বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ অনলাইন একটি সাহিত্য পত্রিকা

অভিযানের গল্প আমায় অনুপ্রাণিত করেছে : অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়

বই। কেবল বইয়ের পাতায় পাতায় ঠাসা বিস্ময়ের বুননই আজ বাংলার তথা দেশের অন্যতম সেরা এক অভিযাত্রী করে তুলেছে তাঁকে! সাহারার মরুভূমি থেকে আফ্রিকার চাঁদের পাহাড় আবার চিনের অচেনা পর্বতকন্দর থেকে হিমালয়ের দুরূহ শৃঙ্গ-- তাঁর অভিযানের পরিধি ছাড়িয়ে গিয়েছে দেশ-কাল-সীমানার গণ্ডি। তাঁর ছোটবেলার পড়া বই থেকে বড় হয়ে মৃত্যুর চোখে চোখ রাখা অভিযান-- সবটুকু নিয়েই অকপট অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়। শুনলেন তিয়াষ মুখোপাধ্যায়।

তিয়াষ : অ্যাডভেঞ্চার জগতে প্রথম পা তো ছোটবেলাতেই। কিন্তু সেটাকেই প্যাশন ও পেশা করে তোলার শুরুটা কোথায়? কীভাবে?
অনিন্দ্য : এই প্রসঙ্গে আমার ছোটবেলার কথাটা একটু বলতে হয়। কারণ আমার জীবনের কথা বলতে গেলে সে সময়টাকে অস্বীকার করা যাবে না। আমার বাড়িতে আমার জ্যাঠামশাই ছিলেন, সুজল মুখোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের একজন ফার্স্ট জেনারেশন মাউন্টেনিয়ার। আমার বাবা ছিলেন এয়ার ফোর্সে। তাই আমার ডানপিটেমোয় কোনও খামতি ছিল না। শঙ্কু মহারাজ (জ্যোতির্ময় ঘোষ দস্তিদার), কমল গুহ, প্রাণেশ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষরা বাড়িতে আসতেন। তাই ছোটবেলা থেকেই পাহাড় নিয়ে পড়া, লেখা, গল্প— এইসব মিলিয়ে একটা আবহ ছিল পর্বতারোহণের। ফলে ছোট থেকে বেড়াতে যাওয়া বলতে পাহাড় নিয়েই ভাবা হত। আমি দু’বছর বয়স থেকে বাবা-জ্যাঠার কাঁধে চেপে গোমুখ যাচ্ছি— মনে আছে আমার সেকথা। সেখানে আমার অলটিচিউড সিকনেস হয়েছিল, আমায় কাঁধে করে নামানো হয়েছিল। এই গল্পগুলো আমার জীবনে থেকে গেছে। তার এফেক্ট থেকে গেছে।

আমি খুবই ভাগ্যবান ছিলাম। এই ভাগ্য বলতে আমি কপাল অর্থে বোঝাচ্ছি না, প্রাপ্তি অর্থে বলছি। আমার সাড়ে তিন বছর বয়সে আমি সান্দাকফু-ফালুট গেছি। রাস্তায় তেনজিং নোরগের সঙ্গে দেখা। সেকথা আমার মনে নেই কিন্তু রঙিন স্লাইড ছবিটা থেকে গেছে বাড়ির অ্যালবামে। এরপরে একটু বড় হতেই নেচার ক্যাম্প শুরু হল, প্রকৃতিকে চেনা, তারা চেনা, জঙ্গলকে ভালবাসা, সারভাইভ করা— এসব শুরু হল। আমি যে এত ছোট থেকে এতকিছু শিখতে পেরেছি, তাই আবারও মনে হয় আমি ভাগ্যবান। তখন আমার বয়েসি আর পাঁচটা বাচ্চা এ সুযোগ পায়নি।

তবে সে যাইহোক না কেন, আমার কখনও ‘পাহাড়ে যাব’ বলে কোনও পরিকল্পনা ছিল না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি, পড়াশোনায় মন্দ ছিলাম না, সবাই ভেবেছিল আমি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হব। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি আসলে খুবই অ্যাভারেজ মানের একটা মানুষ হয়ে উঠছিলাম। বাবা যখন রিটায়ার করলেন তখন আমি টুকটাক ফ্রিল্যান্সিং করি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির কাজে। হাতে কোনও পাকা চাকরি নেই। পয়সা তেমন রোজগারই হত না। অথচ পরিবারের দিক থেকে চাকরির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছিল। চাকরি পেলাম মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে, করতেও শুরু করলাম। কিন্তু একটা দিন, হ্যাঁ, আচমকা একটা দিন আমি আবিষ্কার করলাম, আমার আর ভাল লাগছে না।
এই শুরুটা একটু নাটকীয়ভাবেই হয়েছিল। তখন আমি একটা কোম্পানির ম্যানেজার। সারা সপ্তাহ চাকরি করি, ঘুরে বেড়াই, সপ্তাহান্তে বাড়ি এসে জামাকাপড় কাচি। আমি সে সময়ে দার্জিলিংয়ে ছিলাম। চাকরির জাতাকলে ফেঁসে গেছিলাম। ইনক্রিমেন্ট, প্রোমোশন, ইনসেন্টিভ— এসবে আটকে গেছিলাম। দার্জিলিংয়ে গিয়ে যেন আমার নতুন করে মনে পড়ল, আমারও পাহাড়ের সঙ্গে একটা যোগ ছিল। বাড়ি এসে ঘোষণা করে দিলাম, চাকরিটা করব না। কিন্তু কী করব? সেটা তখনও স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু আমি চাকরিটা আর করতে পারছিলাম না। ভাবলাম পড়াশোনা করে ডব্লুবিসিএস পরীক্ষা দেব। কিন্তু সেটাও তখন খুব মুশকিল ছিল।
আমি ভাবলাম। সে ভাবনায় পাহাড়ই বেশি করে এল। ঠিক করলাম, এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে আমি হিমালয়ে সময়টা কাটাতে পারি এবং তা থেকে রোজগারও করতে পারি। তাহলে আমি মনের শান্তিও পাব, বাড়িতে টাকা দেওয়ার সমস্যারও সমাধান হবে। তখন আমি আবার লিখতে শুরু করি বিভিন্ন পত্রিকায়। কিছু মানুষ সে লেখা দিয়ে আমায় চিনছিলেন। একটু ঝুঁকি নিয়েই বিজ্ঞাপন দিলাম মানুষকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার। তখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ নয়। তবু দু-একজন করে লোক হতে শুরু করল। গাইড কাম পোর্টার হিসেবে আমি তাদের নিয়ে যেতাম ছোট ছোট ট্রেকে। আমি অনুভব করলাম, আমি একজন স্বাধীন মানুষ, শুধু পাহাড় নিয়ে ভাবতে পারি। আমার ভাল লাগতে শুরু করল। শুরু বলতে এটাই।

তিয়াষ : আপনার মতে অ্যাডভেঞ্চারের সংজ্ঞা কী?
অনিন্দ্য : পাহাড়ে উঠলেই অ্যাডভেঞ্চার হবে বা সমুদ্রের গভীরে গেলেই হবে, তা নয়। আমার কাছে এর পরিধি ও সংজ্ঞা অনেক বড়। কিছু নতুন করা, নতুন কিছু করার জন্য ঝুঁকি নেওয়া— এটাই আমার কাছে অ্যাডভেঞ্চার। পর্বতারোহণে কেউ একটা কঠিন পাস ক্রস করে বা শৃঙ্গ ছুঁয়ে যে আনন্দ পান, আমি হয়তো সেটাই পাই বার্মার কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামে আজাদ হিন্দ ফৌজের কোনও বৃদ্ধ সেনাকে খুঁজে পেয়ে। তাঁর নাম ইতিহাস বইয়ে ছিল না। তিনি যখন খুঁজে খুঁজে তাঁর ফৌজের কার্ডটি আমায় দেখিয়েছিলেন, সেই যে রোমাঞ্চ, তা আমার অ্যাডভেঞ্চার-জীবনের কিছু কম প্রাপ্তি নয়।
আসলে আমরা তো মানুষ। আমার মনে হয়, মানুষকে বাদ দিয়ে শুধু পাথর আর মাটি দিয়ে অ্যাডভেঞ্চার হয় না। অ্যাডভেঞ্চার করতে গেলে মানুষের কাছে ফিরতে হবে। আমি মানুষকে এক্সপ্লোর করতে খুব ভালবাসি। সত্যি বলতে কী, অ্যাডভেঞ্চার কাকে বলে, সেই সংজ্ঞাটা আমি এখনও খুঁজছি। এই যে এখন লকডাউনে সমস্ত কাজ চলে গেছে, নতুন ফরম্যাটে কীভাবে বাঁচব, সেটাও আমার কাছে অ্যাডভেঞ্চার। নিজেকে রোজ নতুন করে চ্যালেঞ্জ করাটাও অ্যাডভেঞ্চার।

তিয়াষ : তথাকথিত অ্যাডভেঞ্চারের যে পথ ভারতীয় বা বাঙালি অভিযাত্রীরা অনুসরণ করেন, একের পর এক পর্বতশৃঙ্গ স্পর্শ করা, তা থেকে সরে গিয়ে এক্সপ্লোরার হয়ে উঠলেন আপনি। কেন?
অনিন্দ্য : এটার কারণটা মনে হয়, আমার অ্যাডভেঞ্চার জগতে পা রাখার শুরুটা কোনও প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে হয়নি। আমি কোনও প্রথাগত শিক্ষা পাইনি। আমি খুব স্বাভাবিকভাবে জঙ্গলে গিয়ে, প্রকৃতির কাছে গিয়ে প্রকৃতিকে ভালবেসেছি। আমি মনে করি, অ্যাডভেঞ্চার ব্যাপারটা যেহেতু প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা কখনও প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে না. এটা সোনার পাথরবাটির মতো ব্যাপার। হ্যাঁ, কিছু জ্ঞান দরকার হয়, শিক্ষা দরকার হয়। কিন্তু এটা কবাডি বা ফুটবল নয়। ওভাবে অ্যাডভেঞ্চারটা হয় না বলেই আমার বিশ্বাস।
দুর্ভাগ্যবশত, এদেশে বিভিন্ন ক্লাবের কর্মকর্তারা বেঞ্চে বসে অ্যাডভেঞ্চারের রূপরেখা ঠিক করেন। শীতকালে একটা ক্যাম্প, তা বাদে একটা ট্রেক আর একটা এক্সপিডিশন— এই চেনা গতের বাইরে প্রায় কেউই বেরোন না। এইরকম কোনও ক্লাবের কোনও প্রভাব আমার মধ্যে না থাকা একটা বড় ফ্যাক্টর আমার জন্য। আমি অ্যাডভেঞ্চারটা নিজে ঠেকে শিখেছি। বেরিয়েছি, পথ হারিয়েছি, খেতে পাইনি, হাড়-মাস কালি করে ফিরেছি। এই করতে করতে শিখেছি। পাশাপাশি আমি অনেক কিছু পড়েছি ছোটবেলা থেকেই। বহু অভিযানের গল্প আমায় বহুভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি শুধু মাউন্টেন-লিটরেচার পড়িনি অ্যাডভেঞ্চারের বই বলতে। আমার পড়ার রেঞ্জটা অনেক বেশি, যা আমায় আরও অনেক বড় করে ভাবতে শিখিয়েছে।

তিয়াষ : এভারেস্ট ক্লাইম্ব করতে ইচ্ছে করে? না হলে কেন নয়? আর হলে কেমন সেই পরিকল্পনা?
অনিন্দ্য : আজ থেকে ১৭-১৮ বছর আগে আমার এভারেস্ট ক্লাইম্ব করতে ইচ্ছে হয়েছিল। তখন দু-তিনটে শৃঙ্গ ক্লাইম্ব করেছি। তারপরে ইচ্ছে হয়েছিল, এভারেস্ট ছোঁয়ার। বই পড়ে এভারেস্টের একটা ছবি আমার মধ্যে আঁকা ছিলই। সেইসঙ্গে ছিল ছোটবেলায় তেনজিং নোরগের হাতের ছোঁয়া লাগার সেই সাদা-কালো গল্প। ফলে সব মিলিয়ে প্রভাব একটা ছিল। সে সময় ঘটনাচক্রে ‘এভারেস্ট পিস প্রোজেক্ট’-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। এটা আমেরিকার একটা এনজিও। ওরা দেখাতে চাইছিল, সমস্ত ধর্মের মানুষ এক হয়ে এভারেস্টে ওঠার মতো একটা কঠিন কাজ করতে পারে। আমি দেখলাম, বিনাপয়সায় এভারেস্ট ক্লাইম্ব করা যেতে পারে! আমি খুব ক্যাজুয়ালি মেল করেছিলাম, উত্তরও এসেছিল। সিলেকশন ক্যাম্পে ডাকল, সে ক্যাম্প হবে আমেরিকায়। ততদিনে আমি পাহাড়ে যাচ্ছি, অন্যকে নিয়ে যাচ্ছি।
টাকা জোগাড় করে চলে গেলাম সানফ্রান্সিসকো। সেখানে গিয়ে দেখি, সব ধর্মের মানুষদের যে জমায়েত, সেখানে বুদ্ধিস্ট হিসেবে রয়েছেন আপা শেরপা। কিংবদন্তী মাউন্টেনিয়ার। আমি তো চমকে গেছি। সে সময়ে আপা শেরপার সঙ্গে আমি ছিলাম টেন্টে। আমি নেপালি বলতে পারতাম, এটা সুবিধা ছিল। সে যাইহোক, শেষমেশ সেই এভারেস্ট অভিযান যখন হবে বলে ঠিক হল, আমায় দু’লক্ষ টাকা দিতে হত। সে টাকা আমার কাছে ছিল না। তবু আমি চেষ্টা করেছিলাম জোগাড় করার, কিন্তু হয়নি। সেই আমার ইচ্ছের শুরু, সেই শেষ।
এরপরে আমি নিজেকে তৈরি করি ক্লাইম্বিং গাইড হিসেবে। আমি তখন ক্লাইম্বিংকে ভালবেসে ফেলেছি। একইসঙ্গে এটাই আমার রোজগারের পথ। ফলে সেটা আরও কীভাবে ভাল করা যায়, সেটাতেই মন দিই। এখন এভারেস্ট ক্লাইম্ব করার কোনও ইচ্ছেই আমার নেই। যদি সাউথ কল বা নর্থ কল ছাড়া অন্য কোনও নতুন, দুর্গম ফেস দিয়ে ক্লাইম্ব করার সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো ভেবে দেখতাম। কিন্তু সেজন্য আমায় যে পরিমাণ ট্রেনিং করতে হবে, তা করতে গেলে আমায় সব কাজকর্ম ছেড়ে দিতে হবে। আমি সেটা কীভাবে করব। ফলে আমার অ্যাডভেঞ্চার সেভাবেই তৈরি হয়েছে। নিজের করা কাজগুলো থেকে যাবে। নতুন প্রজন্ম ঠিকই বুঝবে পার্থক্যটা।

তিয়াষ : এত বছরের অভিযাত্রী জীবনের সেরা তিনটি অভিযানের কথা জানতে চাইলে, সবার প্রথমে কোন তিনটিকে রাখবেন?
অনিন্দ্য : ২০১৫ সালে চায়নায় গিয়ে আমি একটা গোটা মাউন্টেন রেঞ্জ ডকুমেন্ট করেছিলাম। আমার হাতে ছিল ৩০-৩৫ হাজার টাকা। ইউনান প্রদেশে গিয়েছিলাম আমি। সেখানকার একটা অচেনা, অজানা গ্রামে পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে একটা পাহাড় দেখা যায়। সেখানে যেতে হবে। এক মার্কিন পর্বতারোহী, চিনেই থাকতেন, তাঁর কাছ থেকে এই পাহাড়ের কথা জানা। এটা পুরোপুরি একটা এক্সপ্লোরেশন ছিল আমার কাছে। আমায় কোথাও কোনও টেকনিক্যাল ক্লাইম্ব করতে হয়নি। কিন্তু ওই ম্যাপ দেখে দেখে পাহাড়ে পৌঁছনো, শৃঙ্গটা স্পর্শ করা— এই জার্নিটা অদ্ভুত ছিল। সাড়ে চার হাজার মিটারের ওপর অনেকগুলো পিক, ভ্যালি, পাস— গোটাটা ঘুরে ঘুরে আমি ডকুমেন্ট করেছিলাম। আমি আমেরিকান অ্যালপাইন জার্নালে এ ডকুমেন্টটি পাঠিয়েওছিলাম, ছাপা হয়েছিল।

এরপরে বলতে হয় কাঞ্চনজঙ্ঘার দক্ষিণে জেমু গ্যাপ পিক আরোহণের কথা। বহুদিন আগে থেকেই এই অভিযান অনেকে চেষ্টা করেছিলেন, হয়নি। সেসব গল্প আমি পড়েছিলাম প্রচুর। সেটা যখন নিজে করছি, তার চ্যালেঞ্জটা অন্য। ২০১১ সালে আমি বেশ কয়েক মাস ধরে চেষ্টা করে করে শেষমেশ জেমু গ্যাপের মাথায় উঠতে পেরেছিলাম। এই অভিযানটা আমার অন্যতম সেরা এবং প্রিয় অভিযান।

আর বলব সাইকেলে আফ্রিকা পার হবার কথা। এই জার্নিটা আসলে আমার জীবন নিয়ে বোঝাপড়া বদলে দিয়েছিল। ফলে আমার মনে হয় আফ্রিকা আমার দৃষ্টি অনেকটা প্রসারিত করেছে। আমি কখনওই নিজেকে সাইক্লিস্ট বলি না, সাইক্লিং আলাদা করে করিনি। কিন্তু ওই আবারও— বই। টিলম্যানের আফ্রিকার দিনগুলির কথা পড়ে ভাবতাম, অত বছর আগে মানুষ সাইকেল নিয়ে এত দূরদূরান্ত অভিযান করে ফেলতে পারলে আমি কেন পারব না। এই ভেবেই আমার বেরিয়ে পড়া। এ অভিযান আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি।

তিয়াষ : অভিযানে বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন? সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি বলতে কী মনে পড়ে?
অনিন্দ্য : ২০১০ সালে আমি একটি আমেরিকান টিম নিয়ে জানুকোট শৃঙ্গ অভিযানে যাচ্ছিলাম। ছোট টিম ছিল, চারজনের। ক্যাম্প ওয়ানে ছিলাম আমি। সব ঠিক ছিল, আচমকা রাতের বেলা কষ্ট হচ্ছে শরীরে, বমির মতো কিছু একটা হল। একটু অদ্ভুত লাগল আমার। আলো জ্বালিয়ে দেখলাম রক্ত-পুঁজ মেশানো একটা কিছু। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমার পালমোনারি ইডিমা হয়েছে, ফুসফুসে জল জমেছে। খুব কাশছিলাম, কথা বলতে পারছিলাম না। জ্বরও এসে গেল। আসলে ঘটনাটা যেটা ঘটেছিল, আমার ফুসফুসে কৃমি বাসা বেঁধেছিল, যে কারণে ফুসফুসে সিস্ট হয়ে গেছিল। ২০০৯ সাল থেকে আমি ফুসফুসের একটা সমস্যা ফিল করেছিলাম, কিন্তু এরকম কোনও আন্দাজ ছিল না। সে যাইহোক, সেদিন রাতে একটা সিস্ট বার্স্ট করেছিল আমার বুকে। আমি দ্রুত কোল্যাপ্‌স করছিলাম। ১০-১২ স্টেপ হেঁটে বসে পড়ছিলাম। কোনওরকমে হামাগুড়ি দিয়ে বেসক্যাম্পে ফিরেছিলাম। তুষারঝড়ে আটকে গেলাম সেখানে। সবাই ধরেই নিয়েছিল, আমি বাঁচব না। আয়ু ফুরিয়ে আসছিল প্রায়। যেটা দু’দিনে নামার কথা, সেটা ছ’দিনে নেমে আমি শেষমেশ গঙ্গোত্রী পৌঁছেছিলাম। তারপরে প্লেন ধরে কলকাতা গিয়ে সোজা হাসপাতাল। তখনও আমি জানি পালমোনারি ইডিমা হয়েছে। হাসপাতালে বোঝা গেল আসল কারণ।
তারপরে আমার ফুসফুসের একটা অংশ কেটে বাদ দিতে হয়। ওইবার আমি নিজে ভেবেছিলাম বাঁচা যাবে না। এমনটা আরও একবার হয়েছিল, তবে এর আগে। এই কৃমি-কাণ্ড যদি টেস্ট ম্যাচ হয়, সেটা ছিল টি-টোয়েন্টি।
শুকনার জঙ্গলে দুটো রকটাওয়ার আছে। একটা রাজা পাহাড়, একটা রানি পাহাড়। ২০০১ সালে সে পাহাড়ে গিয়ে আমি ঠিক করি, একটা গুহার খোঁজ করব। এ গুহার কথাও পড়েছিলাম বইয়ে। অন্য একদিক দিয়ে ঘুরে ওই পাহাড়ের মাথায় পৌঁছই আমি। শীর্ষটা বেশ ছোট। আমি চেষ্টা করছিলাম ওপর থেকে দড়ি ঝুলিয়ে নীচে নামব। সেটা করতে গিয়ে গুহাটা দেখব, কীভাবে হয়েছে বুঝব, ছবি তুলব। আমার আর কোনও উপায় ছিল না। এমন সময় কী হয়, আমি যেখানে পা রেখেছিলাম, সেটা ভেঙে যায়। একটা ফ্রি ফল হয়েছিল আমার... স্লো মোশনে পড়ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল। প্রথম মনে হয়েছিল, নিজের বোকামির জন্য পড়ে গেলাম এভাবে! তারপরে প্রিয়জনদের মুখ মনে পড়ছিল। একসময়ে সিনেমার মতো হয়, আমি ক্যাকটাসের ঝোপে আটকে যাই। এটা মিরাকেল (দৈব অর্থে নয়) ছিল। সেখান থেকে চেঁচিয়ে নীচে রোপ ফেলতে বলি, সেই রোপের সাহায্যে উঠে আসা। এইবারটাও মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। বেঁচে গেছিলাম।

তিয়াষ : অভিযাত্রী-জীবনে সেরা প্রাপ্তি, সেরা অভিজ্ঞতা কী কী? কয়েকটা যদি বলেন।
অনিন্দ্য : আমার পুরো অ্যাডভেঞ্চার-জীবনে সেরা প্রাপ্তি বলতে আমি একটাই বলব, আফ্রিকার মানুষদের চেনা। গোটা আফ্রিকা জুড়ে আমি যত দেশে গেছি, যত গ্রামে ঘুরেছি, মনে হয়েছে, আমার এখানেই থাকার কথা ছিল। ধরো, অনেকটা সাইকেল চালিয়ে একটা ছোট্ট গ্রামে পৌঁছেছি, ছোট্ট একটা দোকান, সে মানুষটি পয়সার কথা না বলেই জল এগিয়ে দিলেন, এমনকি নিজে যে সংকীর্ণ ছায়ায় বসেছিলেন, সরে গিয়ে আমায় সে ছায়াটা দিলেন। আমি প্রতিদিন ওখানে নতুন বন্ধু পেয়েছি। আমি শিখেছি, ভাল মানুষ কীভাবে হওয়া যায়। আমার খুব মনকেমন করে আফ্রিকার জন্য। আমি আমার জীবনের শেষ দিনগুলো আফ্রিকায় কাটাতে চাই।

তিয়াষ : চাঁদের পাহাড় অভিযানের পরে বহু বাঙালির মনেই আপনি ‘শঙ্কর’। আপনিও কি নিজেকে তাই ভাবেন?
অনিন্দ্য : বিভূতিভূষণের লেখায় শঙ্করের যে স্বপ্ন, একটি বাঙালি ছেলে সব বাধা ফেলে চলে যাচ্ছে— সেটাই আমার মধ্যে আছে। কিন্তু আমি নিজেকে শঙ্কর বলে মনে করিনি। বরং বলা যেতে পারে, শঙ্কর যেখানে অভিযানটা ছেড়েছিল, আমি সেখান থেকে অভিযানটা ধরি। আসলে চাঁদের পাহাড় বইটার প্রতি আমার একটা টান জন্মায় বড় হওয়ার পরে। সে বইয়ের জায়গা, ঘটনা, সময়— এই তিনটেকে বাঁধতে চেষ্টা করি আমি। এটা আমার কাছে একটা গুপ্তধনের মানচিত্র হয়ে ওঠে। শঙ্কর যেখানে ওর জার্নিটা শুরু করেছিল, মোম্বাসায়, সেখান থেকেই আমি শুরু করি। চাঁদের পাহাড়টা আমার গাইডবুক ছিল আসলে। আমি মেলাতে চাইছিলাম বই আর বাস্তব। আমি চাঁদের পাহাড় খুঁজছিলাম। সেখানে তো শঙ্কর যায়নি, তাহলে সেটা কোথায়— এরকম করে একটা খোঁজ চলছিল। শঙ্করের চাঁদের পাহাড় যাওয়া হয়নি, সেটা আমার খচখচ করছিল। চাঁদের পাহাড় তো তাহলে কাউকে যেতে হবে! সেটাই আমি!

তিয়াষ : সাহারার দুর্গমতা আপনাকে টানল কেন? কীসে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন?
অনিন্দ্য : আমি ছোটবেলায় একটা বই পড়েছিলাম, এক ফ্রেঞ্চ দম্পতি সাহারা মরুভূমি পার করছেন উটের ক্যারাভানের সঙ্গে। আমি তখন হয়তো কলেজে ঢুকেছি সবে। ওটা পড়ে আমি ভয়ঙ্কর নড়ে গেছিলাম। ভেতর থেকে ইচ্ছে জেগে উঠেছিল, আমিও একদিন যাব। সেটা সত্যি হবে তখন ভাবিনি। তবে যখন সত্যি হল, তখন বুঝেছিলাম ওই বইয়ের প্রভাব কতটা ছিল।
যেকোনও বিস্তীর্ণ জনমানবশূন্য ভূখণ্ড আমায় খুব আকর্ষণ করে। আমি একসময় ঠিক করেছিলাম ঘোড়া নিয়ে গোবি মরুভূমি ক্রস করব। গোবি এখনও হয়নি, সাহারা হয়েছে।

তিয়াষ : আজকাল যত না অ্যাডভেঞ্চার, তার চেয়ে বিতর্ক বেশি। অভিযোগ ওঠে বহু মিথ্যের। এই বিষয়টিকে কী চোখে দেখেন?
অনিন্দ্য : এটা নিয়ে আমি কিছু বলতেই চাই না। কারণ এ নিয়ে যত বলা হবে, তত গুরুত্ব দেওয়া হবে। আসলে এধরনের মিথ্যাচারী লোক সারা পৃথিবীতে আছে। কিন্তু তারা সকলেই আপন বাঁশবনে শেয়ালরাজা হয়ে থাকেন। বৃহত্তর অ্যাডভেঞ্চারের দুনিয়ায় তাঁরা নগণ্য, তুচ্ছ, হাস্যাস্পদ। কেউ পাত্তাও দেয় না। আমাদের দেশের একটা বড় সংখ্যার মানুষের অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে নলেজটা খুবই পুথিগত। এরকম দেশে দেবকে নিয়ে চাঁদের পাহাড় সিনেমা করা যায়। মানুষের আরও চোখ-কান খোলা উচিত, পড়াশোনা করা উচিত। তবেই অচলায়তন ভাঙবে। অচলায়তন না ভাঙলে এই মানুষগুলোকে চেনা যাবে না, প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।

তিয়াষ : অভিযানের জগতে আপনার কোনও আইডল আছেন?
অনিন্দ্য : বহু মানুষ। বাংলা থেকেই বলি, বিদ্যুৎ সরকার, অমিয় মুখোপাধ্যায়, পরের দিকে গৌতম দত্ত— এঁরা আমার আইডল। সাত-আটের দশকে বাংলা থেকে খুবই ভাল ও অনুপ্রেরণামূলক অভিযান শুরু হয়েছিল। সেটা পুরোপুরি হারিয়ে গেল। এটা আমার খুব খারাপ লাগে। বাংলার এই আরোহীদের নিয়ে বাকি দেশের মানুষের ধারণাও খুব কম। আমি একবার একটি জাতীয় কনফারেন্সে ইচ্ছে করে গ্রেট কুলুয়ার ও গৌতম দত্তর ছবি রেখেছিলাম, যেটা ১৯৯১ সালে বাংলা করে ফেলেছিল। অথচ মানুষ জানেই না।

তিয়াষ : কোনও বার্তা দিতে চান নবীন প্রজন্মের অভিযাত্রীদের?
অনিন্দ্য : আমার মনে হয়, আমাদের পজিটিভভাবে চিন্তা করা উচিত। ভেড়ার পালের মতো লোকে এভারেস্ট কেন যাচ্ছে এই প্রশ্নটা না তুলে, নিজে পড়াশোনা করে, বুঝে নিজের মতো অ্যাডভেঞ্চার করা যেতেই পারে। নিজেকে তৈরি করা যেতেই পারে। সে অপশন সবসময় আছে। আমি বলতে চাইছি— নিজের শক্তি, সাহস, আত্মবিশ্বাসকে সবসময় চ্যালেঞ্জ করতে হবে। খুব প্রিয় এক পর্বতারোহীকে কোট করে বলছি, “মাউন্টেন ইজ নট মাই স্টেডিয়াম, ইট ইজ মাই থিয়েটার।” আমি এখানে শিল্প তৈরি করতে এসেছি, নিজেকে মানুষ হিসেবে উত্তরণের প্রচেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছি। নিজেকে প্রমাণ করতে বা প্রতিযোগিতা করতে আসিনি।

তিয়াষ : আগামীর অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে কী ভাবছেন?
অনিন্দ্য : আপাতত এই প্যানডেমিক পরিস্থিতিটা সারভাইভ করাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার। এর বেশি কিছু বলব না এখন।

বিভিন্ন অভিযানের ছবি অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে।

বই। কেবল বইয়ের পাতায় পাতায় ঠাসা বিস্ময়ের বুননই আজ বাংলার তথা দেশের অন্যতম সেরা এক অভিযাত্রী করে তুলেছে তাঁকে! সাহারার মরুভূমি থেকে আফ্রিকার চাঁদের পাহাড় আবার চিনের অচেনা পর্বতকন্দর থেকে হিমালয়ের দুরূহ শৃঙ্গ-- তাঁর অভিযানের পরিধি ছাড়িয়ে গিয়েছে দেশ-কাল-সীমানার গণ্ডি। তাঁর ছোটবেলার পড়া বই থেকে বড় হয়ে মৃত্যুর চোখে চোখ রাখা অভিযান-- সবটুকু নিয়েই অকপট [...]

আপনি যদি ইতিমধ্যে সুখপাঠের গ্রাহক হয়ে থাকেন, তাহলে লগ ইন করুন।
আপনি যদি "সুখপাঠ " -এর গ্রাহক না হয়ে থাকেন তা হলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী এক মাস বা এক বছরের জন্য এখনই গ্রাহক হয়ে যান।
One Year Instant Access
Payment by Visa/Master Credit cardsa
$20/year*
Introductory Price
*Inclusive of GST