বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

ধূমকেতু

অনিন্দিতা গোস্বামী

ঠক ঠক ঠক ঠক, কে যেন কড়া নাড়ছিল খুব জোরে, অস্থিরভাবে। ঝড়-জলের রাতে যেভাবে একটু আশ্রয় চেয়ে কড়া নাড়ে কেউ, সেইভাবে। ঘুমটা পাতলা হতেই ধড়মড় করে উঠে বসল সুমন্ত। বলল কে, কে? পাশে শুয়ে ছিল কেতকী, বিরক্তভাবে বলল, কোথায় কে, রাত দুপুরে কী শুরু করলে বলো তো! সুমন্ত বলল, বাইরের দরজায় কেউ বোধহয় কড়া নাড়ছে।
কেতকী ঘুম জড়ানো গলায় বলল, কী নাড়ছে?
কড়া।
কড়া! কৌতুক খেলে গেল কেতকীর গলায়। তোমার দরজায় কড়া আছে নাকি! বাব্বা, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোন যুগে চলে গিয়েছে তুমি!
তাও তো বটে! ঘাড় নাড়ল সুমন্ত। মসৃণ একপাল্লার পালিশ করা সেগুনকাঠের দরজা, দরজার গায়ে পেতলের হাতল লাগানো, গায়ে গোল চাকতির মতো গোদরেজ কোম্পানির তালা, যা সামনে থেকে দরজা টেনে দিলে অটোমেটিক লেগে যায়, তবে খুলতে গেলে চাবি লাগে। অনেকটা চিচিং ফাঁকের মতো।
সুমন্ত বোতলের জলে খানিক গলা ভিজিয়ে এসে ফের শুয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শব্দ, খট খট খট খট। তবে এবার আর সে উঠল না। বরং অন্য পাশ ফিরে শুলো আরও কিছুক্ষণ শব্দটা শোনার আশায়। বাজছে বাজুক না, দরজা খোলা না খোলা তো তারই হাতে। এ তার পুরনো অভ্যেস। স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুম ভেঙে গেলেও স্বপ্নের দোলা তার মাথা থেকে যায় না। সে ওঠে, জল খায়, বাথরুম যায়, এসে ফের ঘুমিয়ে পরে আর ফিরে যায় তার অসমাপ্ত স্বপ্নে। কিন্তু এ স্বপ্নের যেন শুরুও নেই, শেষও নেই। অন্তহীন শব্দের মধ্যে সে যেন তলিয়ে যায়। যেন অবিশ্রান্ত সমুদ্রের গর্জন আছড়ে পড়ছে তটের ওপরে। তার নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে। ডিঙিনৌকার মতো সে যেন ভাসতে ভাসতে চলে যায় অবচেতনের প্রান্তে। দিক্‌চক্রবালে আলো ফোটার আগে পর্যন্ত ডার্করুমে ঝুলতে থাকে অসংখ্য ফটো নেগেটিভ।
সকালে ঘুম ভাঙতেই সে কাউকে কিছু না বলে সিঁড়ি দিয়ে সোজা নেমে যায় নীচে। সিঁড়ির মুখে কোলাপসেবল গেট খোলে। তারপর খোলে মূল ফাটক। দরজার গায়ে হাত ঘষে সে নিরীক্ষণ করতে থাকে চারপাশ। যেন সে আজ প্রথম এল এ বাড়িতে। তাই তো, এ বাড়িতে তো কোনও কড়া নেই। এ বাড়ির আগন্তুকরা দরজায় এককোণে সুইচে হাত দিয়ে কলিং বেল বাজায়। সে একবার টিপে দিল বেলটা। পাখি ডেকে উঠল, পিক পিক। ভেতর থেকে আওয়াজ এল, কে? সে কোনও উত্তর না দিয়ে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিল। বিনা কারণে এত সকাল সকাল কেতকীর ঘুম ভাঙিয়েছে শুনলে বাড়িতে একটা হুলুস্থুলু বাঁধবে।
সে দ্রুত ওপরে উঠে এসে বলল, কেউ না কেউ না, দরজা খুলতে গিয়ে আমার বেলের গায়ে হাত লেগে গেছিল। অন্য সময় হলে সে একটা এমন উদ্ভট যুক্তি দেবার জন্য জেরার মুখে পড়ত কিন্তু সকালের ঘুমটা কেতকীর সবচেয়ে আরামের ঘুম। তাই সে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

এত বছর ধরে সুমন্তই সকালে ওঠে, দরজা খোলে, ব্রাশ করে। ততক্ষণে কাজের মেয়ে এসে যায়। সে চা করে দিলে চা খেয়ে বাজারের থলে হাতে বাজারে বেরিয়ে যায়। তারপর ওঠে কেতকী। তবে এ সমস্তই ঘটে কিন্তু বেশ বেলা করেই। এদিনের মতো সাতসকালে নয়। আসলে কাল ডিঙিটা দিগন্তে হারিয়ে যেতেই লাফিয়ে উঠে পড়ল সূর্যটা। ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল সে যেন বসে আছে পুরীর সমুদ্রসৈকতে। ভারি তরতাজা লাগল তার শরীর ও মন। সে কোনওদিন মর্নিংওয়াকে যায় না। আজ বেরিয়ে পড়ল জুতো-মোজা পরে। বেশ খানিকটা হেঁটে এল গটমট করে কিন্তু গতরাতের মাথায় ভেতরের ছবিগুলো একটুও স্পষ্ট হল না।
আজ চার মাস হতে চলল দেশে সম্পূর্ণ লকডাউন। লকডাউনটা আদপে ঠিক কী তা হয়তো আগে জানত না সকলে, ভবিষ্যতেও জানবে না হয়তো। কার্ফু শব্দটার সঙ্গে বরং অনেকে পরিচিত আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের কোনও কোনও জায়গায় কোনও কোনও সময় অতীতে কার্ফু ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মাসের পর মাস দোকানপাট অফিস-কাছারি, স্কুল-কলেজ সব বন্ধ, এমন কখনও হয়নি। সকালবেলা ঘণ্টা দুয়েক সবজি আর মাছবাজার খুলছে, ব্যাস। তারা দু’জনেই যেহেতু কলেজে পড়ায় তাই দু’জনেরই অফিস-কাছারি অনন্তকাল ধরে বন্ধ। অনলাইলে কিছু ক্লাস-টাস চলছে, কিছু নোটপত্তর দেওয়া, ওই পর্যন্তই। বসে বসে বাড়িতে যেন আর সময় কাটে না। সদা আড্ডাবাজ সুমন্তর কলেজের ক্লাস সব বন্ধ। আজকাল ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে সবাই নাকি খুব আড্ডা দেয়। সুমন্তর ওসব পোষায় না। খোলা আকাশের নীচে বসে হা হা করে হাসবে, উরু চাপড়ে তর্ক করবে, তা না হলে আবার আড্ডা! কেতকী তাকে একটা ভাল সেলফোন কিনে দিয়েছিল। ছেলে হস্টেলে যাবার আগে সেই ফোনে বাবার নামে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সব খুলেও দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই নামকে ওয়াস্তে। সুমন্ত ওসব দেখত-টেখত না।
বোর হতে হতে দেওয়ালে যেন পিঠ ঠেকে গিয়েছিল সুমন্তর। সারাদিন বাড়িতে বসে কেউ থাকতে পারে! ফোন, কত করবে বন্ধুদের ফোন। কেতকী তো আধা সময় ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। তার তো অত ঘুমও আসে না। পড়ে থাকা মোবাইল ফোনটা নিয়ে সে নাড়ছে-চাড়ছে। ফোনের মাধ্যমে নোট পাঠাতে হচ্ছে ছাত্রদের। অর্থ উপার্জন অতি বিষম বস্তু। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোনটা আপন হয়ে উঠছে সুমন্তর। আরে, তাই তো, বেশ তো আড্ডা দেওয়া যায় বন্ধুদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে। নতুন নতুন বন্ধুও করা যায়, পুরনো বন্ধুদের খুঁজেও পাওয়া যায়। ঘরে বসে দিব্যি সময় কেটে যায়। সারাক্ষণই কিছু না কিছু হচ্ছে। কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, কেউ বকবক করছে। বেশ একটা হইহই ব্যাপার। শুধু নিজেকে পুরে দিতে হবে ওর মধ্যে। বাইরের জগতে এক মারণ ভাইরাস গ্রাস করছে পৃথিবী, প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে কোটিতে, এই সব কিছু ভুলিতে দিতে পারে ওই এক ছোট্ট যন্ত্র।

সে বাজার নিয়ে ফিরতেই চেঁচিয়ে উঠল কেতকী। ফের বাজার গিয়েছিলে। এতবার বলছি বাজার যেয়ো না। বাড়ির সামনেই তো সবজির ভ্যান আসে, না টাটকা সবজি পাওয়া যায় না, আরে, টাটকা খেতে গিয়ে তো মরবে। কালকে কড়া নাড়ার শব্দ শুনেছ না ! ওই করোনা কড়া নেড়েছে তোমার দরজায়।
ওফ, মৌতাতটা কেটে যাচ্ছে কেতকীর কর্কশ কথাবার্তায়। সে মিনমিন করে বলল, আমি তো ফিরেই সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফেলি, কাপড়-জামাও ঘরে তুলি না, মুখে মাস্ক পরে থাকি।
কেতকী বলল বাজারের ব্যাগ, সবজিপাতি— কীসের মধ্যে দিয়ে আসবে জান? এই যে তুমি কড়ানাড়ার শব্দটা শুনলে, সেই থেকে আমার মনে কু ডাকছে। এত করে তোমায় বলছি, তুমি শুনবে না, না?
সুমন্ত তাড়াতাড়ি কেতকীর সামনে থেকে সরে যায়। কেতকীর কথায় সুমন্তর মাথার মধ্যে ছবিগুলো কেমন যেন ধুয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু সে তো চায় না ছবিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠুক। আলো-ছায়ার মধ্যে যে মায়া-মমতা থাকে তা তো ঝকঝকে ছবিতে থাকে না। না না, এই অবিশ্রান্ত কড়ানাড়ার শব্দ তো কোনও অশনিসংকেত নয়, বরং কারও আগমনবার্তা। ঝোড়ো। অপ্রতিরোধ্য।
তপতী। সে বছর হ্যালির ধূমকেতু এসেছিল। সালটা উনিশ ছিয়াশি-সাতাশি হবে। সুমন্ত তখন গবেষণার কাজে ব্যস্ত। বাড়িতে অভাব। বাবা সামান্য চাকরি করতেন। তাও অবসর নিয়েছেন। দুই বোনের বিয়ের বাকি, স্কলারশিপের টাকাও অনিয়মিত। তাই কতগুলো অনার্সের ছেলেমেয়েকে বাড়িতে পড়াতে নিয়েছিল সুমন্ত। পাঁচ-ছ’জন ছেলেমেয়ের মধ্যে তপতীও ছিল। লম্বা লম্বা দুটো বিনুনি, বড় বড় দুটি চোখ, মেধাবী, মনোযোগী, খুব রোগা, শীর্ণই বলা চলে। সুমন্ত যে প্রেমে পড়েছিল সে কথা বলা যাবে না, তবে তার ভাল লাগত। শুধু তপতী কেন, পুরো দলটাই খুব প্রিয় ছিল সুমন্তর। ওদের সঙ্গে বয়সের পার্থক্যই বা ছিল কতটুকু! তাই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নয়, বরং ওদের কাছে সে ছিল সুমন্তদা।
সুমন্তদের বাড়িটা ছিল জলঙ্গী নদীর একদম পাড়ে। দোতলা বাড়ির নীচতলায় রাস্তার পাশে একটা ঘরে সুমন্ত থাকত আর ওই ঘরেই পড়াত। বাকি ঘরগুলো ছিল কাকাদের ভাগের, তাই তালাই পড়ে থাকত। কাকারা কলকাতায় থাকত। প্রায়দিনই সন্ধের মুখটায় পড়ানো শেষ হত ওদের। তারপর সদলবলে গিয়ে বসত জলঙ্গীর বাঁধানো সিড়িটার ওপরে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামত। বিস্তীর্ণ কালো আকাশের গায়ে একটা একটা করে উঠত তারা। তপতী ঘাড় উঁচু করে আঙুল নির্দেশ করে বলত, ওই দেখুন লুদ্ধক, ওই দেখুন সিংহ রাশি, ওই দেখুন জ্যেষ্ঠা, ওই অভিজিৎ।
নদীর ওপর অন্ধকার ঘন হয়ে উঠত। যাই, বলে কাঁধের ওপর ব্যাগ ফেলে উঠে পড়ত ওরা। শরিকি বাড়ির পলেস্তরা খসা দেওয়ালের ঘেরাটোপ ছেড়ে মনটা প্রসারিত হয়ে উঠত সুমন্তর।

আর হ্যালির ধূমকেতু দেখা নিয়ে সে কী উত্তেজনা। ধূমকেতু শেষপর্যন্ত তারা কতটুকু দেখতে পেয়েছিল তা আজ আর মনে নেই সুমন্তর। শুধু তপতীর খুশিটুকু মনে আছে। আর মনে আছে, হ্যালির ধূমকেতু ছিয়াত্তর বছর পরে পরে দেখা যায়।
বন্ধুত্বের অনুরোধের লম্বা লিস্টি আঙুল দিয়ে ওঠাতে ওঠাতে থমকে গিয়েছিল সুমন্ত। তপতী সিনহা! কনফার্ম না ডিলিট— দু’দণ্ড ভেবে নিয়ে স্পর্শ করেছিল নিশ্চিত। প্রোফাইল খুলে দেখেছিল, বাব্বা, বেশ গিন্নি হয়েছে তো! এই সেই মেয়ে! থার্ড ইয়ারের সিলেবাসও শেষ হয়ে গিয়েছিল, তা ছাড়া সুমন্তর নিজেরও থিসিস জমা দেবার সময় হয়ে আসছিল, ব্যস্ততা বাড়ছিল তাই এক মাস আগেই পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিল সে।
সেদিন রবিবার। খাওয়াদাওয়ার পর একটু বিছানায় গড়াচ্ছিল সে। নাগাদ তিনটে হবে। দুপুরের ভাতঘুমের একটু ঝিমুনি এসেছে। ঠক ঠক ঠক ঠক। অস্থিরভাবে কড়ানাড়ার শব্দ। ধড়মড় করে উঠে বসেছিল সুমন্ত, কে? কোনও সাড়া না পেয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকে এসেছিল তপতী। তারপর একটা টুলের ওপর বসে পড়ে বলেছিল, দরজাটা বন্ধ করে দিন। হতভম্বের মতো সুমন্ত বলেছিল, কী ব্যাপার? তপতী বলেছিল, সামনের মাসের কুড়ি তারিখে আমার বিয়ে।
সুমন্ত সামান্য চমকালেও ওপরে তা প্রকাশ করেনি। বলেছিল, তা বেশ তো!
তপতী বলেছিল, বেশ তো! তিন মাস বাদে আমার পরীক্ষা, আপনার কিছু বলার নেই? কোনও দায়িত্ব নেই আপনার?
সুমন্ত বলেছিল, তোমার মা-বাবা যথেষ্ট শিক্ষিত, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝেশুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওঁরা নিশ্চয়ই তোমার পরীক্ষা দেবার সুযোগ করে দেবেন।
আর যদি না দেয় !
তাতেও কিছু বলার থাকলে তোমাকেই বলতে হবে। আমি কী বলব!
প্রায় মরিয়া হয়ে তপতী বলেছিল, আপনি আমার সম্বন্ধে কী ভাবেন?
থতমত খেয়ে গিয়েছিল সুমন্ত। মনের খবর কি কারও সামনে প্রকাশ করা যায়, না তা অত চটজলদি বলা যায়। যে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে সে মেয়েকে কিছু বলা যায়! তার দুটো বোন ছোট ছোট। ওদের পড়াশোনা, বিয়ে। তার নিজের চাকরিবাকরির কোনও ঠিকঠিকানা নেই। সে বলেছিল, মানে! কী ভাবব আমি তোমার সম্বন্ধে! তপতী বলেছিল, ও, আপনি আমার সম্পর্কে কিছুই ভাবেন না!
সুমন্ত বলেছিল, তোমার এমন মনে হবার হেতু!
কী জানি! বলে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠেছিল তপতী। তারপর হঠাৎ ঠিক যেভাবে এসেছিল সেইভাবে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গিয়েছিল।
ঘরেতে এল না সে যে, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া। সে বিছানার ওপর শুয়ে পড়ে বলেছিল, আমাকে ক্ষমা করো তপতী। একটা সামান্য কীটপতঙ্গও রাসায়নিকের ইঙ্গিত বুঝতে পারে আর তুমি তো সেখানে বুদ্ধিমতী মানবী। তুমি ঠিকই বুঝেছিলে। পড়াতে পড়াতে আমার বারবার তোমার চোখের দিকে চোখ আটকে যেত। তা তোমার চোখেরই কারণে, তা কাকতালীয় নয়। নদীর পারে বসে আমি যে গুনগুন করতাম ‘ওগো কাজলনয়না হরিণী’, তা তোমাকে উদ্দেশ করেই, হেমন্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নয়। শুধু পরে শ্রদ্ধা প্রসঙ্গ আনতাম অন্যদের চোখে নিজেকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু শুধু এইটুকুর কারণে কেউ অনিশ্চয়তার পথে ঝাঁপ দেয় না!
সেদিন কি তার চোখের পাতা একটু ভিজে উঠেছিল? দু’ফোঁটা জল কি গড়িয়ে গিয়েছিল কোণ দিয়ে? মনে নেই সুমন্তর। ঠিক যেমন মনে নেই হ্যালির ধূমকেতু শেষপর্যন্ত তারা দেখতে পেয়েছিল কিনা। চৌত্রিশ বছর আগেকার কথা কারও ঠিকমতো মনে থাকে না।

কেমন আছেন স্যার? কতদিন পরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে দারুণ লাগছে। মেসেজ বক্সে খুব সাধারণ কথা। কিন্তু স্যার শব্দটায় চোখ আটকে গেল সুমন্তর। ওই ব্যাচের কোনও ছেলেমেয়েই তাকে স্যার বলত না। তপতী কি তবে ইচ্ছাকৃত তাকে স্যার বলে কিছু স্মরণ করিয়ে দিতে চাইল? না কি স্রেফ ভুলে গেছে, সে যেভাবে ভুলে গেছে অনেক কিছু। সুমন্তও খুব সংযতভাবে দু-একটা উত্তর লিখল। বাসস্থান, সন্তান ইত্যাদির খবরাখবর। কিন্তু মুশকিল হল অন্য, তার হার্টবিটটাই পাল্টে গেল। দ্রুত হয়ে গেল তার চলার ছন্দ। চোখ বন্ধ করলেই সেই অবিশ্রান্ত কড়ানাড়ার শব্দ। চোখ খুললেই মোবাইল ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করবার ইচ্ছে।
কেতকী বলল, যাক, এতদিনে তুমি যাহোক কিছু একটা খেলনা পেয়েছ, না হলে এই লকডাউনের বাজারে তোমার মেজাজে আমরা কেউ বাড়িতে তিষ্ঠোতে পারতাম না।
কী বা দেখে সুমন্ত, আবোল-তাবোল। কখনও বাংলাদেশের নাটক তো কখনও অসমের লোকগান। কখনও টুকটাক বন্ধুবান্ধবদের মেজেস এলে এই স্থবির পৃথিবীতে একমাত্র ওটাই যেন চলমান। তপতীও আর বেশি কথায় যায়নি, সুমন্তও না। এমনকি তপতীর ছবিতে লাইক-টাইকও দেয়নি সে। শুধু তার নামের পাশে সবুজ আলো জ্বললে কিছুক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থেকেছে। হঠাৎ একটা বার্তা এল তপতীর— একটা ধূমকেতু আসছে, নিও-ওয়াইজ। আপনাদের ওখানকার গঙ্গার পার থেকে দেখা যেতে পারে, ঠিক সন্ধের মুখে, উত্তর, উত্তর-পশ্চিমে। আমার এখানে তো খোলা জায়গা নেই আর এই লকডাউনের বাজারে আমার দূরে কোথাও যাওয়াও সম্ভব নয়। আপনি দেখে আসতে পারেন। আগামী দু-একদিন বেশ স্পষ্ট দেখা যাবে।
মেসেজটি পড়ে মৃদু হাসল সুমন্ত। তার অত আকাশ দেখার শখ নেই। তবে তপতী যখন আঙুল তুলে দেখাত, বেশ লাগত। তারপর এত বছরে ঘাড় তুলে হয়তো তাকানোই হয়নি। এখন সে যেখানে থাকে সেখান থেকে গঙ্গা প্রায় এক কিলোমিটার। এক ধূমকেতু দেখতে অত দূর যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। সে একটা হাস্যমুখের ছবি পাঠিয়ে রেখে দিল।
কিন্তু ওই যে উশখুশ। পরদিন বিকেল ঘনাতেই সে ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকাল। নাঃ, চারপাশের উঁচু উঁচু বাড়িগুলো বড় বাধা তৈরি করছে। অথচ সাইকেলে এক কিলোমিটার যাওয়া কম কথা নয়। আর সে বড্ড অলসও।
ফিরে এসে টিভি খুলে বসল। যদি টেলিভিশনে দেখায়! নাহ্‌, কোথাও কিছু দেখাচ্ছে না। ছয় হাজার সাতশো বছর পরে একটা ধূমকেতু পৃথিবীতে আসছে, তাই নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই!
বাইকটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে। অগত্য কী আর করা! দ্বিতীয় দিনে টেনেহিঁচড়ে পুরনো সাইকেলটাকেই বের করল সুমন্ত। কেতকী বলল, আবার বেরোচ্ছ! কোথায় চললে? নাহ্‌, তুমি বিপদ ঘরে না এনে থামবে না দেখছি।
সুমন্ত বলল, ধূমকেতু, দু-একদিন বাদেই মিলিয়ে যাবে।
কেতকী বলল, মানে! তুমি ধূমকেতু দেখতে চললে!
ঘাড় নাড়ল সুমন্ত। হুম, খোলা আকাশ না হলে দেখা যাবে না। বলে সে প্যাডেলে চাপ দিল।
অনেকদিন সাইকেল চালানো অভ্যেস নেই, বেশ কষ্ট হচ্ছিল এতটা পথ সাইকেল চালাতে। তবু গঙ্গার পারে এসে মনটা খুব ভাল হয়ে গেল। কতদিন পরে এমন নদীর কাছে এল। বসল সিঁড়ির ওপরে। তারপর মাথা উঁচু করে তাকাল আকাশের দিকে। কিন্তু আকাশে কোনও তারা দেখা যাচ্ছে না। ধূমকেতু তো নয়ই। খণ্ড খণ্ড মেঘ এক দমকা হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। যেন বৃষ্টি নামবে এখনই। ভেজা অন্ধকার চারদিকে। মোবাইল ফোনটা বের করে সুমন্ত লিখল, গঙ্গার পারে এসেছি। কিন্তু ধূমকেতু দেখা গেল না। আকাশে মেঘ তো। তবে খুব ভাল লাগছে। অনেকদিন তো এভাবে কোথাও আসিনি। আসলে অনেক না পাওয়ার মধ্যেও কিছু পাওয়া থেকেই যায়, তাই না!
লিখেই তার মনে হল, এই রে, সে কি কবি হয়ে গেল নাকি! আর দু’দিনের মধ্যে মোবাইল ফোনে সে হাতই দেবে না বলে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দ্রুত সাইকেলে গতি বাড়াল। ঝড়-বাদলার মধ্যে পড়ে গেলে মুশকিল। এই বয়সে ভিজলে আর রক্ষে নেই!

অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা
1 Comment
  1. Rajib Tantubay says

    ভালো লাগলো। শুরুটা যেমন‌ই হোক, শেষটা মন ছুঁয়ে গেল। শুভেচ্ছা গল্পকারকে…

মতামত জানান

Your email address will not be published.