাম তখন মাটির নীচের জলস্তর ৮০ ফুট গভীরে নেমে গেছে। সব কিছুই কিন্তু আমার মাথায় ধীরে ধীরে সঞ্চিত হচ্ছিল। আমি বুঝেছি, পরবর্তীকালে আমার নানান লেখায় সেগুলো বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আমি খুব গভীর মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম এবং সেটা কোথাও না কোথাও মনের গভীরে থেকে গেছে।

প্রশ্ন : বাংলার নদী নিয়ে আপনার পূর্বসূরিদের কোন কাজগুলি আপনাকে প্রভাবিত করে?

বাংলার নদী গবেষণা আমাদের ভৌগোলিকদের হাত ধরে শুরু হয়নি। যেমন প্রথম বাংলার নদী নিয়ে যে বইটা প্রকাশিত হয়েছিল, যেটা এখনও লোকে পড়ে, সেটা হল রাধাকমল মুখার্জির ‘চেঞ্জিং অফ বেঙ্গল স্টাডি অফ রিভারাইন ইকনমি’, সেটা ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। রাধাকমল মুখার্জি ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন, আমার যতদূর মনে পড়ছে, উনি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়াতেন। তার আগে ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে আসেন স্যার উইলিয়াম উইলকক্স, তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল প্রাচীন বাংলার সেচ ব্যবস্থা। লিখিত বক্তৃতাটি ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করে। ১৯৪২ সালে সতীশচন্দ্র মজুমদার, যিনি অবিভক্ত বাংলার চিফ ইঞ্জিনিয়ার বা মুখ্য বাস্তুকার ছিলেন, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেকটি বক্তৃতা দেন। শিরোনাম ছিল ‘রিভার্স অফ বেঙ্গল ডেল্টা’, যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করে। ১৯৪৪ সালে কাননগোপাল বাগচির ‘গ্যাঞ্জেস ডেল্টা’ প্রকাশিত হয়। এই চারটি বই স্বাধীনতার আগে প্রকাশিত হয়। লক্ষণীয় এঁরা কিন্তু কেউ সেই অর্থে ভূগোলের লোক নন। কাননবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলের বিভাগীয় প্রধান হিসাবে অবসর নিলেও তিনি কিন্তু মূলত ভূতাত্ত্বিক বা জিওলজিস্ট।
তারপর পঞ্চাশের দশকে যিনি বাংলার নদী নিয়ে কিছুটা হলেও কাজ করেছিলেন তিনি হলেন কপিল ভট্টাচার্য। তাঁর বইটি পড়লে বোঝা যায় তিনি মূলত একজন অ্যাক্টিভিস্টের চোখ দিয়ে নদীগুলোকে দেখছিলেন। ডিভিসি এবং ফারাক্কা ব্যারেজের তিনি কঠোর সমালোচক ছিলেন। তাঁর অনেকগুলো ভবিষ্যদ্‌বাণী পরবর্তীকালে মিলে গেলেও আজও যে বইটি আমাদের অনেকের কাছে সযত্নে রক্ষিত সেটা কিন্তু সামগ্রিকভাবে বাংলার নদী নিয়ে নয়।
ঐতিহাসিকদের মধ্যে যাঁরা নদী নিয়ে ভেবেছেন তাঁদের মধ্যে নীহাররঞ্জন রায়ের কথা প্রথমেই বলতে হয়। নদী নিয়ে ভাবনা বিশেষভাবে পাওয়া যায় মেঘনাদ সাহা এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের লেখার মধ্যে। আর যাঁকে ছাড়া বাঙালির কোনও ভাবনাই অসম্পূর্ণ থাকে সেই রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যেও। তিনি যখন শিলাইদহে থাকতেন, জমিদারি দেখাশোনার কাজে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াতেন, সেইসময় লেখা ছিন্নপত্রের চিঠিগুলোকে দেখলে তৎকালীন ওই অঞ্চলের নদী গড়াই-ইছামতি-পদ্মা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের বন্যা নিয়ে যিনি গবেষণা করেছিলেন তিনি হলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ।
এই কাজগুলোর আগে আরেকটি কাজের কথা বলতে হবে। সেটা হচ্ছে ১৭৮০-তে লন্ডন থেকে প্রকাশিত জেমস রেনেলের ‘এ বেঙ্গল অ্যাটলাস’। বাংলার নদীর ইতিহাস জানতে আমাদের এই বেঙ্গল অ্যাটলাসের দ্বারস্থ হতেই হয়। ১৭৬৪ সালে জেমস রেনেলকে বাংলার জরিপের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারণ বিচক্ষণ ইংরেজরা বুঝেছিল একটা দেশকে শাসন করতে গেলে এই দেশটা সম্বন্ধে ভৌগোলিক জ্ঞান থাকা চাই। জেমস রেনেলের তখন মাত্র একুশ বছর বয়স। তাঁকে প্রথমে বলা হয়েছিল আপনি কলকাতা থেকে ঢাকা যাওয়ার নৌ পরিবহন যোগ্য পথগুলো খুঁজে বের করুন। তখন দুটি পথ ছিল। একটি হচ্ছে কলকাতা থেকে নবদ্বীপ হয়ে ডানদিকে জলঙ্গীর মধ্য দিয়ে পদ্মা হয়ে ঢাকায় পৌঁছনো, আরেকটা দক্ষিণ দিকে নেমে ডায়মন্ডহারবারের দক্ষিণে ক্রিক চ্যানেল দিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাওয়া । ১৪ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কখনও ঘোড়ায়, কখনও নৌকায় অবিভক্ত বাংলায় তিনি জরিপ করেন। ১৭৬৫ সালে তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্ভেয়ার জেনারেল পদে নিযুক্ত করা হয়। ১৭৭৭ সালে এদেশে প্রিন্টিং প্রেস হয়নি বলে তিনি দেশে ফিরে যান। লন্ডনে গিয়ে আরও তিন বছর ধরে তথ্যগুলোকে একত্রিত করে ১৭৮০ সালে প্রকাশিত হয় ‘এ বেঙ্গল অ্যাটলাস’। সেখানে বাংলার নদী, ভূপ্রকৃতি ও ভূগোল এমন বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে, আগের কোনও মানচিত্রে তা নেই। এর আগের মানচিত্রগুলো ছিল স্কেচ জাতীয়। না ছিল সঠিক স্কেল, না সঠিক কৌণিক অবস্থান।
আমার বন্ধু ল্যাঙ্কেশ্যায়ার ইউনিভার্সিটির প্রয়াত প্রফেসর গ্রাহাম চ্যাপম্যানের সহায়তায় ২০০৮ সালে একটি ছোট ফেলোশিপ পেয়েছিলাম। গ্রাহামের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০০ সালের শেষের দিকে। সে বছর সেপ্টেম্বর মাসের বন্যার কথা অনেকের হয়তো মনে আছে। গ্রাহাম মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি দেখতে এসে ওখানে আটকে ছিল প্রায় দশ দিন। লেডি ব্রাবোর্ন কলেজের অধ্যাপক জয়শ্রী রায়চৌধুরী কেম্ব্রিজে গ্রাহামের কাছে গবেষণা করেছিলেন। জয়শ্রীর মধ্যস্থতায় আমাদের পরিচয় হয়। আমারা দু’জনে মিলে ২০০০ সালের সেই বন্যা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম যেটি ‘জার্নাল অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। পরে আমরা মালদহে গঙ্গার গতিপথের বিবর্তন নিয়ে যে কাজ করেছিলাম সেটি গ্রাহামের মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে ‘Time Stream/ History and Rivers in Bengal’ শিরোনামে সেন্টার ফর আর্কিওলজিক্যাল স্টাডিজ পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেছিল।
আমি যখন ২০০৮ সালে লন্ডনে যাই সেই সময় প্রায় তিন সপ্তাহের বেশি সময় ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে প্রথম খুব ভালভাবে জেমস রেনেলের ‘এ বেঙ্গল অ্যাটলাস’ এবং অন্যান্য মানচিত্রগুলি দেখতে পাই। আমার মনে হয়েছিল আড়াইশো বছর আগে তৈরি এই মানচিত্রটা আমার দেশের ছাত্রছাত্রীদের, সাধারণ মানুষের দেখার অধিকার আছে। কলকাতায় এসে যখন আমি খুঁজতে আরম্ভ করলাম তখন দেখলাম যে অনেক লাইব্রেরিতে এটা সম্পূর্ণ নেই। যেখানে আছে, যেমন এশিয়াটিক সোসাইটি বা সাহিত্য পরিষদে, সব জায়গাতেই এটাকে ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট হিসেবে রাখা আছে, মানে সাধারণ পাঠকের অধরা। এমনকি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতেও তখন আমি পুরো সেটটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দু’বছর আগে কলকাতার সাহিত্য সংসদ থেকে রেনেলের মানচিত্রের পুনঃপ্রকাশ সম্ভব হয়েছে আমার সম্পাদনায়। এ কাজটা ২০০৮ সালে লন্ডনে দেখে আসা মানচিত্র থেকে শুরু হয়েছিল। কাজেই এই সব কিছু আমার কাজের মধ্যে মিলেমিশে গেছে।
বই হিসেবে যদি বলি, তাহলে ওই বইগুলির পরে আমি যেগুলো পড়েছি সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশে গবেষণা করা কয়েকজন গবেষকের কাজ। এঁদের অনেকেই বিদেশি। আর একজনের কথা আমার মনে পড়ছে যাকে আমি ১৯৮১ সালে ঢাকায় দেখেছিলাম, অধ্যাপক এম আর চৌধুরীকে। তিনি তখন বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। তাঁর বক্তৃতা বা কথাবার্তা খুব অসাধারণ মনে হয়েছিল । আমি সেই প্রথম স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে অবিভক্ত বাংলার ম্যাপ দেখি। মনে আছে, বাংলাদেশের একটা বিশ্ববিদ্যলয়ের একটা এগজিবিশনে আমি মুগ্ধ হয়ে ম্যাপটা দেখছি একমনে, তো উনি এসে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, কী দেখছ?
আমি বললাম, এই ম্যাপটা দেখছি, কী অসাধারণ! ম্যাপটি কানাডা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।
উনি বললেন, তোমার একটা চাই?
আমি ঘুরে তাকালাম, উনি হাসলেন একটু। তারপর আমি আমার ঘরে ফিরে এসে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মীর হাত দিয়ে তিনি আমাকে একটা ম্যাপ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার এত আনন্দ হল! কিন্তু সেটা নিয়ে খুব বিপর্যস্তও হয়েছিলাম। আমি ফিরে আসার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব অধ্যাপক ওখানে ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন বড় নেতা গোছের অধ্যাপক আমাকে ডেকে বললেন, এই ম্যাপটা ওরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছেন। তুমি এটা আমাদের দিয়ে দাও। আমি বললাম, আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হয়ে যাইনি। আমি গঙ্গার ওপরে একটা লেখা নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করিনি, আপনারা করছেন। ওঁদের সেই এক কথা— না, ওটা আমাদেরকে দিয়েছে। আমি ওটা দিইনি বলে আমাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এখন আমার কেন যেন হঠাৎ খুব খাতির বেড়েছে। সব জায়গায় আমাকে ডাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও মাস্টারমশাই আমার সঙ্গে কথা বলেননি। তাঁরা অনেকে বেঁচে নেই, কিন্তু আমি এখনও ওদের শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ঘটনাটা আমার অপ্রত্যাশিত ছিল। তখন আমার কতই বা বয়স, কয়েকজন শিক্ষকের প্রতি সব শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : বাংলার নদী নিয়ে আপনার সমসাময়িকদের কোন কাজগুলি গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?

যদি প্রকাশিত প্রবন্ধ বা বইয়ের দিকে তাকাও তাহলে এপার বাংলায় কদাচিৎ দু-একজনকে চোখে পড়বে। যেমন ধরো কোস্টাল জিওমরফোলজি বা উপকূল ভাগ নিয়ে যে কাজ কিছুটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন আর কিছুটা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশিস পাল করেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওশানোগ্রাফির সুগত হাজরা অনেকটা কাজ করেছেন উপকূল নিয়ে। বাংলাদেশে কয়েকজন বিদেশি গবেষক অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে মরগ্যান, ম্যাকিনট্যায়ার, কোলম্যান, উমিতসু, গুডব্রেড ও কুহেলের নাম উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড ছয় খণ্ডে সব নদীর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে। প্রতিটি নদীকে একটি নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রশ্ন : এঁদের মধ্যে কেউ কি সাধারণ পাঠকের জন্য কিছু লিখেছেন?

এখনকার অধ্যাপকরা বাংলায় লেখা খুব বেশি পছন্দ করেন না। এঁরা এমন জার্নাল বা পত্রিকায় লিখতে চান যার একটা তথাকথিত ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর আছে। যেটাতে তাঁদের পেশাগত সুবিধা বা প্রমোশন পেতে সুবিধা হবে। ফলে নদী নিয়ে বাংলায় লেখা খুব অল্পই চোখে পড়েছে আমার। আসলে দু’রকমের লেখা হয়। একটা অ্যাকাডেমিক অর্থাৎ ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের জন্য লেখা, আরেকটা হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য লেখা। সাধারণ মানুষের কৌতূহল মেটানো বা সাধারণ মানুষের মতো বোধগম্য করে বিজ্ঞানকে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এই বাংলায় হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

প্রশ্ন : নদীকে বাঁধ দিয়ে বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়াটা কি ভুল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

দু’রকমের নদীবাঁধ আছে। একটা হচ্ছে নদীর পাড় বরাবর, যেটাকে আমরা ইংরেজিতে এমব্যাঙ্কমেন্ট বলি। এই বাঁধ মূলত বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করা হয়। দ্বিতীয়টা হচ্ছে ড্যাম বা রিজার্ভার। যেটা নদীপথে আড়াআড়িভাবে দেওয়া হয়।এটা ঠিক যে মানুষের প্রয়োজনেই এই বাঁধের ভাবনাটা ভাবা হয়েছিল। বাংলার ক্ষেত্রে যেটা জানা দরকার তা হল, বাংলার দক্ষিণ দিকের নিচু অংশ বসতির যোগ্য ছিল না। কারণ খুব স্পষ্ট, বাংলার মধ্যে দিয়ে গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা প্রভৃতি বড় নদী সাগরের দিকে বয়ে গেছে। এটা একটা অপরিণত ভূমি বা বদ্বীপ। যেখানে ভূমি গঠনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এখানে বৃষ্টিপাতের ধরন। সেটা নদীর জলপ্রবাহকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে জলস্রোতের যতটা সারাবছরে নদী দিয়ে বয়ে যায় তার আশি শতাংশই জুলাই-অগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাহিত হয়। ফলে নদীর দুকূল ছাপিয়ে উঠে নদী তার প্লাবনভূমিকে ডুবিয়ে দেয়। আর অপরিণত ভূমি, যেগুলোকে আমরা জলা বলি, সেখানে জল জমে থাকে। এই বাংলাতে কিছু কিছু বসতি এলাকাকে ঘিরে এই জল ঢোকার রাস্তাটা বন্ধ করতে হয়েছিল।
তুমি যদি আইন-ই-আকবরী পড় তাহলে দেখবে সেখানে আবুল ফজল লিখছেন ‘বেঙ্গল’ কথাটা এসেছে ‘বঙ্গ’-র সঙ্গে ‘আল’ কথাটা যুক্ত হয়ে। উনি বলছেন, আল খুব উঁচু আর চওড়া হত এবং সেগুলো দিয়ে নিচু জায়গাকে ঘিরে দেওয়া হত যাতে বসতি এলাকায় জল না ঢুকতে পারে এবং বাঁধই যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হত। আজও সুন্দরবনের যা হয়। এই ঐতিহ্য খুব পুরনো।
ব্রিটিশরা আসার পরে যথেচ্ছভাবে নদীতে বাঁধ দেওয়া শুরু হল, কারণ ওরা প্রথমে ভাবল দামোদরের বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্য নদীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফলে দু’ধারে উঁচু করে বাঁধ দিয়ে দাও। এতে একটা জিনিস গোলমাল হয়ে গেল। সেটা হচ্ছে, ছোট ছোট বন্যার হাত থেকে তো আমরা কিছুটা মুক্তি পেলাম কিন্তু বাংলার মানুষ যে বন্যাকে নিয়ে ঘর করত সেই বন্যা দু’দিনের জন্য আসত, তারপর আবার জল নেমে যেত। বন্যা শুধু বহমান জলের স্রোত নয়, সে পলিও বহন করে আনে। প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে ছোট ছোট মাছ ভেসে আসত। এইসব ছোট ছোট মাছ মশার লার্ভাগুলোকে খেয়ে নিত এবং ম্যালেরিয়ার হাত থেকে মানুষ বেঁচে যেত। আর বন্যার জলে ভেসে আসা পলি কৃষিজমিতে জমত, জমিতে প্রচুর ফসল হত। এই যে বন্যায় পলি প্লাবনভূমিতে জমা এবং কৃষির সঙ্গে এর সম্পর্ক, সেটা বাঁধ দেওয়ার ফলে নষ্ট হয়ে গেল। ফলে যে বর্ধমান একসময় কৃষি উৎপাদনে ভারতশ্রেষ্ঠ ছিল সেখানেই দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। দেখা গেল দামোদরের বাঁধ দেওয়ার পরে দুর্ভিক্ষ হচ্ছে। রাধাকমল মুখার্জি লিখলেন— এই দুর্ভিক্ষ হচ্ছে লালজলের দুর্ভিক্ষ। অর্থাৎ কৃষিজমিতে যে বন্যার পলি মিশ্রিত জল ভেসে আসত সেটা তুমি বন্ধ করেছ, এ দুর্ভিক্ষ তারই ফল। সতীশচন্দ্র মজুমদারও লিখলেন— তোমরা আসলে আগামী প্রজন্মকে বন্ধক রেখে তোমাদের স্বার্থ সিদ্ধ করছ। একটা দুটো ছোট বন্যা হতে দাও তাতে তোমার বাস্তুসংস্থান তন্ত্রটা রক্ষা পাবে। কিন্তু ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা এসব বোঝেননি। আর ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরেও আমরা সেই ঐতিহ্যটাকে বহন করে চলেছি। এখন নদীর বাঁধগুলোকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যেটা করা দরকার সেটা হচ্ছে নদীর বাঁধগুলোকে কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া। এতে নদী তার প্লাবনভূমিকে কিছুটা ফিরে পাবে। কাজটা খুব সহজ নয়। কারণ আমাদের দেশে স্বাধীনতা-উত্তরকালে নদীর পাড়টাই সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এত লোককে পুনর্বাসন দেওয়া বা সরিয়ে নিয়ে প্লাবনভূমিকে নদীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া খুব কঠিন কাজ। তবে এটা না করলে আমরা কিন্তু চিরকাল নদীকে এইভাবে শাসন করতে পারব না। ফলে বাঁধ নিয়ে তাই আমাদের মুল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, নদী আগে যে পলি প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে দিত তা এখন নদীখাতে জমতে জমতে নদীকে অগভীর করে দিয়েছে। বন্যার প্রকোপ বেড়েছে। স্বাভাবিক কৃষিব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে এল বড় বাঁধের অর্থনীতি। আমাদের দেশের প্রথম বড় বাঁধ হচ্ছে ডিভিসি। এমনকি মেঘনাদ সাহার মতো বিজ্ঞানীরাও ভাবলেন নদীর উদ্বৃত্ত জলটাকে আটকে রাখা দরকার। এটা করতে গিয়ে নদীতে বাঁধ দেওয়া শুরু হল। আশা করা গিয়েছিল বর্ষার জলস্রোতকে যদি আমরা আটকে রাখতে পারি তাহলে নীচের দিকে বন্যা হবে না। আর দ্বিতীয় যেটা হবে, এই জলটাকে আমরা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বা সেচের কাজে ব্যবহার করতে পারব। এই ভাবনাটার মধ্যে কোনও অন্যায় ছিল না। কিন্তু একটু বিজ্ঞানের অভাব ছিল। সেটা হচ্ছে, একটা নদী যখন প্রবল গতিতে বর্ষার জল নিয়ে বয়ে যায় তখন তার চারপাশের বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবাকে অক্ষুণ্ণ রাখে। যেমন, প্রথম সে যে কাজটা করে সেটা সারাবছর ধরে তার খাতে জমে থাকা পলি-বালি সে সাগরে নিয়ে চলে যায়। নদীখাত গভীর হয়। যখন সে দুকূল ছাপিয়ে ওঠে তখন বহু ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া কৃষিভূমিকে সে উর্বর করে। যখন সে নদীখাতকে গভীর করে তখন নদীর জলধারণ ক্ষমতা বাড়ে। এবার যখন আমি বাঁধ দিয়ে দিলাম, গতিশীল জল যখন স্থিতিশীল হল, নদী পলিকে জলাধারের ভেতর ফেলে দিতে আরম্ভ করল। যেহেতু জলাধার তৈরি করতে গেলে একটা ভূ-প্রাকৃতিক অনুকূল অবস্থা অর্থাৎ তরঙ্গায়িত মালভূমি বা পার্বত্য অঞ্চল দরকার সেই জন্য জলাধারগুলো নির্মিত হল অনেক দূরে। ঘটনাচক্রে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল প্লাবিত হল এবং ওইখানে যাঁরা বাস করতেন সেই জনজাতি বা ট্রাইবালরা উৎখাত হলেন। তাঁদের সংখ্যা ভারতবর্ষে অন্তত চার থেকে পাঁচ কোটি।
এই বিতর্ক নর্মদা অববাহিকা থেকে দানা বাঁধে। কিন্তু তারও অনেক আগে যিনি প্রথম বুঝেছিলেন যে এটা উন্নয়নের সঠিক রাস্তা নয় তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২২ সালে তিনি যে ‘মুক্তধারা’ নাটকটি লেখেন তার মূল বক্তব্য ছিল এটাই। ‘উজানের লোকদেরকে ডুবিয়ে, তাদের সর্বস্বান্ত করে, তাদেরকে গৃহহীন করে ভাটির লোকেদের জন্য যে জল তুমি দিতে চাইছ তা ঠিক হচ্ছে না’। এই কনফ্লিক্টটা, এই আপস্ট্রিম-ডাউনস্ট্রিম কনফ্লিক্ট, এটাই আসলে ট্রাইবাল-নন ট্রাইবাল কনফ্লিক্ট। এটা বড় বাঁধের একটা খারাপ দিক। যখন আমরা ঝাড়খণ্ডে জল রাখার চেষ্টা করছি আর সেটাকে খালপথে হাওড়া, হুগলি, বর্ধমানের কৃষিজমিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি তখন এই দীর্ঘদিন জমে থাকা জলের অনেকটা বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। আর খালের পথে আসার সময় তার অনেকটা মাটি শুষে নিয়েছে। ফলে যতটা জল আমরা আশা করেছিলাম কৃষিজমিতে আসবে, সেটা এল না।
সারা ভারতবর্ষের নিরিখে বলছি, ভারত সরকার স্বীকারও করছে যে, যত জল আমরা জলাধারে জমাই তার ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশের বেশি জল কৃষিজমিতে পৌঁছয় না। কিন্তু ইতিমধ্যে যখন জলাধারগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা হচ্ছে তখন আর একটা পরিবর্তন ঘটল। সেটা হচ্ছে, ষাটের দশকের গোড়ার দিকে দেশের খাদ্যাভাবের অজুহাতে দেশি বীজগুলোকে সরিয়ে কিছু উচ্চফলনশীল বীজ এ দেশে আমদানি হল। এই বীজগুলির জলের চাহিদা অনেক বেশি। আমরা ভাবলাম একটা, দুটো, তিনটে ফসল হবে বছরে। জলাধারে সঞ্চিত জল যখন সবটা কৃষিজমিতে পৌঁছল না তখন ঘাটতি পূরণ কে করবে? তখন আমাদের শেখানো হল তোমাদের মাটির নীচে বিস্তীর্ণ জলভাণ্ডার আছে। এইবার এল শ্যালো ডিপ টিউবওয়েলের রাজনীতি বা অর্থনীতি। এই যে শ্যালো ডিপ টিউবওয়েলেগুলো অপারেট করতে আরম্ভ করল এবং ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হল এতে ঘাটতি পূরণ কিছুটা হলেও দেখা গেল, মাটির নীচে জলস্তর দ্রুত নামছে। বিস্তীর্ণ জায়গা আর্সেনিক ফ্লোরাইডে দূষিত হয়ে যাচ্ছে এবং সেই জল যখন সেচের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তখন তা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। আর পানীয়জল হিসেবে ব্যবহার করলে মানুষের চর্মরোগ হচ্ছে। সারাবছর বৃষ্টি না হলেও বাংলার নদী সারাবছরই কমবেশি বহমান ছিল। তার কারণ হচ্ছে, বর্ষাকালে যে বৃষ্টি হয় তার একটা পরিমাণ নদীতে চলে যায়, কিছুটা বিভিন্ন জায়গায় জলাভূমিতে আটকে থাকে, আর একটা অংশ বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে ফিরে যায়, আর একটা অংশ মাটির নীচে প্রবেশ করে। এই মাটির নীচে যতটা প্রবেশ করে সেটাই আমাদের ব্যবহারযোগ্য জল অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ জল। আমরা অতিরিক্ত জল যখন তুলতে আরম্ভ করলাম তখন হাজার বছর ধরে মাটির নীচে জমা জল সম্পদ আস্তে আস্তে কমতে আরম্ভ করল। এই অদৃশ্য জলস্রোতটা যেটা ধীরে ধীরে চুঁইয়ে এসে নদীর স্রোতটাকে সজীব রাখত সেই স্রোতটা হারিয়ে গেল। ফলে বহু নদী শুকিয়ে গেল।
এখন ছোটনাগপুর থেকে নেমে আসা নদীগুলোর দিকে যদি তুমি তাকাও, উত্তরবঙ্গের নদীগুলোর দিকে যদি তুমি তাকাও, দেখবে বর্ষার পরে এগুলোতে আর জল থাকে না। হেঁটেই পার হওয়া যাচ্ছে। এই পরিবর্তনটা খুব লক্ষণীয়। আর যেটা হয়েছে, যেহেতু কৃষিজমির ক্রমাগত প্রসার হচ্ছে, আমরা একটা-দুটো-তিনটে করে ফসল ফলানোর চেষ্টা করছি। আমাদের কৃষিজমি সারাবছর এত নরম হয়ে থাকে, এর ওপর বৃষ্টি পড়লেই সেটা নদীর দিকে চলে আসে। এইভাবেই নদীতে জল কমল কিন্তু পলির পরিমাণ বাড়ল। যে শক্তি হলে নদী এই পলিটাকে ধুয়ে সাগরে নিয়ে যেতে পারত নদী সেই শক্তি হারাল।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমি তোমাকে বলব। সেটা হল, আমি যখন ফ্লুভিয়াল জিওমরফোলজি বা নদী পড়তে শুরু করি তখন আমারও আমার মাস্টারমশাইদের মতো ধারণা ছিল, এটা এমন একটা বিজ্ঞান যা ভাল করে পড়ে বোঝা দরকার। কিন্তু যেটা তাঁরা শেখাননি, আমি পরে আমার অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি যে, তোমাকে যদি বাংলার নদী বুঝতে হয়, বাংলার কৃষিব্যবস্থাকে বুঝতে হবে, তোমাকে বাংলার সেচব্যবস্থাকে বুঝতে হবে, তোমার বাংলায় কী ধরনের ফসল নির্বাচন করা হয়, তার জলের চাহিদা কত, তার কতটা ভূগর্ভ থেকে আসে, কতটা ভূপৃষ্ঠ থেকে আসে, সেটা বুঝতে হবে, বাংলার আবহাওয়া, বৃষ্টিপাতের ধরন বুঝতে হবে। বাষ্পীভবন, প্রস্বেদন বা মাটির নীচে জলের অনুপ্রবেশ কীভাবে হয়— সব কিছুকে বুঝতে হবে। আমাদের জানতে হবে ভূতত্ত্ব, এমনকি পুরাতত্ত্বও। এটা যদি না কর তাহলে তুমি কিছুতেই একটা সামগ্রিক চিত্র পাবে না। এই যে আইসোলেশন মানে নদীকেই আলাদা করে দেখা, সেটার একটা গালভরা নাম ফ্লুভিয়াল জিওমরফোলজি। শুধু এটা করলে হবে না। এটা একটা ইন্টার ডিসিপ্লিনারি সাবজেক্ট। এই বিষয়টিকে ঘিরে যে প্রাচীরটা দেওয়া হয়েছে তাকে ভাঙতে হবে। তোমাকে অন্য বিষয়ের কাছে যেতে হবে, গিয়ে নতজানু হয়ে তার কাছে শিখতে হবে। তা না হলে কিছুতেই তুমি সত্যটা অনুধাবন করতে পারবে না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সঙ্গে জলচুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের নীতি কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

এই প্রশ্নটা ইদানীংকালে একটা বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। ১৯৪৭ সালে যখন দেশটা ভাগ হয় তখন একটা বাউন্ডারি কমিশন হয়, তার ওপর নির্দেশ ছিল এই বাংলাকে মুসলিম এবং অ-মুসলিম— এই দু’ভাগে ভাগ করো এবং একটা সীমারেখা টানো। র‌্যাডক্লিফ, যিনি এই সীমারেখা তৈরির দায়িত্বে ছিলেন, তিনি লিখলেন যে— এই সীমারেখা মোট চুয়ান্নটি নদীকে ভাগ করে টানা হল। তার মধ্যে গঙ্গা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, জলঢাকা, ইছামতির মতো অনেক নদী আছে। এই বিভাজন, আমরা ইংরেজিতে যাকে বলি হোলিস্টিক ইকোহাইড্রোলজি, সেটাকে মাথার মধ্যে না রেখে হল। নদীর স্রোত রাজনৈতিক সীমানা চেনে না। সে যথারীতি বয়ে চলল। ভারতবর্ষের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি হল যে, নদীর যে অংশটা আমাদের দেশের মধ্যে দিয়ে বইছে তাতে আমাদের অধিকার। ঘটনাচক্রে বাংলাদেশ ভাটির দিকে। যদি এরকম একটা ধারণাকে আমরা প্রশ্রয় দিই তাহলে তারা বঞ্চিত হয়। কারণ গঙ্গার ৯৫ শতাংশই ভারতের দিকে। আমরা যদি ভাবি এই অংশটা আমাদের, আমরা বর্ডার পেরিয়ে একফোঁটা জলও বাংলাদেশের দিকে ঢুকতে দেব না, তাহলে তো বাংলাদেশ শুকিয়ে যাবে। যদি এরকম ভাবনা আমরা ভারতে প্রশ্রয় দিই তাহলে নেপাল একদিন কোশী, গণ্ডক, ঘর্ঘরাকে আটকাতে পারে। ভুটান থেকে নেমে আসা নদীগুলোকে ভুটান আটকাতে পারে, সর্বোপরি চিন ব্রহ্মপুত্রের স্রোত আটকাতে পারে।
এই নিয়ে ১৯৯৭ সালে ইউএনও একটা রুল তৈরি করল। তারা বলল যে, সব নদী একাধিক দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। তাদের জলস্রোতে কোনও একটা দেশের একক অধিকার থাকতে পারে না। এটা এমনভাবে ব্যবহার হওয়া উচিত যাতে উজানের দেশ ভাটির দেশের ক্ষতি না করতে পারে। একটা দেশের দূষণ যাতে অন্য দেশে ঢুকে না পড়ে। উজানের দেশ জলস্রোতকেকে আটকাতে না পারে। আমাদের দেশে সমস্যাটা হল প্রথমে গঙ্গাকে নিয়ে, তারপরে তিস্তাকে নিয়ে।
আমরা যদি ভারত-বাংলাদেশ জলচুক্তির সাম্প্রতিক বিতর্কটার দিকে তাকাই তাহলে দেখব তিস্তাকে নিয়ে যে বিতর্কটা হয়েছে সেটা অদ্ভুত এক বিতর্ক। কিছু প্রকৌশলী দু’দেশের শাসককেই বুঝিয়েছে, দুটো বাঁধ দিয়ে দুটো জলাধার তৈরি করে বিস্তীর্ণ এলাকায় জলসেচ করা সম্ভব। ভারত এবং বাংলাদেশের দুটো তিস্তা প্রকল্পে জলসেচের জন্য যে পরিমাণ জলের কথা বলা হয়েছে তার মোট পরিমাণ অন্তত ১৬০০ কিউসেকের কাছাকাছি এবং সেটাও শুখা মরসুমে। যখন এই উপমহাদেশে বৃষ্টি হয় না। কিন্তু তিস্তা দিয়ে শুখা মরসুমে বয়ে আসে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ কিউসেক জল। যে নদীতে মাত্র ১৫০ কিউসেক জল আসে, সেই নদী অববাহিকায় আমরা ভাবছি ১৬০০ কিউসেক জল সেচের কাজে লাগাব। এর সঙ্গে যুক্ত হল সিকিমে কতগুলো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। তারা নদীটাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলল। নদীর যে স্বাভাবিক ছন্দ ও প্রবাহ ছিল, সেটা নষ্ট হল।
এখন বিশ্বজুড়ে একটা নতুন ধারণা তৈরি হচ্ছে, যেটাকে বলে ইকোলজিক্যাল ফ্লো। সেটা হচ্ছে, নদীতে কতটা জল বয়ে যেতে দিলে তার বাস্তুসংস্থানতান্ত্রিক পরিষেবা অক্ষুন্ন থাকবে তার বিচার করা। একেবারে আধুনিক গবেষণা বলছে, নদীতে ৮০-৮৫ শতাংশ জল ছেড়ে রাখা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে জাতীয় পরিবেশ আদালতও বলছে শুখা মরশুমে যতটা জল যায় তার ১৫ শতাংশ অন্তত ছেড়ে রাখো। ন্যাশনাল হাইডেল পাওয়ার কর্পোরেশন বলছে, না, এত জল আমরা ছাড়তে পারব না।
একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, উপমহাদেশে ৮০ শতাংশ জলই বর্ষায় বয়ে যায়, থাকে ২০ শতাংশ। তার ১৫ শতাংশ মানে নদীতে আর জল থাকবে না। আর নদীতে যদি জল না থাকে তাহলে নদী যে বাস্তুসংস্থানতান্ত্রিক পরিষেবা দিয়ে এই সভ্যতাকে এতদিন ধরে লালন করেছে, সেটা থাকবে না। ফলে আমাদের বুঝতে হবে আমরা কী চাইছি নদীর কাছে, এতটা নদীর দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা। আমি এটা মেনে নিচ্ছি, নদী থেকে জল না নিলে আমরা বাঁচব না। সে সেচই হোক, শিল্পই হোক। কিন্তু কতটুকু জল নিলে নদীটাও বেঁচে থাকবে সেই সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এটা না হলে সভ্যতাকে বাঁচানো যাবে না। আর এই কথাটা দুই দেশের শাসকরা যত তাড়াতাড়ি বোঝেন ততই মঙ্গল।

প্রশ্ন : বাংলার নদী নিয়ে চর্চা করতে গিয়ে নদীর ধারের বহু মানুষের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়েছে। দেখছেন নদী তীরবর্তী মানুষের বিচিত্র জীবনযাপন চিত্র। সেসব অভিজ্ঞতার কথা যদি একটু বলেন।

আমি এখানে দু’জনের কথা বলব। প্রথমজনের নাম কেদার মণ্ডল, দ্বিতীয়জনের নাম আমার মনে নেই। এই কেদার মণ্ডল পেশায় কৃষক, আশি বছর অতিক্রম করেছেন। মালদার নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি আমাকে বারবার শিখিয়েছেন নদীর চরিত্র কী। মনে আছে, সালটা ২০১১, মালদায় প্রবল ভাঙন হচ্ছে। আমার শিক্ষক এবং আমার এক ছাত্রী, আমরা তিনজন দেখতে গিয়েছি। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি। নদী প্রবল গতিতে এগোচ্ছে। নদীর পাড়ে সেচ বিভাগের একটা বাংলো ছিল, সেখানে সব গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে, সমস্ত ফার্নিচার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, বাড়িটাকে ভেঙে যতদূর সম্ভব ইট-কাঠগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমার ডানদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেদারবাবু। উনি প্রায় স্বগতোক্তির মতো আমাকে বললেন, ওরা এসব করছে, নদী তো এবার এদিকে এতটা ভাঙবে না। তখন নদী ওখান থেকে আর তিনশো মিটার দূরে। আমি বললাম, আপনার কী মনে হচ্ছে ? উনি জলের দিকে তাকালেন এবং অনেকক্ষণ ধরে দেখে আমাকে বললেন, এবার ওই উত্তর দিকটা একটু বেশি ভাঙবে। আমি বললাম, এদিকটা? উনি বললেন, এবার এদিকে বড়জোর বাংলোর পাঁচিলটা পর্যন্ত আসবে, তার বেশি নয়। আমি যে খুব বিশ্বাস করেছিলাম তা নয়।
তিন মাস পরে আমরা ওই তিনজন আবার দেখতে গিয়েছি। আমরা গিয়ে দেখি যেদিকে কেদারদা আঙুল দেখিয়েছিলেন সেদিকে নদী প্রায় সাতশো মিটার ঢুকে গেছে। অনেক বসতি গিলেছে। যেখানে বলেছিলেন নদী আর আসবে না, সেখানে নদী প্রায় স্থিতিশীল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচিলটা একটু ফেটেছে কিন্তু পড়ে যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে নদীকে দেখতে দেখতে একটা প্রজ্ঞা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে। আজ যদি আমি সত্যি সত্যি আমার কয়েকজন শিক্ষকের নাম করি তাহলে কেদার মণ্ডল একেবারে প্রথম সারিতে থাকবেন। যদিও উনি বলেন যে ওর ক্লাস সেভেন অবধি বিদ্যে।
আরেকটি মানুষ বর্ধমানের জামালপুরে তাঁর চাষের জমিতে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছিলেন, দেখুন, আমার মনে আছে এই নদীর (দামোদর) বন্যার কথা। আমার জমিতে এখন সেচের জল, মানে ক্যানেলের জল আসে। কিন্তু তাকিয়ে দেখুন, এই জল প্রায় স্বচ্ছ। এর মধ্যে কোনও পলি নেই। আর বন্যা যে আসত সে লাল পলিসিক্ত জল নিয়ে আসত, ফলে জমির উর্বরতা বেড়ে যেত, আমরা চাষ করতাম। আমাদের কোনও সার ব্যবহার করতে হত না। আর এই জল সেচের জন্য ব্যবহার করলেও জমিতে কাম্য ফসল পাওয়া যায় না, কারণ এই জল বন্ধ্যা। তাই আমাদের সার ব্যবহার করতে হয়। মানুষটির কথা আমার প্রায়ই চাবুকের মতো মনে হয়। এই লোকটি তো স্কুলে বেশিদূর যাননি। কিন্তু কী গভীর কথাটা তিনি বললেন!
এই দু’জন মানুষের কথা প্রসঙ্গে আমি আমার ছাত্রীকে বলেছিলাম, এঁরা যদি লেখাপড়ার সুযোগ পেতেন তাহলে হয়তো আইআইটি বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। কিন্তু এঁদের প্রজ্ঞা আমরা পরিকল্পনায় কখনও ব্যবহার করিনি। এঁদের কখনও আমরা ডেকে জিজ্ঞেস করিনি যে আমরা এটা ভাবছি, আপনি কী বলেন? আমাদের অভিধানে ওঁরা শিক্ষিত নন।

প্রশ্ন : বাংলার নদী নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এখন যে ধরনের চর্চা হয় তাতে কি আপনি খুশি? নদী নিয়ে যাঁরা আগামীতে চর্চায় আগ্রহী তাদের আপনি কী উপদেশ দেবেন?

এখন বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে নদী গবেষণাতে দুটি প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এক, বিষয়টাকে খুব জটিল অঙ্ক, ইকুয়েশন ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে উপস্থাপনা করা এবং দুই হচ্ছে, মাটির কাছে না গিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করা। দুটোই ভাল। কিন্তু যদি সত্যি সমস্যাটা বুঝতে হয় তাহলে নদীর কাছে যেতে হবে। সুন্দরবনের নদী বুঝতে গেলে পায়ে কাদা লাগাতে হবে। মালদার নদীর ভাঙন বুঝতে গেলে সেখানকার নদীর পাড়ে হাঁটতে হবে। কথা বলতে হবে নদীর পাড়ের মানুষের সঙ্গে। তাঁরা যে সব সময় খুব বিজ্ঞানসম্মত কথা বলবেন এমন কথা ভাবার কোনও কারণ নেই। কিন্তু দেখা যাবে, তাঁরা দশটি কথা বললে তার মধ্যে দুটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সোজা কথা, এই শহুরে অহংবোধ থেকে গবেষকদের বেরোনো দরকার। বেরিয়ে মানুষের কাছে গিয়ে শোনা উচিত এবং খুব বিনীতভাবে। তার মধ্যে থেকে তাঁদের আবেগ, অপবিজ্ঞানগুলোকে বাদ দিয়ে মূল তথ্যটার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানকে মেলাতে হবে। অর্থাৎ আমি বলছি, চিরায়ত প্রজ্ঞার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন করা। এটা প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে, যদি এই নদীর কথা তুমি শিখতে চাও বুঝতে চাও, তাহলে শুধু ভূগোল পড় না, তুমি ইতিহাস, ভূতত্ত্ব, এ দেশের সমাজের-অর্থনীতির কথা জান। এই সব কিছু মিলিয়ে পড়লে তবে তুমি সত্যটা দেখতে পাবে। কারণ নদী গবেষণা শুধু ভূগোলের একক গবেষণার বিষয় হতে পারে না। অনেকগুলো বিজ্ঞান একসঙ্গে মিশতে হবে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা অবশ্যই বলা দরকার। সেটা হল এই, আমাদের দেশের নদী গবেষণা মূলত বিদেশের লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার করে বোঝা উচিত, ইউরোপ বা আমেরিকার নদীর সঙ্গে এ দেশের ব-দ্বীপের নদীর কোনও মিল নেই। সুতরাং আমাদের এই নদীকে চিনতে গেলে বারবার ইউরোপীয়দের দ্বারস্থ হওয়ার দরকার নেই। তাদের কাছ থেকে আমরা নিশ্চয়ই কিছু কিছু জিনিস শিখতে পারি। কিন্তু আমাদের দেশের নদী আমাদেরই সবচেয়ে ভাল দেখা আছে। সেই কাজটা এ দেশের মানুষকেই করতে হবে।

প্রশ্ন : নদীর সঙ্গে জুড়ে থাকা আপনার জীবনের এই চার দশক নিয়ে আপনার একটি আত্মজীবনীমূলক লেখা আমরা কবে পাব?

নদী শুধু তাঁর চর্চার বিষয় নয়। ভালবাসারও বিষয়। গত চার দশক ভারত বিশেষত বাংলার নদীকে তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর কাছে নদী মানে শুধু প্রবাহমান জলধারা নয়, জীববৈচিত্র্যের এক বহমান ধারা এবং তার চারপাশের অসংখ্য মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি। নদীর উৎস, মোহনা, তার প্রবাহপথ, তার নানা বৈশিষ্ট্য যেমন তাঁর আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে তেমনই [...]

আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST
Pujo Special Issue
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$4/-*
One-time payment for one year
*Inclusive of GST