বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১৫

পীযূষ রায়চৌধুরী

রণপা গ্রাম গানভি

কটনুতে এসে ক্যাথলিক চার্চটা দেখবে না? পোপও ঘুরে গেছেন এখানে।
না, আমার বরং ডানটোকপা মার্কেটে ভুডু ফেটিশ স্টলগুলোর দেখার ইচ্ছে বেশি।
বেশ, তবে সময় নিয়ে ‘গানভি’-ও ঘুরে এসো। এরকম স্বপ্নে দেখা বিচিত্র গ্রাম পৃথিবীতে আর কোথাও পাবে না। স্টানিংলি বিউটিফুল।
ডানটোকপা থেকে কত দূর?
জেমিতে (Zemidjan) যেয়ো। মোটরসাইকেল ট্যাক্সি। সব থেকে সস্তার। একটু রিস্ক আছে। ড্রাইভারকে বলবে আস্তে চালাতে। কোথাও কোথাও রাস্তা ভাল না। অ্যাকসিডেন্ট হয়। ভাড়া ফিক্সড রেটে। দরাদরি হয় না। দ্রুত পৌঁছতে শেয়ারে বুশ ট্যাক্সি পাবে। ‘আবোমে কালাভি’ লেগুনের ফেরিঘাটে পৌঁছতে বড়জোর ঘণ্টাখানেক লাগবে। তারপর নৌকোয় গানভি ঘণ্টা দুয়েক। যদি রাতে গানভিতে থেকে যাও তাহলে সকাল আটটার মধ্যে কটোনু ফিরতে হবে। ক্যারাভান ছাড়বে সাড়ে আটটায়। হ্যাঁ, ফটো তুলো বুঝে-শুনে। ওরা ক্যামেরা শাই।
সেদিন ৩ মে, ২০১৭। আমার ট্রান্স আফ্রিকা এক্সপিডিশনের নেতা স্টিভ নিউসওয়ে ভাল করে বুঝিয়ে দিল করণীয় কী। দলের সবাই আগের দিন গানভি গেছে। আমার পেট ছেড়েছিল বলে যেতে পারিনি। ওষুধ খেয়ে খানিক সুস্থ হতেই ঝুঁকি নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। পশ্চিম আফ্রিকার রহস্যপূর্ণ দেশ সুদূর বেনিনে এসে লোনলি প্ল্যানেটে নথিভুক্ত অত্যাশ্চর্য গ্রাম গানভি না দেখে ফিরে যাওয়াটা বোকামি।

ডানটোকপা মার্কেট, কটোনু।

ডানটোকপা মার্কেট খুঁজে পেতে সময় গেল কিছুটা। গিজগিজে ভিড়ে ভুডু ফেটিশ মার্কেট খুঁজেই পেলাম না। বাজারের হাজারো গতিমুখ। অসংখ্য টিনের চালের ছোট ছোট খুপরি ঘর। রকমারি জিনিসে ঠাসা। মেয়েদের তুচ্ছ গয়না, স্যুভেনির, খোদাই করা কাঠের স্ট্যাচু, ক্র্যাফট মার্কেট, ফেটিশ পুতুল, পারাকু প্রিন্টের ক্লথ বুটিক, জুতো, চায়নার বাসন, নাইজেরিয়ার প্লাস্টিক বালতি, কসমেটিক, স্ট্রিট ফুড, নেসকাফে, বিভিন্ন অঞ্চলের মুখোশ। আরও কত কী। বিশাল মার্কেটের গোলকধাঁধায় হতবুদ্ধি হয়ে ঘুরপাক খেলাম কিছুক্ষণ। ভাষার সমস্যায় অসুবিধা হচ্ছিল। ফরাসি ভাষা জানি না। ওরা ইংরেজি বলে না। শহরের মাঝখানে বিপ্লবকে উৎসর্গ করা কাস্ট আয়রনের স্ট্যাচু ইটোলে রুজ (Etoile rouge)। ওখানে শেয়ার ট্যাক্সি পেলাম। ট্যাক্সিগুলো ভাঙাচোরা ইটালিয়ান পিউজিওট গাড়ি। ইউরোপিয়ানদের ফেলে দেওয়া স্ক্র্যাপ। ভাড়া ৫০০ সিএফএ। পেছনের সিটে মাঝখানে আমি, দু’পাশে দুই স্থানীয় মহিলা। গুমোট গরম। জানলার কাচ নামানো যাবে না। হাওয়ায় নাকি মহিলাদের মাথায় পরচুল উড়ে যাবে। আমাকে হাঁসফাঁস করতে দেখে এক মহিলা করুণাবশত উইগ খুলে ব্যাগে রেখে জানলার কাচ নামিয়ে দিল। মুচকি হেসে ধন্যবাদ জানালাম। রাস্তার দু’দিকে একঘেয়ে ল্যান্ডস্কেপ। ঘিঞ্জি বাড়ি, ইলেকট্রিক লাইনের জট। ধুলো, ধোঁয়াশা। তার মধ্যেও গর্ব করার মতো কিছু নির্মাণ। চায়নার তৈরি ফ্রেন্ডশপ স্টেডিয়াম, ইটালির তৈরি ক্যাথেড্রাল, সেন্ট্রাল মস্ক।

ইটোলে রুজ স্ট্যাচু।

‘আবোমে কালাভি’ লেগুনে ফেরিঘাট। ‘লেক নকু’-র ওপর থিতু হয়েছে টোফিনু গ্রাম ‘গানভি’। ওখানে যাওয়ার জন্য ফেরিঘাটে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়। দাঁড় বাওয়া ডিঙিনৌকা বা মোটরচালিত বড় বড় নৌকা ছাড়ছে। সরকারি কাউন্টারে গানভি যাওয়ার এন্ট্রি পারমিটের টাকা মিটিয়ে রসিদ নিতে হচ্ছে। দালালদের উৎপাত আছে ঘাটে। আমাকে একা পেয়ে ওরা ঠকানোর নানা কুপ্রস্তাব দিল। বেশ নাছোড়। ছিনে জোঁকের মতো পেছনে লেগেছিল। পরিত্রাণ পেলাম এক ইউরোপিয়ান দলের সঙ্গে এক নৌকায় ঠাঁই পেয়ে। দু’ঘণ্টার নৌকাবিহার, ভ্রমণ ট্যাক্স ৫০০০ সিএফএ। ভারতীয় মুদ্রায় সাতশো টাকার মতো। শেয়ারে যাওয়া, তবুও দামি ভ্রমণ।
সপ্তদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সাব সাহারান পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ বেনিন বা পূর্বের ডাহোমের রক্তাক্ত ইতিহাসে স্লেভ ট্রেড ছিল একটা দুষ্ট ক্ষত। যার ঘা এখনও শুকোয়নি। স্মারক হয়ে আছে জলের ওপর রণপায়ে দাঁড়ানো গোটা একটা ভাসন্ত গ্রামে। আফ্রিকার ভেনিস।

রণপায়ে দাঁড়ানো গ্রাম গানভি।

প্রায় দুশো বছর ধরে ডাহোমের একের পর এক ফন রাজা যুদ্ধবন্দিতে বা জবরদস্তিতে ধরে আনা মানুষগুলোকে পর্তুগিজ স্লেভ ট্রেডারদের কাছে বিক্রি করত। শেকলে বেঁধে অসহায় মানুষদের ওপর চলত নৃশংস অত্যাচার সাগরপারে পাচারের আগে। নতুন পৃথিবী আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কৃত হয়েছে পর্তুগিজ অভিযাত্রী কলম্বাস ও আমেরিগো ভেস্পুচির দুঃসাহসিক অভিযানে। বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা খুলেছে। ওখানে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন তুলো ও চিনি চাষে। স্লেভ ট্রেডারদের পাখির চোখ অন্ধকার আফ্রিকার সরল, দুর্বল মানুষগুলোর ওপর। আটলান্টিক মহাসাগর লাগোয়া সারা পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে ধরপাকড় করে আটক করা হত গরীব অসহায় কৃষ্ণাঙ্গদের। দুর্বৃত্তরা বেশিরভাগ স্থানীয় গোষ্ঠীর সর্দার বা সমাজপ্রভু। ইউরোপীয় বণিকরা জাহাজঘাটে অপেক্ষা করত কেনা গোলামদের পণ্য হিসেবে পাচার করবে বলে। পাইকারি হারে হিউম্যান ট্রাফিকিং। আটলান্টিকের উপকূল ধরে একের পর এক তৈরি হয়েছে স্লেভ সেন্টার। পাচারের আগে নিষ্ঠুর বর্বরোচিত পরিবেশে বন্দি করে রাখা হত ক্রীতদাসদের।
কমজোরি টোফিনু উপজাতি আদতে টোগোর আডজা-টাডোর বাসিন্দা। দেশান্তরী হয়ে অতীতের ডাহোমে বা বর্তমানের বেনিনে চলে আসে ভাগ্যান্বেষণে। ফন রাজার নজর ছিল সংখ্যালঘু নড়বড়ে টোফিনুদের ওপর। কল্পিত কাহিনী অনুযায়ী টোফিনু রাজা আবাডোহউয়ে (ABADOHOUE) উড়ন্ত বক হয়ে দুর্গম নকু সরোবরের সন্ধান পায়। নতুন পৃথিবী, নতুন ভরসা। অত্যাচারী ফন লুঠেরাদের থেকে বাঁচতে টোফিনুরা পালিয়ে লেক নকুর গভীরে ঘাঁটি গাড়ে। আস্তে আস্তে তৈরি হল একটা ভাসন্ত গ্রাম। আফ্রিকার ভেনিস। অগভীর জলে নরম পাক বা কাদার ওপর বাঁশের খুঁটির ঠেকনো দেওয়া কুড়ে ঘর। কুড়ের কঙ্কাল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি, শরীর জলনিরোধক শক্ত কাঠে ঘেরা। মাথার ওপর ঝোপঝাড়ের খড়কুটোর ছাউনি।
জাদুমুগ্ধ ফন উপজাতি জলকে ভয় পেত। ধর্মীয় কারণে জল ছিল ফনদের নেমেসিস। অপদেবতা। বিশ্বাসকে মান্যতা দিয়ে ফন উপজাতি কখনও শত্রুর সঙ্গে জলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি। সাঁতারও জানত না। সরোবরের ওপর গড়ে ওঠা গ্রাম একমাত্র নাব্য জলপথেই সুগম। বেদরদি ফন যুদ্ধবাজদের থেকে নিষ্কৃতি পেতে চতুর টোফিনুদের আর কোনও উপায় ছিল না। চূড়ান্ত উদ্ভাবনী কৌশল একটা গোটা জাতিকে পৃথিবীর বুকে নির্মূল হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। লোককাহিনি আরও সোচ্চার হয়ে বলে, বহুরূপী টোফিনু রাজা বক থেকে কুমির হয়ে অন্য কুমির ভাইদের সাহায্যে সরোবরের মধ্যস্থলে মালপত্র নিতে সাহায্য করেছিল।

জেলে নৌকা পিরোগ।

বিশৃঙ্খল শহর কটোনুর উত্তর-পশ্চিমে নকু হ্রদের পাড় থেকে দশ-এগারো কিলোমিটার ভেতরে এই গ্রাম। এখন ক্রমশ শহরের রূপ নিচ্ছে। গ্রামকে ওরা বলে ‘গানভি’ (Ganvie)। টোফিনু ভাষায় ‘আমরা টিকে আছি।’ প্রায় পাঁচশো বছরের ইতিহাস গ্রামকে ঘিরে। ফন দুষ্কৃতিদের দৌরাত্ম্য শেষ হয় ফরাসিদের সঙ্গে ১৯৮২-র যুদ্ধে হেরে গিয়ে। ফরাসি উপনিবেশে থেকেও টোফিনুরা গানভি ছেড়ে অন্য কোথাও স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে হাজার তিরিশ মানুষের বাস গ্রামে। মূলত সবাই জলজীবী। পিরোগ (Pirogues) একধরনের শ্রীমণ্ডিত জেলে নৌকা। ওদের জীবন কাটে পিরোগে। ওরা জলজ। মাছ ধরাই একমাত্র জীবিকা। নদীর চরে বা ছোট ছোট দ্বীপে বেড়ে ওঠা পাম গাছের পাতা জলে ভেসে থাকে। পচা পাতা মাছেরা খেতে আসে। পাতার টোপে মাছ ধরা সহজ হয়। জেলেনিরা নৌকায় বসে থাকে মাথায় বেতের টুপি পরে। মাছ ধরে খালুইয়ে রাখে। হাঁড়িতে রাখে জিওল মাছ। জালিয়া ছেলেদের হাতে বঁড়শি, আবার কারও হাতে জালতি বা মাছ ধরার জাল। জেলে পরিবারের কেউ কেউ অবশ্য পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। মাছরাঙা ও জালপাদ পাখি শিকারের সম্ভাবনায় ঠায় বসে। আজীবন নগরজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, তবুও ওরা খুশি। গানভি ওদের পৃথিবী, ওদের গর্ব।

মেয়েরা পসরা সাজিয়ে পিরোগে।

মেয়েরা পসরা সাজিয়ে পিরোগে ভেসে বেড়ায়। গ্রামেই বিক্রি হয় সবজি, ফলমূল, মাছ, পাম তেল বা অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য। বাচ্চাদের স্কুল আছে। আছে মসজিদ, চার্চ, ভুডু মন্দির, কবরখানা, হাসপাতাল। হ্রদে গজানো ঘেসো দ্বীপে পোষমানা কয়েকটা গাধা চরে বেড়াচ্ছে। মূল ভূখণ্ডে মাল পরিবহণে গাধার প্রয়োজন। গ্রামে হাজার তিনেক ঘর। ঘর লাগোয়া জলের নীচে জটিল পদ্ধতিতে নলখাগড়ার ফাঁদ তৈরি করে মাছ চাষ হচ্ছে। ওরা বলে ‘আকাডজা’। কচুরিপানা কাঁকড়া বা চিংড়ি চাষে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। জল থেকে মোটামুটি ফুট তিনেক উচ্চতায় তৈরি হয়েছে একগুচ্ছ ঘরবাড়ি। কারুশিল্পের দোকান, রেস্তোরাঁ, হোটেল (auberges), পোস্ট অফিস, ট্যুরিস্ট সেন্টার, সব সেখানে। নৌকাগুলো ভেনিসের গন্ডোলার মতো নয়। ফাঁপা গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ছোট ছোট নৌকা। সংকীর্ণ প্রণালীর ভেতর ঘোরার পক্ষে উপযুক্ত। নৌকা করে গ্রামের ভেতরে ঢুকতে পারলে এদের রোজকার জীবনযাত্রার আঁচ পাওয়া যেত। ইচ্ছে ছিল। হয়নি। ব্যক্তিগত নৌকার ভাড়া বেশ চড়া। আমার ক্ষমতার বাইরে। প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। ওরা আসে একসঙ্গে অনেক যাত্রী ধরে এমন লঞ্চে। নিয়মিত রুটে।

জেলের মাছ ধরা।

পশ্চিম বিশ্বের পর্যটকরা ছবি তুলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল। ক্যামেরা তখন মেশিনগান। ঘন ঘন শাটার ক্লিকের আওয়াজ। নৌকায় দাঁড় বাইতে বাইতে বাচ্চারা সাহেব দেখে ‘ইয়েভো ইয়েভো’ বলে চেঁচাচ্ছে। মুখের ওপর ক্যামেরা ধরা গানভির মানুষ মোটেই পছন্দ করে না। মুখঝামটায় প্রতিবাদ করছিল অনেকে। অনেকে আবার ছবি তোলার জন্য টাকা চাইছিল। ক্যামেরা দেখলেই মুখ ঢাকে। তারমধ্যেও ছবি উঠছে। ওদের বিশ্বাস, মুখের ছবি দেখলে ভুডু দেবতা কুপিত হয়ে আত্মার খানিক অংশ খুবলে নেয়। ওদের পূর্বপুরুষ খ্রিস্ট বা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেও নিজস্ব ভুডু ধর্মের প্রতি বিশ্বাস এখনও অটুট।
হঠাৎ বন্যায় বিপদ বাড়ে। সামলানো মুশকিল। ১৯৬০-এর পর ২০১০ সালের বিধ্বংসী বন্যায় জলস্তর এতটাই বেড়েছিল যে গ্রামের মানুষ পালিয়ে মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। আফ্রিকার সবথেকে বড় ভাসমান গ্রাম নিয়ে আমরা যতই রোমান্টিক হই না কেন, গানভির পরিবেশ দূষণমুক্ত নয়। গানভির ভবিষ্যৎ চিন্তার বিষয়।
রাত কাটিয়েছি ভাসমান হোটেল এক্সপটেল গানভিতে। গানভির ভেলায় ভাসা কাশ্মীরের ডাল লেকের মতো বিলাসবহুল নয়। সাধারণ মানের ঘর। সাধারণ বিছানা, জেনারেটরে চলা পেডেস্টাল ফ্যান ও লাইট। বাথরুমে বালতির জলে সামান্য চানের জায়গা ও খাটা পায়খানা। দুঃখের বিষয়, সমস্ত বর্জ্য পদার্থ, মানুষের মলমূত্র, ক্লেদ সব কিছুই জলে মিশছে। তাড়াতাড়ি পর্যটকদের পৌঁছে দেওয়ার জন্য মোটরচালিত পিরোগ থেকে চুঁইয়ে পড়া তেলে দূষিত হচ্ছে জল। তাই ডে-ট্রিপ করে ফিরে যাওয়ার চলই বেশি। খাবারের দাম, কোল্ড ড্রিঙ্ক, বিয়ার, থাকার ভাড়া, সব কিছুই মহার্ঘ। হ্রদের জল নোনতা ও নোংরা। স্নান করলে চামড়ায় সংক্রমণের আশঙ্কা। ছোট ছোট দ্বীপে কুয়ো খুঁড়ে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জটিল ক্লেশকর জীবনযাত্রা। কিন্তু গ্রামের মানুষ দিব্যি আছে। গানভির জীবন বর্জন করে বিকল্প শুকনো জায়গায় বাকি জীবন কাটানোর ইচ্ছে কারও নেই।

এক্সপটেল হোটেল।

বাঁচার জন্য গানভিতে পালিয়ে আসা। আবার বাঁচার জন্য গানভিতেই জীবনসংগ্রাম। প্রতিদিন প্রতি ইঞ্চিতে সংগ্রাম। ইউনেস্কো কিংবদন্তি গানভিকে হেরিটেজ সাইট বলে ঘোষণা করেছে। পর্যটকরা এদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, চমকপ্রদ ইতিহাস ও চিত্তাকর্ষক নিমার্ণ পরিকল্পনাকে কুর্নিশ করে। কিন্তু কত দিন? ভাসমান হোটেলে এক রাত কাটিয়ে ও ওখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, গভীর সংকটে গানভি। নাম ‘মাকাফুই’, হোটেলের বয়। আমার দেখাশোনা করছিল। আমার প্রশ্নের জবাবে বলল, সংগ্রাম না করলে এগোনো যায় না। ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছে। আমাদের কোনও চিন্তা নেই। বললাম, মাকাফুই নামটা বেশ। নামের মানে? মুচকি হেসে বলল, আমি সদাই ঈশ্বরের গুণ গাই।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড়ে মাছের সংখ্যা কমছে, দূষণে স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে। ধীবরদের জীবিকা বিপন্ন। মানুষের অজ্ঞতা, দেশের সরকারের বোধহীনতা, পর্যটনের উৎপাতে গানভি কি শেষ হয়ে যাবে? টোফিনুরা ইতিহাস হয়ে লুপ্ত হয়ে যাবে না তো? রীতিমত জরুরি অবস্থা। এখনই কিছু করা দরকার, না হলে মোহিনী গানভির পাঁচশো বছরের মর্যাদার মৃত্যু হতে আর বেশি দেরি নেই। প্রেম উপাখ্যানের কবিতা বিভীষিকাময় গদ্য হবে।
অনন্য গানভি নিছক ভ্রমণ নয়, একটা অভিজ্ঞতা। পৃথিবীতে এরকম গ্রামের দ্বিতীয় নজির নেই। এখানে এসে বোধোদয় হল আরও কত অজানা, অনন্যসাধারণ জায়গা আছে পৃথিবীতে যা দেখা হয়নি। কিছু জায়গায় পর্যটকরা যেতে পছন্দ করে। কিছু জায়গা চায় পর্যটকরা আসুক। এমন কিছু জায়গা আছে পর্যটকরা আবার যেতে চায়। গানভির হাতছানি এড়ানো মুশকিল। কিন্তু আর কত দিন সেখানে যাওয়া যাবে?

ছবি : লেখক

(পরের পর্ব আগামী বুধবার)

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ২

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৩

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৪

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৫

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৬

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৭

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৮

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ৯

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১০

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১১

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১২

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১৩

কালো মানুষ সাদা কথা পর্ব ১৪

মতামত জানান

Your email address will not be published.